kalerkantho

বাছাই ৮

ছোটবড় ৭০টির বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ইঙ্গমার বার্গম্যান। সেখান থেকে ৮টির কথা জানাচ্ছেন রশিদ তানিম

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বাছাই ৮

সামার উইথ মনিকা

সামার উইথ মনিকা, ১৯৫৩ : এই সিনেমা দিয়েই প্রথম পরিচালকের অনন্য শিল্পীসত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ফরাসি নতুন তরঙ্গের সিনেমার অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছিল এই সিনেমা। এক তরুণের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সরল, আবেগঘন প্রেমের গল্প। ছেলেটি নিঃসঙ্গ, দ্বিধাগ্রস্ত। অন্যদিকে মেয়েটি উদ্দাম, সংকোচহীন। বিপরীত দুটি চরিত্রের প্রেমের উপাখ্যান।

 

স্মাইলস অব আ সামার নাইট, ১৯৫৫ : সুইডেনের এক গ্রীষ্মরাতের গল্প। অভিজাত বাড়ির মালিকদের আর ভৃত্যদের এক রাতের জন্য সঙ্গী বদল করা নিয়ে কমেডি। শেক্সপিয়ারের ‘আ মিডসামার নাইট ড্রিমস’-এর বেশ প্রভাব আছে সিনেমার গল্প আর কমেডির মেজাজে। এই সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পরে আরো অনেক কমেডি সিনেমা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বার্গম্যানের একনিষ্ঠ ভক্ত উডি অ্যালানের ‘আ মিডসামার নাইট’স সেক্স কমেডি’।

 

দ্য সেভেন্থ সিল, ১৯৫৭ : ১৯৫৪ সালে মঞ্চের জন্য ‘উড পেইন্টিং’ নামে একটি নাটক লেখেন বার্গম্যান। পরে এটিকেই তিনি বড় করে সিনেমায় রূপ দেন। ‘দ্য সেভেন্থ সিল’ ক্রুসেড থেকে ফিরে আসা এক যোদ্ধার গল্প। পথিমধ্যে তার সামনে আসে মৃত্যুদূত। যোদ্ধার সময় ঘনিয়ে এসেছে। কিন্তু যোদ্ধা তা মানতে চায় না। মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তার সঙ্গে দাবা খেলতে বসে। এই সিনেমায় জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে অস্তিত্ববাদ, ধর্ম, দর্শন নিয়ে প্রশ্ন তোলা আর তার উত্তর খোঁজা হয়। এ সিনেমায় মৃত্যুর সঙ্গে বসে দাবা খেলার দৃশ্যটা ছিল আইকনিক। সিনেমায় ব্যবহূত  দাবার বোর্ডটি ২০০৯ সালে ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনায় বিক্রি হয়! কালজয়ী এই সিনেমার স্ক্রিপ্ট নিয়ে শুরুতে পাঁচ-পাঁচবার প্রযোজকদের কাছে গিয়েও হতাশ হয়ে ফিরতে হয় বার্গম্যানকে।

‘স্মাইলস অ্যাট দ্য সামার নাইট’-এর সাফল্যের পরই প্রযোজক এ সিনেমায় লগ্নি করতে রাজি হন।

ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ, ১৯৫৭ : ৭৮ বছরের এক বৃদ্ধ গাড়িতে চেপে দূরের এক শহরে চলেছেন পুরস্কার গ্রহণ করতে। তাঁর এই যাত্রা নিয়েই পুরো সিনেমা। নিঃসঙ্গতা কাঁধে নিয়ে চলে এই সিনেমার মূল চরিত্র। অহংকার আর আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব চিত্রভাষায় স্পষ্ট। অসাধারণ চিত্রভাষা ছাড়াও শব্দ, আলো, কাব্যিক ছন্দ—সব কিছুতেই অনন্য এই সিনেমা। এটির স্ক্রিপ্ট ব্যার্গম্যান লিখেছিলেন হাসপাতালের বিছানায় বসে। তাই হয়তো সেই একাকী মুহূর্তগুলোর কাব্যিক বর্ণনা সিনেমায় এতটা প্রবলভাবে এসেছিল।

