kalerkantho


রিয়ালিটি শো

হাসান অরিন্দম

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রিয়ালিটি শো

অঙ্কন: মানব

পজিশনটা তার খুব ভালো ছিল, বেশ মোটাতাজা হলদে কুকুরটার হাতখানেক আগে, টাইমিংটাও ছিল পারফেক্ট। ভুঁড়িওয়ালা মানুষটি কুকুরটার দিকে গরম পরোটাটা ছুড়ে দিলে পাগলবেশী লোকটা খপাত করে ধরে ফেলল।

কুকুরটা দুই হাত দিয়ে পাগলটার পরোটা খাওয়ার কৌশল দেখে খানিক চোখ পিটপিট করল। ভুঁড়িওয়ালা কুকুরটাকে এবার একটু নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে তার সামনে আরেকখানা পরোটা রাখতে রাখতে বলছিল, ‘শালার পাগল-ছাগলের জন্যি কুকুডারেও খাওয়ানোর উপাই নেই। নে, খা এবার। ’

ওদিকে পাগলটা সয়াবিন-ডালডায় ভাজা পরোটা খেতে খেতে ভুঁড়িওয়ালার পিছু নেয়। ভুঁড়িওয়ালা তখন আলীবাবা মডার্ন হোটেলের ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল। লোকটার রোমশ হাত ধরে পাগলটা বলল, ‘কাকা এট্টা মিষ্টি খাব, দেন না। ’ ভুঁড়িওয়ালা পাগলের দিকে কটমট করে তাকালে ও পিছিয়ে যায়।

এ দৃশ্য দেখে হোটেলের ক্যাশে বসা সামনের ছোকরা ওয়েটারকে বলল—‘এই, ওরে দুডো মিষ্টি দিয়ে বিদায় কর তো। ’

ওয়েটার মিনিট দুই পরে পাগলের হাতে দুটি কালোজাম তুলে দিলে পাগলটা প্রথম মিষ্টিটা গব করে মুখে দিয়ে গিলতে গিয়ে বুঝতে পারল, দুদিন আগেকার মিষ্টি দিয়েছে তাকে।

ফলে মুহূর্তে জিহ্বা আর তালুতে একেবারে টক ভাব ছড়িয়ে গেছে, তবু সে বাকি মিষ্টিটাও ভেতরে চালান করে দিল।

দেখে মনে হয় বয়স ত্রিশের মতো হবে, গায়ের রং ফরসার দিকে, স্বাস্থ্য একেবারে মন্দ নয়। মাথার চুল বিশেষ বড় না হলেও ধুলো-ময়লায় ভীষণ চিটচিটে। ঠোঁটের দুই পাশে ঘায়ের হলুদ-সাদা কষানির দাগ। তবে হঠাত্ তাকালে প্রথমে পাগলটার কোমরের দিকেই দৃষ্টি যায়। কোমরে বেল্টের মতো নাইলনের দড়ি বাঁধা। দড়ির চারপাশে বৃত্তাকারে নানা রং ও আকৃতির প্লাস্টিকের বোতল ঝুলছে।

রাজীব হিসাব কষে দেখে, আজ এভাবে এই বেশে কত ঘণ্টা হলো। মার্চ মাসের শেষেই সে ঠিক করে ফেলেছিল আগামী সামার ভ্যাকেশনের প্ল্যান। পড়াশোনায় বিশেষ ভালো কখনোই ছিল না সে। জেলার সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পড়াটা মেনেই নেওয়ার কথা তার, নিয়েও ছিল। দ্বিতীয়বার তার কিছু ভালো ছাত্র উচ্চাকাঙ্ক্ষী বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবার দৌড়ঝাঁপ করতে লাগল। তাদের কেউ বলল, ‘রাজীব তুই চল আমাদের সঙ্গে, সময়টা ভালো কাটবে। ’

