kalerkantho


নির্মেদ গদ্যের ভাষ্যকার হুমায়ূন আহমেদ

তুহিন ওয়াদুদ

১০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নির্মেদ গদ্যের ভাষ্যকার হুমায়ূন আহমেদ

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র প্রতিভায় উদ্ভাসিত। তাঁর লেখা বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে সরল এবং হার্দ্য-ব্যঞ্জনায় গৃহীতও বটে।

কথাশিল্প ও টেলিভিশন নাটকে তাঁর জনপ্রিয়তার বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দৃষ্টি ফেরালে শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে আমরা সমকালে জনপ্রিয়তার শীর্ষে দেখি। শরত্চন্দ্রের কালে পড়তে জানা মানুষদের আনুপাতিক সংখ্যা বিবেচনায় পাঠক ছিল অবিশ্বাস্য রকম বেশি। বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের লেখা পড়ার জন্যও একসময় পাঠক অপেক্ষা করে থাকতেন। যদিও সেই অপেক্ষা ছিল নজরুলের বিদ্রোহী-সাহসী-প্রতিবাদী রচনার জন্য। পাঠকের মেধাশীলতা বুঝে লেখার হাত সম্প্রসারিত করা লেখকের সংখ্যা আমাদের কম। অনেক লেখক আছেন, যাঁদের সিরিয়াস লেখার দিকেই একনিষ্ঠ ঝোঁক থাকে, যিনি সতর্কতার সঙ্গে আজীবন সিরিয়াস লেখার পরিমণ্ডলেই করেন যাপিত জীবন। হুমায়ূন আহমেদের অনেক রচনা একই সঙ্গে সিরিয়াস ধারার এবং পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর লেখার শিল্পগুণে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছেন। তাঁর এই পাঠকপ্রিয়তা কখনো ঝরে যায়নি। আমৃত্যু তাঁর লেখার পাঠক ছিল ক্রমবর্ধনশীল। শরীরী অনুপস্থিতিতেও তাঁর পাঠকসংখ্যা ঈর্ষণীয় পর্যায়ের।

এক.

হুমায়ূন আহমেদ শিল্পের কারবারি। হুমায়ূনপ্রিয়দের কাছে হুমায়ূন অনেক উচ্চতায় ওঠা মানুষ। তিনি সাহিত্যের বিষয় এবং কাহিনির চরিত্র নিয়ে অনবরত খেলেছেন। তাঁর অনেক লেখার বিষয় অনেকটাই অভিন্ন এবং চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য পূর্বাপর একই। তার পরও তা পূর্বতন কাহিনি কিংবা চরিত্রের চর্বিতচর্বণ হিসেবে পরিত্যক্ত হয়নি।

হুমায়ূন আহমেদ নিত্যদিনের ঘটনাবহুল জীবন থেকে তুলে এনেছেন ছোট ছোট ঘটনা। সেগুলোকে শিল্পের গুণে করে তুলেছেন অনন্য। বিষয় সৃষ্টির ভিন্নতায় নয়, হুমায়ূন আহমেদের বড় কৃতিত্ব তাঁর শিল্পবৈশিষ্ট্যে। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সরল সম্পর্ক, সৌজন্যবোধ, দৃশ্যমান জীবনের আড়ালে অন্য জীবন তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। সামান্যকে অসামান্য করে তোলায় তাঁর মুনশিয়ানা লক্ষণীয়। যে ঘটনা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়, সেটিকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধরেছেন।

হিমু চরিত্র হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যগত সৃষ্টি। এই চরিত্র সমাজে বিভিন্নভাবে বর্তমান। জ্যোত্স্নাস্নান ও বর্ষাগাহন মানুষের অনেকটাই ঐতিহ্যজাত। বিদ্যাপতি, রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ আমাদের বর্ষাপ্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু ঐতিহ্যে যখন মালিন্য এসে গেছে, তখন বর্ষাগাহনকে এমনকি জ্যোত্স্নাস্নানকে হুমায়ূন আহমেদ পুনরায় জনমানসে ফিরিয়ে এনে বৃহত্ পর্যায়ে উন্নীত করেছেন।

একটি বিষয়কে তখনই বিপুলসংখ্যক মানুষ ধারণা করে থাকতে পারে, যখন তা ওই সব মানুষের প্রবণতার মধ্যে বিদ্যমান থাকে। আরোপিত কোনো বিষয়ের ওপর কারো ভালো লাগা দীর্ঘ হতে পারে না। হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে এই সত্যতাই পরম হয়ে উঠেছে।

দুই.

