kalerkantho


শুধু কবিতার জন্য

ইফতেখারুল ইসলাম

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শুধু কবিতার জন্য

‘একা এবং কয়েকজন’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম কবিতার বই। আর সে বই প্রকাশের প্রায় পনেরো বছর পর ওই একই নামে তিনি লিখেছেন একটি দীর্ঘ উপন্যাস।

উপন্যাসটি সম্পূর্ণ আলাদা। তবু এই ব্যাপারটার একটা তাত্পর্য আছে বলে মনে হয়। বহু ক্ষেত্রে একই ভাবনা, একই ছবি তিনি নির্মাণ করেছেন বারবার, কবিতায় ও গদ্যে।
প্রথম কবিতার বই থেকে অপার বিস্ময়ে দেখা জন্ম ও জীবনের শুরু, তারপর ক্রমান্বয়ে পরিণতির দিকে তাঁর যাত্রা এবং শেষ পর্যন্ত বিদায়ের প্রস্তুতি। অথচ তাঁর লেখার সূচনালগ্ন থেকে সর্বশেষ কবিতা পর্যন্ত তুমুলভাবে যা উপস্থিত তা হলো জীবন, এর সহস্র কোলাহল, এর যাবতীয় মাধুর্য, জটিলতা, রহস্য ও পঙ্কিলতা।
২০০৭-এ কৃত্তিবাসের সম্পাদকীয় রচনায় প্রয়াত সম্পাদক শান্তি লাহিড়ি প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে সুনীল নিজের একটি কবিতাকে কয়েক মিনিটে লেখা অকিঞ্চিত্কর কবিতা বলে অভিহিত করেছেন। কৃত্তিবাসের সেই গদ্য রচনাটির শিরোনাম ‘সম্পাদকের কলমে’। প্রকাশিত হয় কৃত্তিবাস পত্রিকার নবপর্যায়ের দ্বাবিংশ সংখ্যায়; এপ্রিল-জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা ১২। এই লেখায় যে কবিতাটিকে তিনি অকিঞ্চিত্কর বলেছেন, সেটি কিন্তু কোটি পাঠকের প্রিয় এবং অবিস্মরণীয় কবিতা। ‘কেউ কথা রাখেনি’ নামের সেই ‘সামান্য কবিতা’ যেমন এ দেশের অগণিত পাঠককে দীর্ঘকাল ধরে মোহাবিষ্ট করে রাখে, তেমনি মৃত্যুর ঠিক আগের বছর একটি শারদীয় পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সন্ধের দিকে একা’ কবিতাটিও স্পর্শ করে বহু পাঠকের বিষাদিত হূদয়। সে কবিতায় সুনীল লেখেন—
‘কবিদের এই এক মজা, দুদশজন পাগল ভক্ত তাঁদের ফুলদুব্বো দেয়।
    বাকি বিশাল জনতার কাছে তাঁদের অস্তিত্বই নেই। ’
(সন্ধের দিকে একা, বালুকণার মতন অসামান্য, সিগনেট প্রেস, কলকাতা, ডিসেম্বর, ২০১১)
এই কবিতায়ই তিনি চলে যাওয়ার কথা লেখেন এবং স্পষ্ট করে বলেন ‘...আবার দেখা হবে। ’ কবিতার শিরোনাম থেকে শেষ পর্যন্ত স্পষ্টতই বিদায়ের সুর। বিষাদময় নির্জনতার চিহ্ন।
শব্দ নিয়ে কত রকম খেলা যে তিনি করেছেন, তার অসাধারণ সব উদাহরণ ছড়িয়ে আছে তাঁর সারা জীবনের কবিতায়। পরে তিনি নিজেই প্রথম জীবনের কিছু কবিতাকে কাঁচা লেখা হিসেবে খারিজ করে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু চাইলেও তাঁর সমগ্র কবিতা বা নির্বাচিত কবিতা থেকে এগুলো ছেঁটে ফেলা যাবে না। অতীত দিনের ‘কিছু পাগলামি’ তাঁর কবিতায় স্থায়ী হয়ে গেছে। যেমন কিছু কবিতায় রয়েছে তাঁর নবীন বয়সের কৌতুককর শব্দখেলা।
‘ঘুমুবার আগে চুরুট, ঘুমের গভীরতা ও জাগরণ
ছ লক্ষ এলার্ম ঘড়ি কলকাতার হিম আস্তরণ
ভাঙ্গার আগেই আমি, অর্থাত্ নিখিলেশ, টেলিফোনে নিখিলেশ অর্থাত্ সুনীলকে
ডেকে বলি, তুই কি রোজ কন্ডেন্সড মিল্কে
চা খেতিস?’
(জুয়া, আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি)

