kalerkantho


২ এপ্রিল ৫০ বছর পুরো করল ‘২০০১ : আ স্পেস অডিসি’। অনেকের মতে সর্বকালের সেরা এই সায়েন্স ফিকশন সিনেমার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এক পৃষ্ঠার আয়োজন

মহাকাশের মহাকাব্য

মুক্তির পর কেউই পছন্দ করেনি, তবে উল্টোটা হতেও সময় লাগেনি। ক্রমেই সময়ের সেরা সায়েন্স ফিকশন ছবি হয়ে উঠেছে ‘২০০১ : আ স্পেস অডিসি’। সিনেমাটি নিয়ে লিখেছেন হাসনাইন মাহমুদ

১২ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



মহাকাশের মহাকাব্য

১৯৬৮ সালের ২ এপ্রিল। স্ট্যানলি কুব্রিকের নতুন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার ওয়াশিংটনের বিখ্যাত আপটাউন পার্ক সিনেমা হলে। নাম শুনেই মারমার কাটকাট বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির দেখার উদ্দেশ্যে হাজির হয়েছিলেন অনেক হলিউড তারকা; কিন্তু ছবি শুরু হওয়ার একটু পরেই অবাক হয়ে গেলেন বাইরে অপেক্ষারত সাংবাদিকরা। একে একে বেরিয়ে আসছেন আমন্ত্রিত অতিথিরা! শেষ হওয়ার আগেই বেরিয়ে আসেন ১৪১ জন! অভিনেতা রক হাডসন তো রেগেমেগে বলতে লাগলেন, ‘কেউ আমাকে কি একটু বলবেন পর্দায় আসলে কী হচ্ছে?’ চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর তোপের মুখে পড়ে সমালোচকদেরও। অথচ সেই ‘২০০১ : আ স্পেস অডিসি’র সুবর্ণ জয়ন্তীতে বিশ্বজুড়েই মাতামাতি। এত বছর পরে এসেও রুপালি পর্দার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃত। স্ট্যানলি কুব্রিকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রটির গল্প লিখেছেন প্রখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্ক।

সিনেমার কাহিনী আবর্তিত হয়েছে অনেক বছর পরের মহাকাশচারীদের অন্বেষণকে ঘিরে।

২০০১ সাল, মানুষ চাঁদে ঘাঁটি গেড়েছে। চাঁদের মাটির নিচে পাওয়া যায় রহস্যময় এক কালো বস্তু। ৩০ লাখ বছরের পুরনো! তার গায়ে সূর্যের আলো পড়তেই ভেসে এলো রেডিও তরঙ্গ। এরপর শুরু নতুন মিশনের, যেখানে বড় ভূমিকা নেয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ‘হাল ৯০০০’।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ‘হাল-৯০০০’-এর সঙ্গে বারবার লড়াই এবং এক অচেনা বস্তুতে নিজেদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ খুঁজে ফেরাই দেখানো হয়েছে দুই ঘণ্টা ২২ মিনিটের ছবিতে। সে সময়ের হলিউডের কল্পবিজ্ঞানে শুধু দানব ও যৌনতার প্রাধান্য ছিল, যা সরিয়ে কুব্রিক এ চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে জন্ম দিয়েছিলেন এক নতুন ঘরানার।

‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ’ নির্মাণের পর থেকেই কুব্রিক এক নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিষয়বস্তুটাও হবে একেবারেই ভিন্ন। এ চলচ্চিত্রে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে মানবজীবনের সম্পর্কের এক বিমূর্ত রূপ ফুটিয়ে তোলাই ছিল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ, সমাজে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রভাব ও পৃথিবীর বাইরে জীবনের উৎস নিয়েও ছিল আগ্রহ। সঙ্গী জুটিয়ে ফেলেন সে সময়ের নামকরা কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্ককে। শুরুতে উপন্যাস লেখার ইচ্ছা থাকলেও চলচ্চিত্রটি নিয়ে সামনের দিকে আগান। উপদেষ্টা হিসেবে পান প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগানকে। নতুন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে সবচেয়ে বেশি কুব্রিককে নজর দিতে হয় স্পেশাল এফেক্টের দিকে। বিজ্ঞানধর্মী বিভিন্ন ডকুমেন্টারিতে কাজ করা স্পেশাল এফেক্ট শিল্পীদের নিয়ে একটি দল তৈরি করেন কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য। অনেকে সে সময় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার জন্য সন্দেহ পোষণ করলেও পিছু হটেননি পরিচালক। তিনি বলতেন, ‘যা কল্পনা করা যায়, তা পর্দায়ও দেখানো যায়।’  

চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর দর্শক-সমালোচক উভয়েই চলচ্চিত্রটিকে ‘খুবই বিরক্তিকর’ ভাবলেও ধীরে ধীরে নাম ছড়াতে শুরু করে ‘২০০১:এ স্পেস অডিসির। মুক্তির প্রথম সপ্তাহে ফ্লপের তালিকায় নাম ওঠানোর জোর সম্ভাবনা দেখা গেলেও দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই মোড় ঘুরতে শুরু করে। বিশেষ করে যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে প্রচণ্ড হতাশ সে সময়ের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। মুক্তির ৫০ বছর পরেও চলচ্চিত্রটির আলোচনা থেমে নেই। অনেক প্রথিতযশা সমালোচকদের সবচেয়ে পছন্দের চলচ্চিত্রের তালিকায় নাম থাকলেও অনেকেই একে ছুড়ে ফেলতে দ্বিধাবোধ করেননি। চলচ্চিত্রবিষয়ক ওয়েবসাইট আইএমডিবির দর্শক মতামতেও এই দুটি বিপরীত মেরুর উপস্থিতি খালি চোখেই দেখা যায়। চলচ্চিত্রটি নিয়ে লেখক আর্থার সি ক্লার্ক বলেছিলেন, ‘সমালোচনা থাকবেই চলচ্চিত্রটি নিয়ে। যদি কেউ এটির পুরোটুকু বুঝে ফেলে তাহলে আমরা ব্যর্থ। সব উত্তর আমরা দিইনি, দিতে পারিনি, বরঞ্চ দর্শকদের জন্য কিছু প্রশ্ন রেখে গিয়েছি।’   


মন্তব্য