 

দ্য সাইলেন্স, ১৯৬৩ : দুই বোনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, বিচ্ছিন্ন আবেগ, কামনা আর অভিলাষের গল্প ‘দ্য সাইলেন্স’। ‘গড অব সাইলেন্স’ সিরিজের তৃতীয় ও শেষ কিস্তি। ভাবের আদান-প্রদানের অভাবে সারা জীবন পাশাপাশি থাকা দুটি মানুষের মাঝে কতটা দূরত্ব তৈরি হতে পারে তা সিনেমায় তুলে এনেছেন পরিচালক। এ দুটি প্রধান চরিত্রের মধ্য দিয়ে পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, কামনা—সব কিছু এক সুতায় গেঁথেছেন তিনি। ছবিটিতে সংলাপ খুবই কম। অনেক যৌনদৃশ্য থাকায় মুক্তির পর অনেক সমালোচনা জুটেছিল। তবে পরিচালকের কাছে সেটা বাড়াবাড়ি মনে হয়নি। তাঁর মতে, ‘দীর্ঘদিন ধরে অব্যক্ত অনুভূতি হঠাৎ প্রকাশের সুযোগ পেলে তা কতটা প্রকট আকার ধারণ করতে পারে, আমি শুধু সেটাই দেখাতে চেয়েছি।’

 

পারসোনা, ১৯৬৬ : এক রোগী আর তার নার্সের পারস্পরিক নির্ভরতা, অন্তরঙ্গতা, বিদ্বেষ এই সিনেমায় উঠে এসেছে। ছবির মূল দুই নারী চরিত্রকে অনেক সময় একটিই ভাবা হয়। এই ভাবা অমূলক নয়। পরিচালক নিজেই এ সিনেমা নিয়ে বলেছেন, ‘এ সিনেমা একই আত্মার বিভিন্ন স্বরের সমন্বয়।’

 

ক্রাইজ অ্যান্ড হুইসপার্স, ১৯৭২ : ক্যান্সারে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী বোনকে দেখতে আসে অন্য দুই বোন। তাদের অনেক অব্যক্ত অনুভূতি, কথা আবার প্রকাশ পেতে শুরু করে ধীরে ধীরে। একান্তই ব্যক্তিগত বেদনাদায়ক এই মুহূর্তগুলোর জীবন্ত সাক্ষী যেন এই সিনেমা। ‘ক্রাইস অ্যান্ড হুইসপারস’ নিয়ে পরিচালক বলেন, ‘আমি নিঃশব্দে জমে থাকা কিছু রহস্যকে বুঝতে চেয়েছি, যা সিনেমা ছাডা আর কোনো মাধ্যমে সম্ভব নয়।’

 

ফানি অ্যান্ড আলেকজান্ডার, ১৯৮২ : ছোট দুই ভাই-বোনের  চোখ দিয়ে জীবনকে দেখার গল্প। সেমি-অটোবায়োগ্রাফিক্যাল এই সিনেমার আলেকজান্ডার চরিত্রটির ওপর বার্গম্যানের ছোটবেলাকার প্রভাব রয়েছে। ফানি চরিত্রটি তাঁর ছোট বোনের আদলে গড়া। সত্বাবার চরিত্রটিতে তাঁদের বাবার ছাপ আছে। পরিচালকের ছেলেবেলার বিভিন্ন ঘটনার রূপরেখা চরিত্রগুলোতে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্প বলতে গিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে রূপকথার গল্প বলিয়ের স্টাইলটাকে প্রাধান্য দিয়েছেন ছেলেবেলার মনস্তত্ত্ব তুলে ধরতে। ছোটবেলার সরল বিশ্বাস, জটিল সম্পর্কের নিঃশব্দ অবলোকন, দায়িত্ববোধ, কল্পিত ভয়ভীতি কাটিয়ে ওঠার এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা ছিল সিনেমাজুড়ে।

                                                                                          পারসোনা

 



মন্তব্য