kalerkantho

উদ্ধার

মোহীত উল আলম

১০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



উদ্ধার

অঙ্কন : মানব

সেতারের বর্রং বর্রং শব্দ এ বাড়িতে নতুন শোনা গেল।

বিয়ের সময় থেকে রাষ্ট্র হয়ে গেল যে সাজুর বউ সেতারবাদক।

সাজুর বাবা মোসাদ্দেক মুনশি প্রাতর্ভ্রমণ সেরে কাছেই বড় ভাই হাজি মুনশির বাসায় প্রাতরাশের সময় কথাটা পাড়লেন।

হাজি মুনশি তাঁর খনখনে গলায় বললেন, তোবা, আসতাগফিরুল্লাহ। সাজু বাবা এটা কী কাজ করল!

মোসাদ্দেক মুনশি বড় ভাইয়ের চেয়ে ফরসা, তাগড়া; কিন্তু মুখে একই রকম দাড়ি, মাথায় একই রকম টুপি।

ভাবির তৈরি বেলা রুটির সঙ্গে মুরগির ঝোল মেখে মুখে পুরে দিয়ে বললেন, ওইটাই তো বড়দা, ছেলেকে বোঝাতে পারছি না। শরিয়াবিরোধী কাজ করা কোনো মতেই সহ্য করব না বলে দিয়েছি। কিন্তু হয়েছে কি ভাবি জানেন, সাজুর নানার বাড়ি তো জানেন, পারলে যেন হিন্দু হলেই বেঁচে যান তাঁরা। আমি সাজুর মাকে বলে দিয়েছি, অনেক সহ্য করেছি, আর সহ্য করব না।

হাজি মুনশির স্ত্রী দেবরের রেকাবিতে আরেক টুকরা মুরগির গোশত তুলে দিয়ে বললেন, সেজো দা, খুলনা থেকে সুন্দরবনের খাঁটি মধু এনেছি, একটু খাবেন।

মোসাদ্দেক মুনশি না না করে উঠলেন।

ওই সব খাঁটি মধুটদু না, সবই ভেজাল ভাবি, বুঝছেন! 

হাজি মুনশির স্ত্রী মধুর বোতল নিতে টেবিলের দিকে বাড়ানো হাতটা গুটিয়ে নিয়ে গালে রেখে বললেন, আপনাদের জন্য কোন জিনিসটা খাঁটি বলেন তো! সারা জীবনেই শ্বশুরবাড়িতে শুনে আসছি, এটা ঠিক না, ওইটা ঠিক না। এ লোক খারাপ, ওই লোক খারাপ। এত খারাপ  দেখে দেখে তো জীবনটাকেই ছোট করে ফেলেছেন। কেন আপনি বুঝি জানতেন না, সাজুর পছন্দ করা মেয়েটার পরিবার সংস্কৃতিমনা এবং সে সেতার বাজায়। টিভি চ্যানেলগুলোতে অনুষ্ঠান করে।

সেভাবে ঠিক জানতাম না। আসলে ভাবি, জানেনই তো, আমরা কনজারভেটিভ হলেও ছেলে-মেয়েদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি।

হাজি মুনশির স্ত্রী বললেন, স্বাধীনতা না কচু। সত্য কথা বললে তো চা না খেয়ে দৌড় দেবেন। আপনি আসলে এ বিয়েতে তলে তলে সম্মতি দিয়েছেন মেয়ের বাবার টাকা দেখে। আমি খান পরিবারের মেয়ে, ঠোঁটকাটা বলে আমার দুর্নাম আছে। আপনি ঠিকই হিসাব করেছেন সম্পদওয়ালা বাপের একমাত্র সন্তান মেয়েটির সঙ্গে সাজুর বিয়ে দিলে ওই সম্পত্তি আপনার ঘরে চলে আসবে। আর আমার সাহেব যতই ‘তোবা, আসতাগফিরুল্লাহ্্্’ বলুক, মনে মনে উনিও চান যে এ বিয়েটা হোক। পরের মুখে ঝোল টানতে আপনারা ওস্তাদ।

