kalerkantho


রূ প চ র্চা

গ্রীষ্মের ফল র্চা

বৈশাখের সঙ্গে আসছে প্রচণ্ড গরম, ধুলাবালি, ঘাম আর অ্যালার্জির জীবাণুর টেনশন। একই সঙ্গে গ্রীষ্ম সঙ্গে করে নিয়ে আসছে রসালো ফলের সমাহার। পুষ্টিমানে সমৃদ্ধ এসব ফল খেতে সুস্বাদু আর ত্বকের জন্য উপকারী। এই লেখায় খাদ্যতালিকায় রাখার পাশাপাশি রূপচর্চায় এসব ফলের ব্যবহার জানব আমরা। রূপ বিশেষজ্ঞ শোভন সাহার পরামর্শ তুলে ধরেছেন শম্পা হোসেন

৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



 গ্রীষ্মের ফল র্চা

মডেলঃ মৌসুম, সাজঃ বিন্দিয়া বিউটি স্যালন, ছবিঃ কাকলী প্রধান

আম

ফলের রাজা আমে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’, ভিটামিন ‘বি’, ভিটামিন ‘এ’, মিনারেলস, খাদ্য আঁশ ও বিটা ক্যারোটিন। পাকা আম অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের ভালো উৎস। চমৎকার খাদ্য উপাদানে সমৃদ্ধ আম আমাদের ত্বকের জন্য বেশ উপকারী। ঘরোয়া প্যাক বানাতে ১ টেবিল চামচ পাকা আমের পাল্পের সঙ্গে ১ চা চামচ মুলতানি মাটি, ২ চা চামচ টক দই ভালো করে মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করে নিন। মুখে ও গলায় লাগিয়ে নিন। ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। প্রথমে হাতে অল্প পরিমাণ পানি নিয়ে মুখ ও গলা ভিজিয়ে নিন। আলতো করে ম্যাসাজ করে ফেসপ্যাকটি তুলে ফেলুন। পরিষ্কার ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ত্বক    ধুয়ে নিন।

ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখবে এই ফেসপ্যাকটি। আমের কোলাজেন ত্বকের কোমলতা বাড়াবে। পাশাপাশি এটি ত্বকে বলিরেখা পড়তে বাধা দেবে। কনুই ও হাঁটুর কালো দাগ দূর করতে আমের প্যাক কার্যকর। ২ চা চামচ আমের পাল্পের সঙ্গে ২ চা চামচ লেবুর রস, ১ চা চামচ অলিভ অয়েল, ২ চা চামচ ওটসের গুঁড়া ভালো করে মিশিয়ে নিন। কনুই ও হাঁটুতে ২ মিনিট ম্যাসাজ করে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাকটি ত্বকের রং উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। ফেসপ্যাক তৈরির পর্যাপ্ত সময় না পেলে আম খেতে খেতে এক টুকরা আম হাত দিয়ে ভালো করে চটকে নিয়ে তাতে ২-৩ ফোঁটা মধু মিশিয়ে ত্বকে লাগাতে পারেন। ১০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলবেন। আমের পাল্প করার সময় বেছে নিন লালচে রঙের মিষ্টি আম। চুলের যত্নেও আমের সুফল রয়েছে। রসালো পাকা আমের পাল্পের সঙ্গে সমপরিমাণ টক দই ও অল্প আমন্ড অয়েল মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। সমস্ত চুলে লাগিয়ে আধা ঘণ্টা পর শ্যাম্পু করে নিন। খুশকির উপদ্রব কমবে। নিয়মিত ব্যবহারে চুলের রুক্ষতা কমে গিয়ে নরম ও সিল্কি হয়ে উঠবে চুল।

 

তরমুজ

৯০ শতাংশ পানিসমৃদ্ধ এই ফলটি শরীরের পানির ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে। ভিটামিন ‘এ’, ভিটামিন ‘সি’, পটাসিয়াম, ফাইবার ও কার্বোহাইড্রেটে সমৃদ্ধ তরমুজ ক্লান্তি কাটাতে সাহায্য করে। পানির চাহিদা পূরণ করে কিডনি সুরক্ষিত রাখে। গরমে হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা কমায়। ক্যালরি কম থাকায় ওজন নিয়ন্ত্রণ করে। ত্বকের ভেতর ও বাইরে সমানভাবে কোমল রাখে। তরমুজের রস ত্বকের রোদে পোড়া কালচে ভাব দূর করতে বেশ কার্যকর। ৪ চা চামচ তরমুজ রসের সঙ্গে মেশান ২ টেবিল চামচ লেবুর রস এবং ১ টেবিল চামচ মধু। আইস ্বক্সে রেখে বরফের কিউব বানিয়ে নিন। রোদ থেকে ফিরে প্রথমে ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে ফ্রিজে রাখা তরমুজের কিউব মুখে ঘষে ১৫ মিনিট পর স্বাভাবিক পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। মুখ মুছে ময়েশ্চারাইজার লাগান।