হুমায়ূন আহমেদের স্বতন্ত্র শক্তি তাঁর গদ্যরীতি। ঝরঝরে এক গদ্য আর অনুপম শব্দবিন্যাসে তিনি তাঁর শিল্পভুবন গড়ে তুলেছেন। তাঁর নির্মেদ গদ্য সতত সুখপাঠ্য। সাহিত্য রচনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাহিত্যে তিনি গদ্য রচনায় পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গদ্য যে পর্যায়ের, সেখানে সাধারণ পাঠক অনেকটাই বাধাগ্রস্ত। কমলকুমার মজুমদারের গদ্য তো রীতিমতো নিরীক্ষাধর্মিতার শীর্ষে। শহীদুল জহিরের গদ্যের ধরনও সর্বসাধারণের বোধগম্য নয়। বাংলা সাহিত্যে আমাদের উল্লেখযোগ্য লেখকদের গদ্যরীতি থেকে হুমায়ূন আহমেদের গদ্যরীতি একেবারেই আলাদা। আমাদের যে পাঠক কমলকুমার মজুমদারের গদ্য পাঠে ক্লান্ত হন না, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গদ্যের গভীরে প্রবিষ্ট হন অনায়াসে, তিনিও হুমায়ূনীয় গদ্যে অবগাহন করতে পারেন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের গদ্যে যিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তিনি অন্যান্য গদ্য পাঠে স্বচ্ছন্দ না-ও হতে পারেন। ফলে শিল্পবিচারে কমলকুমার মজুমদার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির যে দৃষ্টিকোণ থেকে অনন্য, সেখানে হয়তো হুমায়ূন আহমেদ অন্য দৃষ্টিতে অনন্য।

শিল্পবিচারে শিল্পের ভোক্তার মতামতই চূড়ান্ত। সেই মূল্যায়নবোধে যাঁরা গদ্যের যে মূল্যায়ন করবেন, সেটাই যথার্থ। তার পরও পাঠকের মানদণ্ডও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মূল্যায়নের সামগ্রিকতায় হুমায়ূন আহমেদ যে গদ্য রচনা করেছেন, তা এখন পর্যন্ত অনেক পাঠকের কাছে সুখপাঠ্য। নীরব সুর-ছন্দে পাঠকমননে এক ধরনের আবহ সৃষ্টি করে হুমায়ূন আহমেদের কথাশিল্প। পরিমিতিবোধের মধ্য দিয়ে পাঠককে পৌঁছে দেয় ঘটনার অন্তর্লোকে। তাঁর গদ্যের নির্মাণ ছোট ছোট বাক্যে। যেমন ‘দরজার ওপাশে’ উপন্যাসে দেখি—

‘ঘরের হাওয়া গরম হয়ে আছে। দরজা-জানালা বন্ধ। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমি বাতি জ্বাললাম। স্বপ্নে দেয়ালে যে জায়গায় ক্যালেন্ডার ছিল, সেখানে ক্যালেন্ডার নেই। খাটের নিচে টকটক শব্দ হচ্ছে। প্রায়ই হয়। কিসের শব্দ আমার জানা নেই। ইঁদুর হবে না, ইঁদুর টকটক শব্দ করে না। আমি হাতড়ে হাতড়ে দরজা খুললাম। ’

হুমায়ূন আহমেদের কথনকৌশল তাঁর স্বকীয় সৃষ্টি। কত সহজে ভেতরকে বাইরের করে তোলা যায়, তার দৃষ্টান্ত তাঁরই রচনাগুলো। যেমন তাঁর ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটি। উত্তমপুরুষে কাহিনির বয়ান। ভূমিকাংশে তিনি এ লেখার অনুপ্রেরণা হিসেবে সোমেন চন্দের ‘ইঁদুর’ গল্পের কথা বলেছেন। নিম্নবিত্তের জীবন নিয়ে লেখার আগ্রহ তাঁর এই উপন্যাস। এখানে তিনি টানাপড়েনের একটি সংসারের চিত্র তুলে ধরেছেন।

‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাসেও একই শ্রেণির জীবন নিয়ে লিখেছেন। একটি পরিবারের বিচিত্র মাত্রার কষ্টের আখ্যান এ উপন্যাস। সৌহার্দ্যপূর্ণ পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে থেকে কখনো আর্থিক, কখনো সামাজিক কষ্টের রূপরেখায় উপন্যাসটির কাহিনিবিন্যাস। লেখক কষ্টের অন্ধকারে নিমজ্জিত জীবনেও ছোট ছোট সুখানুভূতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, যা কখনো কখনো আবেগে ভেসেছে। পাঠকের অন্তর স্পর্শ করেছে। বাইরে ভালো থাকার অভিনয় করলেও খোকা-রাবেয়া দুই ভাই-বোনসহ অনেকেই কত দুঃখ চাপা দিয়ে রেখেছেন।

তিন.