চা খেয়ে নিলেও, মোসাদ্দেক মুনশি প্রায় দৌড় মেরে ভাইয়ের পাকা দোতলা বাড়ির মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে এলেন। ফটকের বাইরে গলিতে পা দিতেই তাঁর চোখে পড়ল তাঁর শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে সাদা টয়োটা সিডান গাড়িটা তাঁর বাড়িতে ঢুকছে। মোসাদ্দেক মুনশি আর তাঁর বড় ভাই হাজি মুনশির নিজেদের কেনা জমিতে নিজেদের বাড়ি উঠেছে একই গলির এপাশ-ওপাশ।

মোসাদ্দেক মুনশি জোরে পা চালিয়ে শ্বশুর-শাশুড়িকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য নিজের বাড়ির ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

তাঁর বৃদ্ধ শ্বশুর গাড়ি থেকে নেমে বললেন, বাবা, ভালো আছো। সব ঠিক আছে তো।

তাঁর শাশুড়িকে সাজুর মা নিজেই ভেতর থেকে এসে হাত ধরে নামালেন।

সবাই সরাসরি নাশতার টেবিলে বসলে অবধারিতভাবে সাজুর বউয়ের সেতার বাজানোর কথাটা উঠল।

সাজু কম্পিউটার সায়েন্সের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বললেন, শুধু সেতার বাজানো কেন, মানুষ যদি আল্লাহর সৃষ্টি হয়, তা হলে তার মধ্যে সংগীতপ্রতিভা, বাদনপ্রতিভা, অঙ্কনপ্রতিভা—সবই আল্লাহর দান ধরে নিতে হবে। ধর্মের নামে এগুলোকে বাধা দেওয়া যাবে না। আব্বা যদি সুচিতাকে এ ঘরে ওঠাতে বাধা দেন, আমি বউ নিয়ে আলাদা থাকব, তার পরও ওকেই আমি বিয়ে করব।

শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে মোসাদ্দেক মুনশি চরম অস্বস্তির মধ্যেও চুপ করে রইলেন। সাজুর মাকে বিয়ে করার সময় যেমন তিনি শ্বশুরের সম্পত্তির দিকে চোখ রেখেছিলেন, তেমনি ছেলের বিয়ের সময়ও তাঁর কাছে ওইটাই প্রাধান্য পাচ্ছে। অথচ তাঁকে যেন নিজেকে এখানে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি নির্লোভ, সত্ ও সন্তানদের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী একজন অভিভাবক। তাই তাঁর বড় ভাই হাজি মুনশির মতো খনখনে গলায় বললেন, ধর্মের বাইরে কোনো কাজ করা ঠিক না।

এবার তাঁর শ্বশুর মজদুর ইসলাম মুখ খুললেন। বললেন, জামাই, ওই কথা বললে হবে না। এই ভারতবর্ষে সংগীতে মুসলমানদের অবদানের কথা যদি ভাবো তাহলে তোমার ওই যুক্তি টিকবে না। মানুষের কাছে জীবনটাই সব। যে যেভাবে পারে সেভাবে জীবনকে বিকশিত করবেই। ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্যই ধর্ম।

দুই.

সাজুর বিয়ের সময় দেখা গেল মোসাদ্দেক মুনশি যে প্রতিবাদটি বড় করে তুলতে চাইছিলেন, সমাজে সেটি কোনো ধোপেই টিকল না। বরঞ্চ দেখা গেল বিয়ের মজলিসে সাজুর বউয়ের সেতারবাদনের গুণটির কথা সবিশেষ প্রচার পেল এবং কেউ কেউ প্রস্তাব করল যে বৌভাতের রাতে যেন সাজুর বউ সবাইকে সেতার বাজিয়ে শোনান। সাজুর বন্ধু তসলিম রসিকতা মিশিয়ে বললেন, ও রে তোর বউয়ের তো রাগ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান আছে। আরেক বন্ধু রাফি বললেন, সেতারের রাগের সঙ্গে দ্রাক্ষারসের বিশেষ সম্পর্ক আছে জানিস তো। দুটোই রাগ, একটা কানের, আরেকটা জিবের।