তৈলাক্ত ত্বকের জন্য তরমুজ আদর্শ। ত্বকের তৈলাক্ত ভাব ও ব্রণের সমস্যা দূর করবে। শুষ্ক ত্বকের জন্য এই প্যাকের সঙ্গে আধা টেবিল চামচ অলিভ অয়েল বা আমন্ড অয়েল মিশিয়ে নেবেন। শুষ্ক ত্বকে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের আগে তরমুজের রস টোনার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। যেকোনো ত্বকের জন্য বাজারের কেনা ফেসওয়াশ বা ক্লিনজারের বদলে তরমুজ দিয়ে হতে পারে চমৎকার ঘরোয়া ক্লিনজার। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য ১ টেবিল চামচ তরমুজের রসের সঙ্গে ২ চা চামচ লেবুর রস ও ১ টেবিল চামচ বেসন মিশিয়ে ক্লিনজার বানিয়ে নিন। মুখে, গলায় ও হাতে মেখে হালকা হাতে ম্যাসাজ করে ১০ মিনিট পর পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। শুষ্ক ত্বকের অধিকারীরা এই ক্লিনজারের সঙ্গে ১ চা চামচ গুঁড়া দুধ মিশিয়ে নিলেই হবে।

বাঙ্গি

বাঙ্গিতে আছে মিনারেলস, প্রো ভিটামিন ‘এ’, পটাসিয়াম ও ফাইবার। সব ধরনের ত্বকের যত্নে এই ফল কার্যকর। এটি কালচে ভাব দূর করে ত্বককে কোমল রাখতে সাহায্য করে। সপ্তাহে ২ দিন রাতে শোয়ার আগে বাঙ্গির স্ক্র্যাবার ব্যবহার করতে পারেন। ১ টেবিল চামচ বাঙ্গির পাল্পের সঙ্গে আধা টেবিল চামচ টক দই, ১ চা চামচ ওটসের গুঁড়া ও ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে ত্বকে সার্কুলার মুভমেন্টে (ঘড়ির কাঁটার দিকে) কয়েক মিনিট ম্যাসাজ করুন। ১০ মিনিট ত্বকে রেখে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। এরপর একটি আইস কিউব সুতি কাপড়ে মুড়ে ভেজা ত্বকে ঘষুন। সব শেষে ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার লাগান। নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের বলিরেখা কমাতে সাহায্য করে এই ফল। বাঙ্গির পাল্পের সঙ্গে মসুর ডালের গুঁড়া ও মধু মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। ত্বকে লাগিয়ে ২৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে তিন দিন ব্যবহার করুন। এভাবে প্যাক বানিয়ে কয়েক দিন ফ্রিজে রেখে ব্যবহার করতে পারেন। শ্যাম্পুর পর প্রাকৃতিক কন্ডিশনার হিসেবে বাঙ্গির পাল্প ব্যবহার করুন। ১০ মিনিট অপেক্ষা করে পরিষ্কার পানি দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। বাঙ্গির কন্ডিশনার চুল পড়া কমাতেও সাহায্য করবে।

আনারস

প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’র পাশাপাশি আনারসে রয়েছে ভিটামিন ‘বি২’, ‘বি৩’, ‘বি৫’ ও ‘বি৬’। এ ছাড়া আছে ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, কপার, বিটা ক্যারোটিন ও ফলিক এসিড। ত্বকের যত্নে আনারসের দারুণ ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে ত্বক পরিষ্কার এবং ত্বকে আর্দ্রতা জোগাতে এই ফল উপকারী। ১ চা চামচ আনারসের রসের সঙ্গে আধা চা চামচ মধু, ২ চা চামচ গোলাপ জল ও ১ চা চামচ ময়দা মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। ত্বকে লাগিয়ে ৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। হালকা ম্যাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন। এতে ভেতর থেকে পরিষ্কারের পাশাপাশি ত্বক হবে কোমল। তৈলাক্ত ও ব্রণযুক্ত ত্বকের জন্য আনারসের রসের আইস কিউব বেশ কার্যকর। দিনে দুইবার ত্বক পরিষ্কারের পর আনারস দিয়ে বানানো বরফ টুকরা পুরো মুখে হালকা হাতে ঘষে নিন। ১০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। ত্বকের তৈলাক্ততা ও ব্রণ দুই-ই কমবে। শুষ্ক ত্বকের জন্য ২ টেবিল চামচ আনারসের রসের সঙ্গে ১ টেবিল চামচ মধু ও কয়েক ফোঁটা অলিভ অয়েল মিশিয়ে লাগান। ২০ মিনিট অপেক্ষা করে কুসুম গরম পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। তারপর ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে ঘুমাতে যান। সপ্তাহে ৪ দিন ব্যবহারে ত্বকের শুষ্কতা কমে আসবে অনেকখানি।