সে ভাবল, বাড়িতে বসে থেকেই বা কী লাভ, তাই তার সম্মতি না দেওয়ার কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু কে জানত, মজা করে পরীক্ষা দিতে গিয়ে ওয়েটিং লিস্ট থেকে মঙ্গলজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানে তার চান্স হয়ে যাবে! বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটা তার ভীষণ ভালো লেগে যায়। পাহাড়ি লাল মাটি, নীলজল হ্রদে মাছের নির্ভয় বিচরণ, বিস্তৃত শাল-সেগুনের বন, রাস্তার দুই ধারে রাধাচূড়া-কদম-মহুয়ার সারি, বিচিত্র-বর্ণিল পাখির কিচিরমিচির তার ভেতর কেমন নেশা নেশা ভাব ধরিয়ে দিত। যেদিন রাতে পূর্ণিমা হতো, সারা রাত ঘুমাত না সে—বন্ধুদের বদান্যতায় সিগারেটটা বেশিই ফোঁকা হতো। হলের ছাদে শুয়ে থেকে, শালবনে কিংবা লেকের ধারে সবুজ ঘাসের ওপর প্রায় শেষ রাত অবধি কেটে যেত তার। ক্যাম্পাসে মাস চারেক পেরোলে মঙ্গলজ্ঞান নাট্যকেন্দ্রে যোগ দিয়ে রাজীব জীবনটাকে আরো নতুনভাবে, বিচিত্ররূপে উপভোগ করতে থাকল। মুক্তমঞ্চে নির্বাচিত নাটক পাঠ, সংলাপ মুখস্থ করা, রিহার্সাল, মেকআপ, লাইট, মাঝেমধ্যে সবাই মিলে তুমুল আড্ডা রাজীবের ভেতর থেকে নতুন এক সপ্রতিভ মানুষকে টেনে বের করে আনত প্রতিনিয়ত।

পরিবারে এখনো পর্যন্ত রাজীবের ছাপ্পান্ন বছর বয়সী বাবাই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাপ আর্মির সিপাই ছিল, অনেক আগেই সেই চাকরি থেকে অবসর শেষে ঢাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টের ম্যানেজার। গার্ড, লিফটম্যান, মিস্ত্রিদের দেখাশোনা; ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের এটাসেটা করে দেওয়ার দায়িত্ব তার। এ চাকরিতে মাসে যে সাত-আট হাজার টাকা পকেটে আসে, নিজে খেয়ে-পরে বাড়িতে পাঠায় সাড়ে চার হাজার, আর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে রাজীবকে পাঠায় মাসে সাত শ করে। সে টাকায় রাজীব না পারে বাঁচতে, না পারে মরতে। তিন বেলা খেতেও তো এর কমপক্ষে চারগুণ টাকার দরকার হয়। ওর পোশাক-আসাক দেখে পেছনে বন্ধুরা নানা কথা বলে। আর যারা ভালোবাসে তারা দু-একটা কিনেও দেয়। রাজীব তবু এ জীবনটাকে ঘেন্না করে না, ভালোই বাসে। সে ভালোবাসে পৃথিবীর আকাশ-মাটি-জল, পাখি-মাছ—সব কিছু। এ জন্য নিজেকে নানা কাজে-অকাজে ব্যস্ত রাখতে চায়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত অকাজটাই বেশি হয়, তা দিয়েই নিজেকে ব্যস্ত রাখে। কিছুদিন তার শখ হলো থাবা মেরে শালিক ধরার। শেষ বিকেলে লেকের ধারে মাঠটায় পোকা কিংবা কেঁচোর সন্ধানে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে শালিক। একদিন রাজীবের মনে হলো, থাবা দিয়ে সে ওদের ধরবে। একটা পাখি টার্গেট করে থাবা মারে, কিন্তু ঝাঁকবেঁধে সবগুলো পালিয়ে যায়। খানিক বাদে ওরা আবার উড়ে এসে বসলে রাজীব সন্তর্পণে হামাগুড়ি দিয়ে তাদের পিছু নেয়। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে ১১তম দিনে সে সফল হয়। একসময় ওরা চিনে ফেলে তাকে। ভয় না পেয়ে ওর কাঁধে-মাথায় এসে বসে। দূর থেকে ক্যাম্পাসের ছেলে-মেয়েরা ওর কাণ্ড দেখে ভারি মজা পেত, মোবাইলে ছবি তুলত।

সত্যিকার অর্থে বন্ধুদের মধ্যে রাজীব মজা করতে সবচেয়ে ওস্তাদ। আড্ডা জমলে কৌতুক, চুটকি, জারি, বাউল, প্যারোডি, খেমটা নাচ—সবই বের হয় ওর ভেতর থেকে। একসময় ও একাই চালিয়ে যায়, অন্যরা তখন শুধু দর্শক। আড্ডা দিতে দিতেই কখনো কখনো বাদাম, ডালপুরি, চা চলে আসে। কখনো আবার দুপুর বা রাতের খাবারটাও জুটে যায় অন্যের প্রীতি কিংবা অনুগ্রহের পয়সায়। এর মধ্যে নাটকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তার সংকোচ কেটে যায়, প্রাণের স্ফূর্তি বাড়ে। মেকআপটাও সে শিখে নিয়েছিল ভালো করে, এর কিছু উপকরণও থাকে তার কাছে। তাই রাজীব এবার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আগামী গ্রীষ্মের ছুটিটায় একটা চ্যালেঞ্জিং লাইফ লিড করবে। জীবনটাকে একটু উল্টে-পাল্টেও দেখা হবে।  