এর কয়েক বছরের মধ্যেই নিজের পরিণত বয়স, খ্যাতি এবং স্বীকৃতির কথা বিবেচনা করে অন্য এক কবিতায় নিজেকেই যেন সতর্ক করেছেন। অবশ্য সেখানে লেগে আছে খানিকটা আক্ষেপের ছোঁয়া।
‘হসন্তকে একমাত্রা ধরা হবে কি না এই তর্কে আর ফাটাবো না চায়ের টেবিল আর কি কখনো আমি সুনীলকে মিল দেবো কন্ডেন্সড মিল্কে? ...
কবিতার খাতা খুলে চুপে চাপে লিখে রাখি গতকাল পরশুর কিছু পাগলামি। ’(কিছু পাগলামি, দেখা হলো ভালোবাসা বেদনায়)এখানে ‘চুপে চাপে’ কথাটা অনেকটাই পূর্ববঙ্গীয়। আমাদের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। আমাদের দেশের কোনো কোনো কবিতায় এ রকম উদাহরণ থাকলেও ওই সময়ের কলকাতার আর কারো কবিতায় এ রকম শব্দ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাঁর কবিতার ছোট ছোট বাক্যবন্ধ, একটি-দুটি লাইন, কাব্যগ্রন্থের নাম, নীরা ও নিখিলেশ এমনভাবে আমাদের স্পর্শ করেছিল যে তা ভুলে যাওয়া অসম্ভব। দেশের খ্যাতিমান লেখক বন্ধুরা আরো ভালোভাবে বলতে পারবেন, কিভাবে সুনীলের রচনা আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল। এর শুরু আমাদের স্বাধীনতার পর থেকে আর শেষ যে কখন, সেটি বলার সময় এখনো আসেনি বলেই মনে হয়। আমরা যারা বাংলাদেশের জন্ম দেখেছি, সুনীলের কবিতার বিভিন্ন পর্যায় প্রত্যক্ষ করেছি, আর তাঁর লেখা পড়ে বড় হয়েছি, তাদের কাছে সাড়ে তিন হাত ভূমি একটি ক্ষুদ্র সমাধি নয়; বরং সমগ্র দেশ। আমাদের মনে পড়বেই কৈশোরের সেই সব অবিস্মরণীয় লাইন। ‘বিষণ্ন আলোয় এই বাংলাদেশ নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ—
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো আমি বিষ পান করে মরে যাবো। ’      (যদি নির্বাসন দাও, আমার স্বপ্ন)
‘আমার স্বপ্ন’ নামের এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অল্প কিছুদিন পর ১৯৭২ সালে। দেবারতি মিত্র ও সুব্রত রুদ্রর সঙ্গে বেলাল চৌধুরী—এই তিনজনকে উত্সর্গ করা হয়েছিল কবিতার বইটি। এই বইতেই আছে ১৯৭১ নামের ঐতিহাসিক ও মর্মস্পর্শী কবিতা, যা প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া অন্য কারোর পক্ষে লেখা সম্ভবপর বলে মনে হয় না। ‘মা, তোমার লাবণ্যকে খুঁজেছি প্রান্তরময়, বাঙ্কারে, ফক্সহোলে ছেঁড়া ব্রা, রক্তাক্ত শাড়ি, লুণ্ঠিতা সতীর মতো চিহ্ন পড়ে আছে। ’ (১৯৭১, আমার স্বপ্ন)
এখানে মাত্র দুটি লাইনের মধ্যে আছে তিনটি ইংরেজি শব্দ। ওই কবিতার আগে কোনো বাংলা কবিতায় ওরকম কোনো শব্দ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে, তাত্ক্ষণিক দৃশ্যের প্রভাবে সুনীলের কবিতায় যেমন এই ইংরেজি শব্দগুলো ঢুকে পড়ে, তেমনি আমাদের দেশের কবিতায় অবলীলায় যুক্ত হয় গেরিলা, বাংকার, গ্রেনেড, স্টেনগান ইত্যাদি শব্দ। আমাদের ভূখণ্ডের ওই কালপর্বটি কোনো প্রত্যক্ষদর্শী কোনো দিন ভুলতে পারবে না। সুনীলের কিছু কিছু গদ্য রচনায় রয়েছে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যুদ্ধ শেষের দিনগুলোয় তাঁর যশোর-খুলনা অঞ্চলে আসার গল্প। সেই কাল ও ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তিনি নিপুণভাবে কবিতায় মিশিয়ে দিয়েছেন।