বিয়ের রাতে অতিথিরা বিদায় নিলে সাজুর এক দুলাভাই তাঁকে ছাদে ডেকে নিয়ে গেলেন। তিনি শ্বশুরবাড়ির ধর্মপরায়ণতার দিক থেকে আদর্শ জামাই। আলাপে আলাপে তিনি সুকৌশলে সাজুকে জানিয়ে দিলেন যে তারা যেন অবশ্যই জন্মনিয়ন্ত্রণ না করে। কারণ আল্লাহর দান সন্তানাদি, ওগুলোকে বাধা দেওয়া ঠিক নয়।

বাসর রাতে দুজনে এক কামরায় ঢুকলে সাজু দুলাভাইয়ের উপদেশটা সহজভাবে মেনে সেভাবে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু সুচিতা সেটা কিছুতেই মানবে না। সে বলল, কেন, তোমার সঙ্গে না আমার বিয়ের আগে আলাপ হয়েছিল যে দুই বছরের আগে কোনো বাচ্চাবুচ্চা নয়। তুমি চাকরিতে একটু দাঁড়াবে, আমার সেতারের  রেওয়াজটাও নির্বিঘ্নে চলবে। তা হলে?

সাজু কথাটা ঘুরিয়ে বলল, অনেক বইয়ে পড়েছি, প্রথম থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলে পরে বাচ্চা হতে ঝামেলা হয়।

সাজু আর সুচিতার মধ্যে এ বাচ্চা নেওয়া আর না নেওয়ার সামান্য কথা-কাটাকাটির তলায় আরেকটা কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যাচ্ছিল। তাদের হাত ও মুখ কোনো নির্দেশনা ছাড়া, কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া পরস্পরের দেহকে কলম্বাসের আমেরিকার খাঁড়িগুলি আবিষ্কারের মতো খুঁজে নিচ্ছিল। আস্তে আস্তে তাদের ওপরের কথাগুলো মিইয়ে যাচ্ছিল নিচের শরীরের ভাষার কাছে। সুচিতার কাছে হার মেনে সাজু যখন কনডম বের করতে গেলেন, হতাশ হয়ে আবিষ্কার করলেন যে বিয়ের ঝামেলায় তাঁর কখনো কনডম কেনার কথা মনে ছিল না। আর তাঁর বন্ধু তসলিম যে তাঁকে এক প্যাকেট কনডম দিয়েছিল বিয়েতে উপহার হিসেবে, সেটা তখনই হাসতে হাসতে ছোঁ মেরে নিয়েছিল রুস্তম। রুস্তমের কাছ থেকে সেটা আর নেওয়া হয়নি।

সুচিতা সাজুকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, আর পারছি না। বাচ্চা লেগে গেলে লাগবে, অসুবিধা কী?

তিন.

বিয়ের তিন দিনের দিন সকালে সুচিতা নিজেদের শোবার ঘরের মেঝেতে চাদর বিছিয়ে সেতার সংগীত করতে বসল। সুচিতা মেজরাবটা ডান হাতের তর্জনীতে, পরে পা দুটি ভাঁজ করে বসে কাঁধের সঙ্গে সেতারটা আলতো হেলান দিয়ে যেই মাত্র তারে আঙুলের ঠোনা মারতে যাবে, অমনি তার শাশুড়ি হাতের কাজ ফেলে এসে পাশে মোড়া নিয়ে বসলেন।

এ তিন দিনে সুচিতার শাশুড়িকে খুব ভালো লেগে গেছে। শাশুড়িও বউয়ের রূপ দেখে এত খুশি যে বারবার নানা ছলেবলে বউকে দেখে যান, মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানান। এর মধ্যে ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে বউয়ের ছবি দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছেন।

সুচিতার হাতে সেতারটা বেজে উঠল, বর্রং বর্রং। কিন্তু বাদন থামিয়ে সে বলল, কী মা, কিছু বলবেন?

শাশুড়ি বললেন, একটা কথা বলছিলাম কি, বৌভাত অনুষ্ঠান মাসখানেক পরে করলে হয় না। মোসাদ্দেক মুনশি যেন শাশুড়ি আর বউয়ের মধ্যে কী কথা হবে জানতেন। গলা খাঁকারি দিয়ে তিনি দরজার চৌকাঠে দাঁড়ালেন। স্ত্রীর কথা টেনে নিয়ে বললেন, ওই সময়ে সাজুর বড় ভাই ওমান থেকে ছুটি নিয়ে আসবে তো। তাই বলছিলাম, মাসখানেক পরে যদি হয়।

সুচিতা বলল, এগুলো তো আমি ঠিক মতামত দিতে পারব না। তবে আব্বুকে জানি, তিনি বৌভাতটাতে বিশেষ আগ্রহ দেখাবেন মনে হয় না। বিয়ে তো বড় করে হয়েছে, সবাই খেয়েছে, আর খরচের দরকার কী?

