kalerkantho


বার্গম্যান যেমন

মামুনুর রশিদ   

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বার্গম্যান যেমন

সাল ১৯১৮। মায়ের স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা, নবজাতকের অবস্থাও শোচনীয়। অসুস্থতার কারণে হাসপাতালেই তাঁকে ব্যাপ্টাইজ করা হলো। ডাক্তার বললেন, এ ছেলে অপুষ্টিতেই মারা যাবে। ডাক্তারের সে কথা ফলেনি। অপুষ্টিতে ভোগা সেই ছেলেটিই হয়ে ওঠে সিনেমাজগতের বড় এক বিস্ময়ের নাম! তিনি ইঙ্গমার বার্গম্যান। তাঁকে বলা হয়, সুইডেনের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক। মার্কিন পরিচালক উডি অ্যালান তো তাঁকে সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রকারের স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছেন। সিনেমার আঙ্গিক, কলাকৌশল, ভাষা ও প্রয়োগে বৈচিত্র্য আর নতুনত্ব এনেছিলেন তিনি। জন্ম দিয়েছিলেন অনন্য এক চিত্রভাষার।

ব্যক্তিগত জীবনে বাবার সঙ্গে সম্পর্কটা কখনোই সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তবে মায়ের খুব ভক্ত ছিলেন। পরিবারে ছোট বোন আসার পর বার্গম্যান মূলত নানি আর বড় ভাইয়ের সাহচর্যে বেড়ে উঠেছিলেন। বাবা ছিলেন ধর্মযাজক, তাই পরিবারে প্রবল ছিল ধর্মীয় আবহ। ছেলেবেলা থেকেই তাই ধর্ম আর ধর্মের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের দিকটি তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। এর স্পষ্ট প্রভাব পরবর্তী জীবনে তাঁর কাজগুলোর মধ্যে দেখা যায়। তাঁর সিনেমার চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে ঈশ্বরের সঙ্গে মানবমনের একটা সম্পর্ক খুঁজতে দেখা যায়। তাঁর চরিত্রগুলো ধার্মিক বা অধার্মিক নয়, বরং তাঁর চরিত্রগুলো সব সময় একটা বাস্তব আদর্শকে ঘিরে ধরে বাঁচতে চায়। ১৯৩৭ সালে স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে আর্ট ইতিহাস ও সাহিত্য বিষয়ে ভর্তি হন বার্গম্যান। এখানে পড়া অবস্থায়ই ইউনিভার্সিটির থিয়েটারে জড়িয়ে পড়েন। মঞ্চনাটক লেখা, অভিনয়, নির্দেশনা শুরু করেন পুরোদমে। ১৫০টিরও বেশি মঞ্চনাটকের নির্দেশনা দিয়েছিলেন বার্গম্যান। এই সুবাদে মঞ্চ অভিনেতা, কলাকুশলীদের একটা দল গড়ে উঠেছিল তাঁকে ঘিরে। কিছুদিনের মধ্যেই হেলসিংবার্গ থিয়েটার থেকে ফুলটাইম ডিরেক্টর হিসেবে ডাক পান। এরপর সুযোগ আসে তত্কালীন সুইডিশ সিনেমার খ্যাতিমান পরিচালক আলফ সিয়োবার্গের ‘টরমেন্ট’ সিনেমার চিত্রনাট্য তৈরির। এই সিনেমা দেশে এবং দেশের বাইরে সাফল্য পেলে পরিচিতি পান বার্গম্যান। এর ওপর ভর করে ১৯৪৫ সালে নিজের লেখা চিত্রনাট্যে বানান ‘ক্রাইসিস’। তবে তাঁর প্রথম দিকের বানানো সিনেমাগুলো সেভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি। ১৯৫২ সালে ‘সিক্রেট অব উইমেন’ এবং ‘সামার উইথ মনিকা’য় নিজের কাজের পরিচয় দেন। এমন অনন্য চিত্রভাষা, গল্প বলার ধাঁচ সবাইকে অবাক হতে বাধ্য করে। একে একে ‘দ্য সেভেন্থ সিল’, ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ’, ‘পারসোনা’, ‘দ্য ভার্জিন স্প্রিং’, ‘দ্য সাইলেন্স’ থেকে ‘ক্রাইজ অ্যান্ড হুইসপারস’-এর মতো কালজয়ী সিনেমা দিয়ে বিশ্ব সিনেমায় এক বিস্ময়কর নাম হয়ে ওঠেন।

বার্গম্যানের সিনেমায় ঘুরেফিরে এসেছেন একই অভিনেতারা। একেবারে নতুন, আনকোরাদের নিয়ে তিনি কাজ করতেন না। সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, ‘একজন আনকোরা আসলে যা, সে তা-ই হয়ে থাকতে পারে, এবং এভাবে সিচুয়েশনকে একটা তৃতীয় মাত্রা জোগাতে পারে। যেমন দে সিকা ঘটিয়েছেন তাঁর ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’-এ। শিক্ষণপ্রাপ্ত অভিনেতাদের নিয়ে মহড়া দিলে তারা স্বভাবপ্রেরণা হারিয়ে যা শেখানো হয়েছে সেটাই যান্ত্রিকভাবে অভিনয় করে যেতে থাকে, পেশাদারি মঞ্চে প্রতি সন্ধ্যায় যেমন করে।’

অস্তিত্ববাদ, একাকিত্ব, মানবীয় দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় বিশ্বাস—এ দিকগুলোই সাধারণত বার্গম্যানের সিনেমার মুখ্য দিক। বার্গম্যানের সিনেমার আরেকটি দিক ঘুরেফিরে আসে—কামনা। তাঁর সিনেমার নারী চরিত্রগুলো পুরুষ চরিত্রের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল। বার্গম্যান তাঁর সিনেমার চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে যেভাবে অস্থিরতা, অদম্যতাকে ধারণ করতেন, আজকের প্রেক্ষাপটে তা অনেক অনেক বেশি স্থায়ী।

দ্য সেভেন্থ সিল

 



মন্তব্য