প্রথম দুদিন একটু সংকোচ ছিল, সঙ্গে ভয়ও—কেউ যদি চিনে ফেলে কিংবা যদি তার ছদ্মবেশ ধরা পড়ে যায়, বলা যায় না—এ দেশের পাবলিক নগদে প্যাঁদানি দিতে ওস্তাদ। তবে প্রথম দুদিন তেমন কোনো ঘটনা না ঘটায় তৃতীয় দিন থেকে আত্মবিশ্বাসটা পুরোপুরি চাঙ্গা হয়ে যায়। ‘বোতল-পাগল’ খেতাবটা প্রথম দুদিনেই জুটে যায় পাবলিকের কাছ থেকে। কলা, বিস্কুট, শিঙাড়া, বাদাম—এসব যত সহজে লোকে হাতে তুলে দেয়, ভাত পাওয়টা সহজ নয়। প্রথম দিন কেউ দেয়নি ভাত খেতে। একজনকে বলেছিল, ‘ভাইজান, ভাত খামু, ভুক লাগছে। ’ সে তার হাতে ২০ টাকার একটি নোট তুলে দেয়। কিন্তু তাকে ওই বেশে কেউ হোটেলে ঢুকতে দেয়নি। এর মধ্যে একটি বালিকার আধখাওয়া এঁটো আইসক্রিম, বাসি শিঙাড়া, কালচে ধরা সাগর কলা উদরপূর্তি করতে হয়েছে। ধূমপানের ব্যাপারটা সহজই ছিল। চাইলেই লোকে আধখাওয়া জ্বলন্ত সিগারেট ছেড়ে দেয় তার হাতে। তা ছাড়া এই বেশে বিড়ি-সিগারেটের পাছা কুড়িয়ে টানলেও বেশ মানায় তাকে। চতুর্থ দিনে সে সুপারভাইজারের দৃষ্টি এড়িয়ে দূরপাল্লার মাঝারি গোছের একটা বাসে উঠে পড়ে। মাইল চারেক চলার পর সুপারভাইজার ব্যাপারটা খেয়াল করে গাড়ি থামিয়ে পাগলটাকে টেনে নামিয়ে দিতে চায়। তখন সে ড্রাইভাইরের দিকে হাত জোড় করে বোবার মতো ইঙ্গিত করে কী যেন দেখাতে চায়। ড্রাইভার ও সামনের দুজন যাত্রী দয়াপরবশ হলে সে আবার পেছনের সারির সিটে বসার সুযোগ পায়। দুটি জেলা পেরিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ে সে।

৩১তম দিনে ২৪টা জেলা ঘোরা হয়ে যায় তার। ঝোলাটা বের করে নোট ও খুচরা পয়সাগুলো হিসাব করে দেখে, প্রায় আড়াই হাজার টাকা জমা হয়েছে। এবার শেষ পাঁচ-ছয়টা দিন বাড়িতে কাটিয়ে তবে সে ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকা থেকে মায়ের জন্য একটি শাড়ি, ভাইদের জন্য একটি করে সুতি শার্ট আর ১০টা কমলা কিনে নিয়ে সে ভদ্রবেশে কমলাপুর স্টেশন কাউন্টার থেকে ১৮০ টাকা দিয়ে একটি টিকিট কিনে বাড়ির পথ ধরে। ট্রেন থেকে নেমে প্রতিবার স্টেশন থেকে আধা মাইল পথ হেঁটেই যায় সে। এবার ১০ টাকা ভাড়ায় রিকশা ঠিক করল, পথে রিকশা থামিয়ে ‘আসল বাগাট ঘোষ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ থেকে এক কেজি চমচমও কিনে নিল।

বাড়ির লোকরা তো রাজীবকে দেখে থ। সবার প্রশ্ন—সে টাকা পেল কোথায়। টিউশনি বা চাকরিটাকরি নিয়েছে? নাকি পড়াশোনা বাদ দিয়ে কোনো ধান্দাবাজিতে জড়িয়ে পড়ল—ছিনতাই কিংবা চোরাকারবারি অথবা কোনো দালালির কাজ?