আমরা যেমন একই নদীর পাড়ে বারবার যাই। আমাদের মন খারাপ হলে যাই, আমাদের মনে বাঁধভাঙা আনন্দ হলে যাই। একলা থাকলে যাই। অনেকে মিলেও যাই। নদীর হয়তো সামান্য পরিবর্তন আসে অথবা আসে না। তবুও সে নদী আমাদের আনন্দ দেয়। হুমায়ূন আহমেদের একই চরিত্রের বারবার চিত্রায়ণ আমাদের আনন্দ দেয়। শুধু ‘হিমু’ চরিত্র নিয়েই হুমায়ূন আহমেদ অনেকগুলো উপন্যাস লিখেছেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘হিমু, আজ হিমুর বিয়ে, ময়ূরাক্ষী, হিমুর নীল জোছনা এবং হিমু, হিমুর রূপালি রাত্রি, হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্মসহ’ অনেকগুলো উপন্যাস হিমু চরিত্রনির্ভর। হিমু সমগ্র পাঠকের কাছে খোলা জানালায় প্রতিদিন আকাশ দেখার মতো কিংবা নদী দর্শনে যাওয়ার মতো। খুব বেশি পরিবর্তন নেই দৃশ্যে, তার পরও আনন্দের কোনো কমতি নেই। হুমায়ূন আহমেদ হিমু চরিত্র সম্পর্কে লিখেছেন—‘মানুষ হিসেবে আমি যুক্তিবাদী। হিমুর যুক্তিহীন, রহস্যময় জগত্ একজন যুক্তিবাদীকে কেন আকর্ষণ করবে আমার জানা নেই। ’ হুমায়ূন আহমেদ নিজেও যেমন নিজের অজান্তে হিমুকে পছন্দ করেন, তেমনই পাঠকও। অথচ হুমায়ূন আহমেদ এ চরিত্র ‘অ্যান্টি লজিক’ হিসেবেই সৃষ্টি করেছেন। হিমু চরিত্রে হয়তো একক কোনো মানুষের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভেঙে ভেঙে দেখলে সেগুলো অনেক মানুষের মধ্যেই পাওয়া যাবে। তিনি মিসির আলী চরিত্রটিকে বিশেষ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সৃষ্টি করেছেন। হিমু চরিত্রের উল্টো চরিত্র মিসির আলী। এই চরিত্রটিও পাঠককে একঘেয়ে করে তোলেনি। হুমায়ূন আহমেদের পাঠক লেখকের মনস্তত্ত্ব পাঠ করতে পারেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলো কোন পরিবেশে কোন আচরণ করতে পারে, তা পাঠক অনায়াসে বলে দিতে পারেন। লেখক পাঠকের কাছে কোনো রহস্যময়তার মধ্যে থাকেননি।

জীবনের কোনো না কোনো স্তরে হুমায়ূন অনেকেরই প্রিয় লেখকদের একজন। একজন লেখক হিসেবে এই প্রাপ্তি সন্দেহাতীতভাবেই পরম তৃপ্তির। সেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলেই বিদায় নিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। বয়স ও পাঠের অভিজ্ঞতা পাঠকের বিবেচনাবোধে আনতে পারে পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন অনেকের ক্ষেত্রে চিরন্তন।

হুমায়ূন আহমেদ নিজে অভাব-অনটনে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর আত্মজৈবনিক রচনাগুলো থেকে তা জানা যায়। তাঁর বাবা একজন সত্ পুলিশ অফিসার ছিলেন। তাঁর বাবার মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম ঘটনাও ছিল। যে ঘটনাগুলো দ্বারা হুমায়ূন আহমেদ প্রভাবিত হয়েছেন বলে অনুমান করা যায়। তিনি যে বেতন পেতেন, সেই টাকায় তাঁদের সংসার চালানো খুবই কঠিন হতো। তার পরও প্রচুর বই কিনতেন। প্রেতবিদ্যার অনেক বই কিনেছিলেন। একদিন তাঁর বাবা বেতনের প্রায় সব টাকা দিয়ে একটি বেহালা কিনে এনেছিলেন। একদিন শখ করে একটি ঘোড়া কিনে এনেছিলেন। এ রকম অদ্ভুত কাজ করতেন। হিমু চরিত্রটিতে আমরা অনেক রকম নাটকীয়তা দেখি। সেই নাটকীয়তা সৃষ্টির আগ্রহ লেখকের মধ্যে অনেকটাই পারিবারিকভাবে প্রাপ্ত।

রাবীন্দ্রিক আবহ, নজরুলীয় চেতনা, জীবনানন্দীয় কবিতা, কমলকুমারীয় গদ্য—এজাতীয় ধারণার প্রয়োগ আমরা অনেক সময় করে থাকি। এর কারণ হচ্ছে, উল্লিখিত লেখকরা নিজস্ব একটি ঢং সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা নিজেরা একটি দৃঢ় ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন। হুমায়ূন আহমেদও তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন। ফলে আমরা অনেকের আচরণকে হিমু কিংবা মিসির আলীর মতো বলে উল্লেখ করি। লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ সেই স্বতন্ত্র একটি ভুবন সৃষ্টি করে যেতে সক্ষম হয়েছেন। নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, নাট্যাভিনেতা, গীতিকার—সব পর্যায়ে সফল মানুষ হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা সাহিত্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছানো এ লেখকের জন্মদিন ১৩ নভেম্বর। তাঁর জন্মদিনে আমাদের স্মরণাঞ্জলি।


মন্তব্য