বউয়ের কথায় মোসাদ্দেক মুনশি বেজায় খুশি হলেন। অথচ ছেলেটা বুঝল না। বলে কি, বৌভাত তার বাবা না দিলে সে নিজেই দেবে। এত সোজা আর কি? বড় ছেলেটা পয়সা চেনে, আর ছোটটা পেয়েছে নানার বাড়ির বাতিক। খালি বড় বড় কথা।

শ্বশুর নিজেও আরেকটা মোড়া নিয়ে বসলেন। বললেন, আচ্ছা বউমা, এই যে সেতারটা বাজাও। এটা কেমনে বাজাও?

সুচিতা প্রশ্নটা না বুঝে শ্বশুরের দিকে সপ্রশ্ন চেয়ে রইল।

মোসাদ্দেক মুনশি বললেন, না, এই যে তারে আঙুল ঠেকিয়ে ঝংকার তুলছ, সেটা তুমি কেমনে বোঝো যে কোন তারে কোথায় বাড়ি মারলে কোন সুর আসবে!

সুচিতা খুব মিষ্টি করে হেসে দিল। বলল, বাবা, এটি তো আমি বলতে পারব না। এটা এমনিতে হয়ে যায়।

সুচিতা কথা বলার সময় তার ঠোঁটের ফাঁকে সুদৃশ্য ঝকঝকে দাঁতের সারি একবার দেখা যাচ্ছিল, আরেকবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল। এত সুন্দর হয় মানুষের দাঁত—সুচিতার শাশুড়ির আনন্দে চোখ বুজে এলো। অনেক সওয়াবের কাজ করলে নিশ্চয়ই এ রকম পুত্রবধূ পাওয়া যায়।

মোসাদ্দেক মুনশি বললেন, আচ্ছা, সেতার দিয়ে ইসলামী গান গাওয়া যায় না?

সুচিতা তার উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে বলল, নিশ্চয়ই যায়, কিন্তু আগে তো কখনো ভাবিনি।

ভাবো, ভাবো।

চার.

মাস দুয়েক পরে সুচিতা বমি করল। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে হেসে বললেন, পজিটিভ।

এক দুপুরবেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে সাজু বউয়ের মাথাটা কোলে নিয়ে খুব আদর করলেন। দুজনে মিলে ঠিক করলেন, ছেলে হলে কী নাম দেবেন আর মেয়ে হলে কী নাম।

সাজু বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে সুচিতার সময় ভার হয়ে থাকে। শাশুড়ির চেষ্টার কোনো শেষ নেই ছেলের বউকে নিরুদ্বিগ্ন রাখতে। তবে তিনি কর্মঠ মহিলা, সারা দিন সংসারের দশদিক সামলান। তখন ভাবলেন, বউমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবেন।

সাজু সুচিতার মত চাইলে, সুচিতা বলল, তার বাবার সংসারে যেহেতু কেউ নেই, তার মাও বেঁচে নেই, ওখানে থাকার চেয়ে তার শ্বশুরবাড়িতে থাকতেই ভালো লাগবে।

আর সুচিতার সম্মতির কথা মোসাদ্দেক মুনশি তাঁর ভাবিকে এভাবে বললেন যে বউমা এত লক্ষ্মী যে শাশুড়ির কাছ ছাড়া হতে চায় না।

কিন্তু তাঁর ভাবি বললেন, ভাই, সেটা বুঝলাম, কিন্তু বৌভাতটা যে দিলেন না। গিরায় গিরায় হিসাব আপনাদের!

মোসাদ্দেক বললেন, মন্টি তো এ বছর আসতে পারবে না, ছুটি পাচ্ছে না। তাই পরের বছর দেব, অসুবিধা কী?

