kalerkantho


পিঁপড়াবিদ্যা টু কমলা রকেট

অভিনয় করে আলোচিত হলেও আদতে তিনি নির্মাতা। প্রথমবারের মতো নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র, মুক্তি পাবে এই ঈদেই—‘কমলা রকেট’। এই ছবি নির্মাণ ও নেপথ্যের কথা বলেছেন নূর ইমরান মিঠু

৭ জুন, ২০১৮ ০০:০০



পিঁপড়াবিদ্যা টু কমলা রকেট

নূর ইমরান মিঠু

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই প্রতিজ্ঞা করি, বড় হয়ে ফিল্ম মেকার হব। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ২০০৮ সালে এলাম ঢাকায়। তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদের মতো পরিচালকদের তত্ত্বাবধানে বেশ কিছু ফিল্ম মেকিং কোর্স করেছি। পরে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সহকারী হওয়ার সুযোগ পাই। ‘টেলিভিশন’-এ তাঁর সহকারী ছিলাম। ছবিটার শুটিং শেষে চাকরিতে চলে যাই, এনজিওতে রিসার্চের কাজ করতাম। ফাঁকে ফাঁকে কিছু তথ্যচিত্র বানিয়েছি। এর মধ্যেই ফারুকী ভাইয়ের ডাক পড়ল, তাঁর ‘পিঁপড়াবিদ্যা’য় অভিনয় করতে হবে! আমি কিভাবে পারব? সাহস দিলেন বস, ‘কোনো সমস্যা নেই। আমিই করিয়ে নেব।’ চাকরি ছেড়ে দিয়ে এক বছর বসের সঙ্গেই ছিলাম। এই সময়ে উনি ‘পিঁপড়াবিদ্যা’ বানান। এরপর আবার চাকরিতে ঢুকি। কিন্তু আমি তো সিনেমা বানাব, স্বপ্নটা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু কিভাবে? একটা সময় টিউশনি করতাম, কোচিং সেন্টারও ছিল। সেখানকার এক স্টুডেন্ট থাকে ইতালি। সে ফোন দিয়ে বলল—ভাই, আপনি চাইলে নাটক বানাতে পারেন। আমি লাখখানেক টাকা দিতে পারব। আরেক ছোট ভাইও হেল্প করল। একরকম জোড়াতালি দিয়েই নির্মাণ করলাম নাটক ‘ডানা নেই, উড়ে যাওয়া’। নাটকের মধ্যে কোনো তারকা অভিনেতা নেই। সব চ্যানেলে একটা করে ডিভিডি দিয়েছি। কেউ আগ্রহ দেখাল না। দেড় বছর পর এটিএন বাংলা থেকে নওয়াজিশ আলী খানের ফোন, নাটকটা খুব পছন্দ হয়েছে তাঁর। এবার কিছুটা সাহস পেলাম। পরে বানালাম টেলিফিল্ম ‘কালপুরুষ কানাগলি’। মোশাররফ করিমের কাছে গিয়ে বলি—ভাই, ভালো একটা গল্প আছে, আপনি যদি অভিনয় করতেন। কিন্তু আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই। মোশাররফ ভাই বললেন, ‘টাকা আমি দিচ্ছি, তুমি বানাও।’ টেলিফিল্মটি চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষের খুব ভালো লাগল। এটাকেই সিনেমা করতে বলল। রাজি না হয়ে বললাম, আমার কাছে আরো সুন্দর সুন্দর গল্প আছে। চাইলে শোনাতে পারি। এভাবেই ‘কমলা রকেট’ নিয়ে নেমে পড়লাম।

প্রিয় কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের দুটি গল্প বেছে নিলাম—‘মৌলিক’ ও ‘সাইপ্রাস’। দুটির গল্প মিলিয়ে ‘কমলা রকেট’-এর গল্প দাঁড় করালাম। শাহাদুজ্জামানকে জানালাম, তিনিও আগ্রহী হলেন। পরে তাঁর সঙ্গে মিলে চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করলাম। উনি থাকেন ইংল্যান্ডে। অনলাইনে যোগাযোগ হতো। উনি ঢাকায় এলে আমরা দেখা করলাম। সিনেমা নিয়ে প্রচুর আলাপ হলো। এটিই তাঁর করা প্রথম সিনেমার চিত্রনাট্য।

ঢাকা থেকে মোরেলগঞ্জের একটা স্টিমারের মধ্যে পুরো সিনেমার শুটিং করলাম। এই স্টিমারের বয়স প্রায় ১০০ বছর। এটাতে রানি এলিজাবেথ, জীবনানন্দ দাশ ও বঙ্গবন্ধুর মতো মানুষরা চড়েছেন। একটা সময় এটাতেই কলকাতা যেতে হতো। এ স্টিমারটাই একটা দেশ, এখানে নানা শ্রেণির মানুষ। শ্রেণিভেদে সবাই আলাদা পোশাকের হলেও কাম, ক্ষুধা, শীত ও গন্ধের মতো মৌলিক প্রশ্নে সবাই এক।

শুটিংয়ের জন্য অত বড় স্টিমার তো ভাড়া করা যায় না। ভাড়া করতে যত টাকা লাগে, আমার সিনেমার বাজেটই তত নয়। আমি ওই স্টিমারে ট্রিপে চলে যেতাম। খুলনা যেতে-আসতে তিন দিন লাগে। দেখা গেল এর মধ্যেই বেশ কিছু দৃশ্যের শুটিং করে ফেললাম। ফিরে এসে শুটিং করা দৃশ্যের এডিট করতাম। কোনো দৃশ্য পছন্দ না হলে আবার শুট করতাম। স্টিমারে এত যাত্রীর মধ্যে শুটিং করা অসম্ভব হতো, যদি না অভিনয়শিল্পীরা সাহায্য করতেন। তৌকীর আহমেদ, মোশাররফ করিম, সামিয়া সাঈদসহ যাঁরাই অভিনয় করেছেন, সবাই মনেপ্রাণে চেয়েছেন আমি যেন ছবিটা ঠিকঠাক বানাতে পারি।

ঈদে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। ইচ্ছা ছিল মুক্তির আগে বিভিন্ন ফেস্টিভালে পাঠাব। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের আগ্রহেই ঈদে মুক্তি পাচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, এই ছবিটা কেন দেখব? যাঁরা এ পর্যন্ত ছবিটা দেখেছেন, সবাই প্রশংসা করছেন। এযাবত্কালে অনেক ভালো ছবিই হয়েছে দেশে। কিন্তু আমাদের কুঁড়েঘর-নদী-খাল-মানুষ নিয়ে ছবি খুব কম। চারপাশে যেটা দেখি, সেগুলোর অনুবাদ খুব বেশি হয়নি আমাদের ছবিতে। বলতে পারি, এই জনতার ছবি সারা পৃথিবীতে এই প্রথম। দেখলে একটা ফ্রেশ ফিলিংস পাবেন।

অনুলিখন : ইসমাত মুমু


মন্তব্য