kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

কবি গুহামানবদের মাঝেও ছিলেন—সেইন্ট জন পার্স

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০




কবি গুহামানবদের মাঝেও ছিলেন—সেইন্ট জন পার্স

ফরাসি কবি ও কূটনীতিক সেইন্ট জন পার্স সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ১৯৬০ সালে। নোবেল কমিটির তরফে বলা হয়, তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে ‘তাঁর কবিতার ঊর্ধ্বমুখী উড্ডয়ন আর স্মৃতিজাগানিয়া চিত্রকল্পের জন্য।

’  সেইন্ট জন পার্সের আসল নাম সেইন্ট লাজে। তাঁর জন্ম ১৮৮৭ সালে। জীবন সম্পর্কে তাঁর পরিপক্ব ধারণা লাভ এবং লেখকসত্তার সমৃদ্ধি অর্জনের বৃহত্ সুযোগ আসে কূটনীতিক হিসেবে বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে। স্পেন, জার্মানি, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশে থাকার অভিজ্ঞতা লাভ করেন তিনি। এ ছাড়া কবি-সাহিত্যিকদের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টাও তিনি করতেন। কবি পল ভ্যালেরির সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। অনেকের সঙ্গে পত্রযোগাযোগও ছিল। আঁদ্রে জিদ, পল ক্লডেল, জ্যাক রিভিয়েরে, আর্কিবল্ড ম্যাকলিশ, অ্যালেন টেট, চেশোয়াভ মিউশ এবং টি এস এলিয়টের সঙ্গে পত্রালাপ ছিল তাঁর। এলিয়ট ও মিউশ তাঁকে যথেষ্ট মর্যাদার অধিকারী হিসেবে দেখেছেন। সংগীতজগতের ইগর স্ট্রাভিনস্কি, নাদিয়া বুলাঙ্গার প্রমুখের সঙ্গেও ছিল আন্তরিক যোগাযোগ। অবশ্য অন্য কবিদের মতো তাঁর মধ্যে নতুনত্বের রংচং খুব একটা পাওয়া যায়নি।  

কবি ও কূটনীতিক হিসেবে নিজের মধ্যে তিনি দুটি আলাদা সত্তা বজায় রেখে চলতেন। ১৯১৪ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ফরাসি কূটনীতিকের দায়িত্ব পালনকালে নিজের কবি ব্যক্তিত্ব আর রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির পরিচয়কে আলাদা করে রাখতেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন ১৯২৪ সালে। এরপর দীর্ঘ দুই দশক আর কোনো বই প্রকাশ করেননি। লেখক হিসেবে আলাদা নাম ব্যবহার করা এবং সেটি খানিকটা ইংরেজ ঘেঁষা দেখেই লক্ষ করা যায় তাঁর মানসিক নিরুত্তাপের বিষয়টি। ১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসন গ্রহণের সময় আবার ফিরে আসেন কবিসত্তায়। লেখক হিসেবে আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি নিজের লেখার মধ্যে কোনো বিশেষ জায়গা কিংবা সময়ের উল্লেখ করা থেকে সচেতনভাবেই বিরত থেকেছেন। তাঁর মতে, কবির কাজ হলো বিজ্ঞানীর কাজের মতো : বিশ্বজগত্, জগতের মৌলিক উপাদান এবং মানুষের চেতনা খুঁজে দেখা আর বিশ্লেষণ করাই কবির কাজ। বিশ্বজনীনতা তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিশ্ব আর মানুষের মনোজগেক ব্যক্তি পরিচয়ের সীমাবদ্ধতার বাইরে থেকে দেখা, সমসাময়িককালের সাহিত্যধারার বাইরে থেকে বিশ্বজনীনতাকে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি। তিনি মনে করেন, কবিতা বাস্তবতার পুনঃ রূপান্তর নয়, বরং কবিতা নিজেই এক বাস্তবতা। আর এ বাস্তবতা সময়ের সঙ্গে সতত গতিময় থাকে।

আরো বলেছেন, কবিতা হলো জীবনেরই একটা ধরন। এ জীবন হলো অবিচ্ছেদ্য জীবন। কবি গুহামানবদের মাঝেও ছিলেন। তিনি আণবিক যুগের মানুষদের সঙ্গেও থাকবেন। মানুষের মধ্যে কবির অস্তিত্ব থেকে যায়, সব সময়ের জন্যই থেকে যায়। মানবসভ্যতার আরো অনেক কিছুর সৃষ্টি হয়েছে কবিতার প্রয়োজন থেকে। প্রয়োজনটি হলো আত্মিক। মানুষের অন্তরের গভীরে সব সময়ের জন্য যে স্বর্গীয় আলো জ্বলে, সেটির উত্স কবিতা। পুরাণকথা বিলীন হয়ে গেলে স্বর্গীয় উত্স আশ্রয় পায় কবিতায়।   তাঁর নোবেল ভাষণে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতার কথা উল্লেখ করে সেইন্ট পার্স নবীনদের উদ্দেশে বলেন, ‘ভয় পেয়ো না, সন্দেহ রেখো না মনে। কারণ সন্দেহ থেকে কোনো কিছুর পয়দা হয় না। আর ভয় হলো বিপজ্জনক। জীবন নিজেকে বঞ্চিত করে থাকে—এ কথা মোটেও সত্য নয়। জীবন্ত কোনো কিছুই শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়নি। জীবন্ত কোনো কিছুর মধ্যেই শূন্যতার জন্য হাহাকার নেই। তবে এ কথাও ঠিক, অস্তিত্বের চিরন্তন গতির ভেতরে কোনো কিছুই নিজের আকার এক রকম রাখতে পারে না। অবশ্য নেহাত রূপান্তরের মধ্যেই যে ট্র্যাজেডির কারণ লুকিয়ে আছে, সে কথাও সত্য নয়। সময়ের সত্য-নাট্য নিহিত আছে সাময়িক আর চিরন্তন মানবের মাঝের যে ফারাক আছে তার মধ্যে। এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে—মানুষের মুখের এক পাশ আলোকিত হলে আরেক পাশ কি অন্ধকারে ঢাকা থাকবে? মানুষের দ্বৈত রূপের পরিচয় দেখার কাজ হলো একজন সত্যিকারের কবির। তাঁর নিজের আত্মিক সম্ভাবনার চেয়েও বেশি সংবেদনশীল একটা আয়না সামনে তুলে ধরা কবির কাজ। মানুষের সংবেদনশীল বোধকে জাগিয়ে তুলতে হবে। বিশ্বের আত্মিক শক্তির নিবিড় নৈকট্যে আনতে হবে সম্মিলিত আত্মাকে। পারমাণবিক শক্তির সামনে কবির মাটির প্রদীপ কি তার যতটুকু আলো দরকার ততটুকু আলো দিতে পারবে? হ্যাঁ, অবশ্যই পারবে, মানুষ যদি মাটির কথা মনে রাখে। ’
-দুলাল আল মনসু


মন্তব্য