কবিতার প্রতি স্থায়ী ভালোবাসা আর কবিতা রচনার বেদনা ও আনন্দ নিয়ে সুনীলের অসাধারণ কিছু গদ্য রচনা রয়েছে।
‘কেন কবিরা এই দুঃখের জীবন বরণ করে নেয়? খ্যাতি কিংবা অমরত্বের লোভে?...মৃত্যুর পর পোকায় খাওয়া হলদে বইয়ে নাম রেখে যাওয়ার জন্য এ জীবনটা নষ্ট করে কে?...ভালো করে ভেবে দেখতে গেলে, বিকারগ্রস্ত কিংবা উন্মাদের সঙ্গে তার ব্যবধান অতি সামান্যই, তাকে অনায়াসেই ভূতগ্রস্ত বলা যায়। ’
(কবিতার সুখ দুঃখ, দেশ সাহিত্য সংখ্যা ১৩৭৯, মে ১৯৭২, পৃষ্ঠা ২৬৮) এটা আরো স্পষ্ট করে বোঝানোর জন্যই একসময় তিনি কবিতায় লিখেছিলেন :
‘শুধু কবিতার জন্য এত রক্তপাত, মেঘে গাঙ্গেয় প্রপাত শুধু কবিতার জন্য, আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়। মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা, শুধু কবিতার জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি। ’ (শুধু কবিতার জন্য, আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি) এসব কবিতার বেশির ভাগই তাঁর প্রথম পর্যায়ের লেখা। আমেরিকার আইওয়াতে রাইটার্স ওয়ার্কশপ সেরে দেশে ফিরে আসার পর সাহিত্যের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার তীব্রতর হয়েছিল। সে সময়ের বেশির ভাগ কবিতা, কিছু কিছু উপন্যাস, কয়েকটি ছোটগল্প ও অন্যান্য রচনার মধ্য দিয়েই সুনীল পৌঁছেছিলেন খ্যাতির শীর্ষে। তারপর আমৃত্যু তিনি রয়ে গেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে সেই শীর্ষস্থানটিতে। একই রকম অসাধারণ ও স্মরণীয় কবিতা লিখেছেন জীবনের শেষ বছরগুলো পর্যন্ত। মৃত্যুর আগের বছর, ২০১১ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতার বই ‘বালুকণার মতন অ-সামান্য’। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে প্রকাশিত হয়েছে এই বইটি। পঞ্চাশ বছর একজন কবি ও তাঁর কবিতার অগ্রযাত্রা এবং পরিণতির জন্য বেশ দীর্ঘ সময়। পঞ্চাশ বছর পরেও কেন সুনীল প্রাসঙ্গিকতা হারাননি, কেন তাঁর কবিতা আমাদের পড়তে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে দিয়েছে এই বই। ছোট কবিতা, অণুকবিতা, গদ্য কবিতা, দীর্ঘ কবিতা এবং সিরিজ কবিতার আকর্ষণীয় এক সংকলন এটি। ‘বালুকণার মতন অ-সামান্য’ নামের কবিতাটিতে আবার উল্লেখ করেছেন প্রথম যৌবনের পিরামিডের ভেতরের স্মৃতি। আর সেই সময়ের স্মৃতি যখন বার্লিন দেয়াল ভাঙা হচ্ছে আর সুনীল সেখানে উপস্থিত। মাঝরাতে...
‘...হঠাত্ আমার নাম ধরে কেউ ডাকলো দুবার বাংলায় আমাকে ডাকার মতন কেউ নেই সেখানে তা তো আমি জানিই তবু এই যে মনের ঝলক তাতেই বুঝতে পারি একটা বালুকণার মতন সামান্য হলেও আমিও এই আবহমান মানবসভ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছি!’ (বালুকণার মতন অ-সামান্য, বালুকণার মতন অ-সামান্য, সিগনেট প্রেস, কলকাতা, ডিসেম্বর ২০১১)
আবহমান মানবসভ্যতার সঙ্গে যুক্ত বলেই একজন কবির জীবন ‘অ-সামান্য’ হয়ে ওঠে। আমরাও যুক্ত হয়ে থাকি পাঠক হিসেবে। প্রিয় কবির সঙ্গে।

 


মন্তব্য