  মা বলল—‘রাজীব, তুই যদি সত্যি কথা না বলিস এ শাড়ি আমি কোনো দিন স্পর্শ করব না। তোর ভাইয়েরা কেউ পরবে না তোর দেওয়া জামা। ’

রাজীব চৌকিতে বসা মায়ের কোলে মাথা রাখল। ‘মা আমি তোমার এই পেটে তিলে তিলে বড় হয়েছি, আমাকে আজও চিনতে পারলে না তুমি?’

অনেক দিন পর রাজিয়া খাতুন এই ছেলেকে কাঁদতে দেখলেন। তিনিও পুত্রের সিক্ত চোখে চোখ রেখে অশ্রু সংবরণ করতে পারলেন না। বললেন, ‘থাক আর বলতে হবে না। তোর চোখ বলছে, তুই কোনো পাপের পথে পা রাখিসনি। একদিন অনেক বড় হবি তুই, সোনা। ’

ক্যাম্পাসে ফিরে গিয়ে জীবনটা অনেকাংশেই অন্য রকম বোধ হতে থাকে তার। এই একটা মাসের অভিজ্ঞতা তার জীবনের অনন্য এক সম্পদ। এখন মনে হয়, যেকোনো ধরনের জীবনই তার পক্ষে যাপন করা সম্ভব। তার ওই দিনগুলো অনেক বিচারেই তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ছিল, অবশ্য প্রতিবন্ধকতাও কম ছিল না। এক ধরনের পাগলামি আর অর্থহীনতা তো জগতের সর্বত্রই রয়েছে, পৃৃথিবী সৃষ্টিরই তো কোনো তাত্পর্য খুঁজে পায় না সে। এতগুলো দিন ওভাবে চলে তার দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা বেড়েছে অনেক, এখন সে আরো সহজে মানুষের ভণ্ডামিটা ধরতে পারে। বিনা পয়সায় এক মাসে ঘুরে আসা ২৪টি জেলার মানুষের ভাষা-সংস্কৃতি, ভাবভঙ্গিমার সূক্ষ্ম পার্থক্যও ধরতে পারে সে। এই বেশটা না ধারণ করলে গাড়িভাড়া আর খাওয়ার জন্য হাজার হাজার টাকা ব্যয় হতো তার।

মনে মনে তাই সে বলে, ‘জয়তু পাগল, জয়তু পাগলামি। ’

রাজীব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখেছে একাধিকবার, কিন্তু সেভাবে বিষয়টি আমলে নেয়নি। একদম যে ভাবেনি তা-ও না, তবে কোনো পরিকল্পনার মধ্যে আসেনি। তা ছাড়া থার্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা সামনে, এখন ওসব করার সময় কোথায়। আর এত হাজার হাজার ছেলে-মেয়ের মধ্যে সে হালে পানি পাবে কিভাবে? সেদিন হঠাত্ পরীক্ষার হলে ঢোকার মুখে অনিন্দ্য ডেকে নিল আলাদা করে। বলল, ‘তুই আজ যাবি না পাবনা?’

‘পাবনা কেন?’

‘ওখানেই তো রিয়ালিটি শোর আঞ্চলিক বাছাই। ঢাকা থেকে ডাকসাইটে সব লোকজন আসবে। ’

‘আরে পরীক্ষা না? আজকের কোর্সটায় অ্যাবসেন্ট থাকলে তো পুরো বছরটা নষ্ট। ’ 

অনিন্দ্য ওর কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘তোকে তিনটে বছর ধরে দেখছি। এনথ্রোপোলজিতে একটা অনার্স ডিগ্রি দিয়ে তোকে মাপা যাবে না। তুই তার চেয়ে অনেক বড়, তোর মতো অলরাউন্ডার স্বতঃস্ফূর্ত ছেলে কজন আছে এ ক্যাম্পাসে? এই কোর্স ছাড়াও তোর রেজাল্ট যা আসবে, তাতেই পাস হবে। দরকার হয় ফোর্থ ইয়ারে ভালো করে পড়ে পুষিয়ে নিবি। ’

‘কিন্তু আমার তো রেজিস্ট্রেশন করা নেই। ’

‘স্পটে করা যাবে। তোকে ১২টার মধ্যে পৌঁছতে হবে। দৌড়ে ৯টার ট্রেনটা ধরে ফেল। ’

কথা বলতে বলতে অনিন্দ্য রাজীবের পকেটে কিছু টাকা ঢুকিয়ে দিল। তারপর বলল, ‘আমি নিশ্চিত, খুব ভালো একটা কিছু হতে চলেছে। ’