কলা

কলায় রয়েছে পটাসিয়াম যা ত্বকের নমনীয়তা রক্ষার জন্য কার্যকর। পটাসিয়ামের ঘাটতির জন্য ত্বকে শুষ্কতা দেখা দিতে পারে। ত্বক ও চুলের যত্নে জাদুকরী ফল বলা হয় কলাকে। রুক্ষ-শুষ্ক ত্বকে কলার পেস্টের সঙ্গে দুধ ও মধু মিশিয়ে প্রতিদিন ব্যবহার করুন। ত্বকের মেছতার জন্য কলা ও মধুর মিশ্রণ ব্যবহার করুন। শুষ্ক ত্বকের জন্য ঘরোয়া ক্লিনজার হিসেবে কলা ও কাঁচা দুধ ব্যবহার করতে পারেন। তৈলাক্ত ত্বকে চন্দন গুঁড়ার সঙ্গে কলার প্যাক কার্যকর। তৈলাক্ততা কমবে, ত্বক উজ্জ্বল হবে। ত্বকের কালচে ভাব বা দাগ-ছোপ কমাতে কলার সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে ত্বকে লাগান। কলার পেস্টের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে সপ্তাহে ১ দিন ত্বকে স্ক্র্যাবিং করা যেতে পারে। হলদে দাঁত ঝকঝকে সাদা করতে সপ্তাহে ১ দিন কলার খোসার ভেতরের দিক দিয়ে দাঁত ঘষুন। চুল চর্চায়ও কলার গুণের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। নরম রেশমি চুলের জন্য ডিমের সাদা অংশ, কলা ও অলিভ অয়েল মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। চুল পড়া কমাতে নারিকেল দুধের সঙ্গে কলা ও লেবুর রস মিশিয়ে সপ্তাহে ১ দিন মাথায় লাগান। ঘরেই চুলের প্রোটিন ট্রিটমেন্ট করতে চাইলে ১টি পাকা কলার সঙ্গে ১ চা চামচ মধু, ১ চা চামচ টক দই মিশিয়ে ব্লেন্ড করুন, সঙ্গে ১টি ডিম। চুলের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত লাগিয়ে ৩০ মিনিট রাখুন। শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলুন।

স্ট্রবেরি

স্ট্রবেরিতে থাকা ফলিক এসিড ও ভিটামিন ‘সি’ ত্বকে কোলাজেন তৈরি করে প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা জোগায়। শুষ্ক ও মিশ্র ত্বকের জন্য স্ট্রবেরি অনেক উপকারী। ১ টেবিল চামচ স্ট্রবেরির পাল্পের সঙ্গে ২ চা চামচ মধু, ১ চা চামচ বেসন মিশিয়ে ত্বকে লাগান। ১৫ মিনিট রেখে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। আধা কাপ স্ট্রবেরি পাল্পের সঙ্গে ২ টেবিল চামচ মধু ও ২ টেবিল চামচ নারিকেল তেল মিশিয়ে স্কাল্প ও চুলে লাগান। ২০ মিনিট পর শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলুন। চুল পড়া রোধ করতে এবং চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এই প্যাক কার্যকর।

বেল

পুষ্টিমানে ভরপুর গ্রীষ্মের ফল বেল। এতে আছে প্রোটিন, বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন ‘সি’সহ নানা রকম পুষ্টি উপাদান। ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হার্ট ভালো রাখতে সাহায্য করে এই ফল। গ্যাস্ট্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে। ত্বকের র‌্যাশ কমাতেও বেল বেশ কার্যকর। বেল বা বেলের শরবত যেমন শরীরের জন্য উপকারী, তেমনি ত্বকে ব্যবহারেও নিরাপদ। গরমে র‌্যাশের সমস্যায় বেলের ক্বাথের সঙ্গে মুলতানি মাটি মিশিয়ে প্যাক হিসেবে ব্যবহার করুন। নিয়মিত ব্যবহারে উপকার মিলবে।

খেয়াল রাখবেন

♦    ত্বক বা চুলে ব্যবহারের জন্য তাজা ও ভালো ফল দেখে নিন। ত্বক একটি সংবেদনশীল অঙ্গ। পচা বা আগের কেটে রাখা ফল ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ।

♦    আশানুরূপ ফল পেতে যেকোনো প্যাক নিয়মিত ব্যবহার করতে হবে।

♦   সব প্যাক সবার ত্বকে মানায় না। আপনার ত্বকে যে প্যাক মানায় সেটিই ব্যবহার করুন।

♦    প্রথমবার ব্যবহারে ত্বকে কোনো রকম সমস্যা বোধ করলে সেই প্যাকটি ব্যবহার বন্ধ করে দিন।

♦    পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়ার পর নরম টাওয়েল দিয়ে চেপে পানি মুছে নিন। কখনো ত্বক মুছবেন না। অবশ্যই ধোয়ার পর ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগাতে ভুলবেন না।

♦    ফ্রিজে রাখা ফলের রস বা যেকোনো ধরনের প্যাক বেশিদিন ব্যবহার করবেন না। নরমাল ফ্রিজে রাখলে সর্বোচ্চ ৩ দিন এবং ডিপ ফ্রিজে রাখলে ৭ দিন ব্যবহার করতে পারেন।


মন্তব্য