kalerkantho


বই আলোচনা

চিত্রশিল্পীর চোখে বাংলাদেশের শিল্পকলা

মোহসিনা হোসাইন

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



চিত্রশিল্পীর চোখে বাংলাদেশের শিল্পকলা

বাংলাদেশের বহুমাত্রিক শিল্পকলা : নাজমা আক্তার। প্রকাশক : শিল্পকলা একাডেমি। প্রচ্ছদ : কিউরিয়াস ঢাকা। মূল্য : ৩০০ টাকা

এবারের একুশে গ্রন্থমেলায় শিল্পকলা একাডেমি বের করেছে নাজমা আক্তারের গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলাদেশের বহুমাত্রিক শিল্পকলা’। বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি বহু স্রোতের সমন্বয়।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানা শিল্প আন্দোলনের অভিঘাত এ দেশে এসে পড়েছে। আবার চিত্রশিল্পীরা উদারভাবে গ্রহণ করেছেন আবহমান বাংলার লোকজ শিল্পকলার নানা উপাদান। চিত্রপটে তুলে এনেছেন স্বদেশ ও সমকাল। চিত্রকলার নানা ক্ষেত্রের গুণী শিল্পীদের শিল্পকর্মের মূল্যায়ন ‘বাংলাদেশের বহুমাত্রিক শিল্পকলা’।

বাংলাদেশের চিত্রশিল্প সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ হলেও এ বিষয়ে লেখালেখি অপ্রতুল। এ দেশের শিল্পকলা ও শিল্পীদের নিয়ে কিছু বলার তাগিদ থেকেই নাজমা আক্তার হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম। তারই ফসল বাংলাদেশের বহুমাত্রিক শিল্পকলা। বইটি নানা দিক থেকে অনন্যসাধারণ। এতে বাংলাদেশের শিল্পীদের সৃজনশীলতার প্রেক্ষাপট, প্রবণতা ও দর্শনের কথা বর্ণনা করেছেন লেখক।

নানা চিত্রপ্রদর্শনী ও চিত্রশিল্পীদের কাজের যথাযথ মূল্যায়নও বইটিতে সন্নিবেশিত হয়েছে। লেখক নিজেও চিত্রশিল্পী, তাই তাঁর বিশ্লেষণ পেয়েছে বিশেষত্ব।

বাংলাদেশের বহুমাত্রিক শিল্পকলা গ্রন্থে অত্যন্ত সাবলীলভাবে শিল্পী নাজমা আক্তার নানা বিষয়ে চিত্রসমালোচনা তুলে ধরেছেন। শিল্পী এস এম সুলতানের চিত্রকলা ও চিন্তা-চেতনায় মাটি ও মানুষকে ধারণ করার যে সাধনা, তা দক্ষতার সঙ্গে অঙ্কিত হয়েছে বইটিতে। শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, হাশেম খান, মনিরুল ইসলাম, আবদুস সাত্তার, আবদুস শাকুর, শহীদ কবীর, শিশির ভট্টাচার্যসহ সমকালীন অনেক শিল্পীর চিত্রকর্মের আলোচনা তুলে ধরেছেন বইটিতে।

চিত্রকলা নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের কাছে অতিপরিচিত নাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নন্দলাল বসু। তাঁদের সম্পর্কে যে আলোচনা এ গ্রন্থে বিন্যস্ত হয়েছে, সেটিও অত্যন্ত মূল্যবান। শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নন্দলাল বসু এ গ্রন্থের লেখক নাজমা আক্তারের অনুপ্রেরণা ছিলেন। বইটির আরেকটি বিশেষ দিক, এতে লেখক তুলে ধরেছেন নারী চিত্রশিল্পীদের কর্ম, সাধনা ও শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগ। প্রিয়ভাষিণী, নাজলী লায়লা, আসমা কিবরিয়া, নুরুন নাহার পাপা, অ্যানি ইসলাম, দিলারা বেগম জলি প্রমুখ চিত্রশিল্পীর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা রয়েছে এতে।

শিল্পী নাজমা আক্তারের লেখায় গভীর অবলোকনের নির্যাস স্পষ্ট। তিনি শিল্পের গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছেন বলেই এত নিপুণভাবে এ গ্রন্থে শিল্প সমালোচনা করতে পেরেছেন। একজন শিল্পী যখন চিত্রসমালোচনা করেন, তখন অনেক সময় শিল্প সম্পর্কে ব্যক্তিগত বোধ ও রুচি তাঁর রচনাকে প্রভাবিত করে। কিন্তু চিত্রশিল্পী নাজমা আক্তারের বেলায় সেটি হয়নি। তিনি মুক্তদৃষ্টিতে শিল্পের গুণাগুণ বিচার করেছেন, প্রয়াসী হয়েছেন বাংলাদেশের শিল্পের বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শিল্পীর অবদানের যথাযথ মূল্যায়নে।

নাজমা আক্তার বাংলাদেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের দেখেছেন শ্রদ্ধার চোখে এবং তাঁদের সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করেছেন বিনীতভাবে। বইটির কোথাও কোনো অযাচিত সমালোচনা নেই। পুরো গ্রন্থজুড়ে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে শিল্পসমালোচনা করতে পেরেছেন লেখক। এর জন্য তিনি প্রশংসার দাবি রাখেন। শিল্পসমালোচক মৃণাল ঘোষ বইটির মূল্যায়নে লিখেছেন, ‘তাঁর ভাষা সংযত ও সাবলীল। কোথাও অহমিকার ছাপ নেই। এটাই ভালো লেখার অনিবার্য শর্ত। ’

চিত্রশিল্পী, লেখক, চিত্রসমালোচক, শিক্ষক—নানা পরিচয়ই নাজমা আক্তারের বেলায় সমানভাবে প্রযোজ্য। ক্লাসে পড়ানোর বিষয়ও চারুকলা, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক তিনি। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, গ্রিস, মালয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, ভারত, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশে এই শিল্পীর একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশে-বিদেশে অনেক চিত্র প্রদর্শনীতে বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। এসব তাঁর অভিজ্ঞতাকে ঋদ্ধ করেছে, লেখনীকে করেছে সমৃদ্ধ। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও সংস্কৃতিজন লিয়াকত আলী লাকী গ্রন্থটিকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে—‘শিল্পীসত্তাকে লেখকসত্তায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে শিল্পবোদ্ধা, দর্শক অনুরাগী, গবেষকদের কাছে সুনিপুণভাবে তুলে ধরতে তিনি পারদর্শী। তারই ছাপ এই গ্রন্থজুড়ে বিস্তৃত। ’

বইটির পাতায় পাতায় ঠাঁই পেয়েছে বাংলাদেশের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীদের বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম। সেই দিক থেকে অনন্য চিত্রকর্মের সংগ্রহও হবে বইটি। পুরো বইটি ছাপা হয়েছে আর্ট পেপারে। বইটির ঝকঝকে ছাপা, চিত্রকলার অবিকল প্রিন্ট, আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ পাঠককে আকৃষ্ট করবে। লেখক বইটি উত্সর্গ করেছেন প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা বাবা আবদুল জব্বার ও ছেলে অনিন্দ্য রহমানকে। শিল্পানুরাগী, শিল্পবোদ্ধা, শিল্পী, শিল্পসমালোচক, চিত্রকলার শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ পাঠকদের কাছে সুখপাঠ্যের খোরাক হবে বইটি।


মন্তব্য