রাজীবের ভাগ্যটা ভালো ছিল, তাই শেষ মুহূর্তে পৌঁছে একেবারে লাস্টম্যান হিসেবে তার নামটা তালিকাভুক্ত হলো। সন্ধ্যা নাগাদ একাধিক ধরনের যা

তার পরের দিনগুলো স্বপ্নের সঙ্গে তুলনীয়। খাওয়া, পোশাক পরা, হাঁটা—কত কিছুর ট্রেনিং। অভিনয়ের আর কমেডি করার কত বিচিত্র গ্রুমিংয়ের মধ্য দিয়ে চারটি মাস পার হলো। কত সব বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে দেখা—হঠাত্ ভাবলে বিশ্বাসই হতে চায় না। মনে হয়, পুরোটাই স্বপ্ন ছিল।

রাজীব ইচ্ছা করেই পরিকল্পনা করে রেখেছিল, এই চূড়ান্ত দিনের টেলিকাস্টটি সে বাইরে কোনো চায়ের দোকান-টোকানে বা ক্লাবের মাঠে বসে দেখবে। যে দোকানটার সামনে সবচেয়ে বেশি ভিড়, তার অদূরেই দাঁড়াল সে। আজ তিনজনের মধ্যে ফাইনাল। রেজাল্ট আগেই ঘোষিত হলেও পাবলিকের তো তা জানা নেই। কে চ্যাম্পিয়ন হবে আজ—চয়নিকা, পলাশ নাকি রাজীব—এ নিয়ে সবার মধ্যে টানটান উত্তেজনা। বাজারের চারটি টিভিতেই ওই রিয়ালিটি শোয়ের চ্যানেলটা চলছে। অনুষ্ঠানটা এখানে এতটা জনপ্রিয়, তা আবার নতুন করে বুঝতে পারে রাজীব। রাজীব শেষ দিনে দ্বিতীয় রাউন্ড পর্যন্ত দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখে। বিরতির সময় সে স্পষ্ট শুনতে পেল, কোনো কোনো দর্শক আবেগতাড়িত হয়ে বলছে—‘আল্লাহ, আমাগের রাজীবরে জিতায়ে দিও, চ্যাম্পিয়ান বানায়ে দেও ওরে। ’

টেলিভিশনটা এখানে ২৪ ইঞ্চি বলে চায়ের এই দোকানটাতে বেজায় ভিড়। পেছন সারিতে চাদরে মোড়ানো রাজীবের চোখে জল এসে যায় ওই দর্শকের আবেগ আর প্রার্থনার ভাষা শুনে। সে তো কিছুই ছিল না, আজও তেমন কিছু নয়, তবু কত কিছু। অনুষ্ঠানের ফলাফল তো তার আগেই জানা ছিল। সেদিন তৃতীয় রাউন্ডে রাজীব পাগলের ভূমিকায় অবতীর্ণ—বোতল-পাগল। উপস্থিত বিচারকরা হাসবে কী—মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছিল তার পারফরম্যান্স। পুরস্কার দেওয়ার সময় যে উচ্ছ্বসিত প্রশংসাগুলো বড় বড় তিনজন অভিনেতা করেছিলেন, তা প্রতিনিয়ত কানে বাজে রাজীবের।

পর্দায় যখন রাজীবের হাতে সোনার ক্রেস্ট তুলে দিচ্ছিলেন বিচারকরা, চারটি দোকান থেকে সমস্বরে জয়ধ্বনি ভেসে আসছিল ‘রাজীব—রাজীব!’

সেদিন তো একটা বদ্ধ হলের ভেতর লাইট-ক্যামেরার সামনে কাণ্ডগুলো ঘটেছে। আজ এই মুহূর্তে, রাত প্রায় ১১টায় রিকশাওয়ালা, মুচি, রাজমিস্ত্রি, হোটেলবয়, নাইটগার্ড, বাদাম বিক্রেতা প্রভৃতি মানুষ তার চোখের সামনে যে আবেগটা প্রকাশ করল, তা অবিশ্বাস্য ও অকল্পনীয় ছিল রাজীবের। তার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে তার মৃত্যু হলেও আর কোনো খেদ থাকবে না মানবজীবন নিয়ে, পাওনাও নেই আর কিছু মানুষের কাছে। বেঁচে থাকলে শালিকের কাছে, জলের কাছে, আকাশের কাছে, জ্যোত্স্নার কাছে, মানুষের কাছে এই সব ঋণের কিছু কিছু ঋণ শোধ করার চেষ্টা করবে সে। কিন্তু কিভাবে? ঘরের পথে হাঁটতে হাঁটতে ধন্দে পড়ে যায় রাজীব।


মন্তব্য