ভাবি বললেন, তাই দিন। আপনাদের সংসারে এসে অনেক কিছু শিখলাম।

 সুচিতা বাপের বাড়ি যেতে রাজি না হওয়ায় মোসাদ্দেক মুনশি খুশি হলেও ভেতরে ভেতরে বউমার বাচ্চা হওয়ার ক্লিনিকের খরচটা যে তাঁর ওপরে পড়বে তিনি সেটা নিয়ে বিচলিত রইলেন। সাজু হয়তো বলবেন তিনি বহন করবেন, আসলে তিনি তো পারবেন না। আর আজকাল তো নরমাল ডেলিভারি হয়ই না। সবই সিজারিয়ান। ক্লিনিকগুলোর পয়সা কামানোর রাস্তা।

পাঁচ.

ক্লিনিকে সুচিতার আল্ট্রাসনোর রিপোর্ট দেখার পর ডাক্তার খানিকটা বিচলিত হলেন। ভ্রূণের ভেতর বাচ্চার অবস্থানটা বেগতিক। প্রায় তিন দিন দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করার পর খানিকটা ব্যথা স্তিমিত হয়ে এলে ডাক্তার রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, মানসিক স্তর—সব সমন্বয় করে অস্ত্রোপচারের পর একটি ফুটফুটে ছেলে বের করে দিলেন। সবাই খুশি। তাদের দুজনের ঠিক করা নাম অনুসারে বাচ্চার নাম রাখা হলো রকি। সাজু ক্লিনিকে মিষ্টির বাক্স নিয়ে ঢুকলে তাঁর মা তাঁকে এক পাশে ডেকে নিয়ে বললেন, বাচ্চা হয়ে গেলেও বউয়ের শরীর ভালো মনে হচ্ছে না।

ডাক্তার কপালের ভাঁজ আরো কয়েকটা জমিয়ে বললেন, পোস্ট-ন্যাটাল স্টেজে জন্ডিস ধরা পড়লে একটু রিস্কই বটে। তবে আমরা সর্বোচ্চ ট্রিটমেন্ট দেব। চিন্তা করবেন না। আল্লাহ সহায়।

জামিলা মজিদ। শহরের এক নম্বর স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। বয়স ষাটের কাছাকাছি। গায়ের রং কালো। মুখের মধ্যে দীর্ঘ ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতার ছায়া। নাকের নিচে হালকা মোচের আভাস আর চিবুকের নিচে দু-একটা দাড়ির প্রায় অদৃশ্য অবস্থান। মাথায় মোড়ানো তিন স্তরের হিজাব।

হাতের গুণ তাঁর! সুচিতা ক্লিনিকে দুই সপ্তাহ ভুগে বাসায় এলো। শরীর একেবারে ভেঙেচুরে এমন অবস্থা যে বাচ্চাটা সে কিভাবে পালবে, তা নিয়ে তার শাশুড়ি আতঙ্কিত হয়ে রইলেন।

বাচ্চার দাবি তো মেটাতে হবে। ক্ষুধার্ত সে। বাচ্চাটা যখন দুধ টানে সুচিতা বুঝতে পারে সে নিজে এখনো শেষ হয়ে যায়নি। কোত্থেকে যেন পৃথিবীর সব শক্তি তার  ভেতরে সঞ্চিত হয়ে বাচ্চার খাদ্য ঠিকই জুগিয়ে যাচ্ছে। এবং এক অপার্থিব শক্তি-সংযোগের কারণে দেখা গেল বাচ্চার স্বাস্থ্য যেমন ক্রমেই নাদুসনুদুস হয়ে উঠছে, তেমনি সুচিতাও ধীরে ধীরে তার সৌন্দর্য ফিরে পাচ্ছে। তার শাশুড়ি নামাজ পড়ার সময় প্রতি রাকাতে আল্লাহর কাছে রহম চান যেন সুচিতা ও তার বাচ্চা ভালো থাকে। একদিন সকালে টেবিলে নাশতা দেওয়ার পর তিনি নাতিকে কোলে নিয়ে বসলেন, আর সুচিতা পাশে বসে নাশতা করছিল। শাশুড়ি লক্ষ করলেন, মা হওয়ার পর সুচিতাকে আগের চেয়ে অনেক কমনীয় আর সুন্দর লাগছে। ত্বকে যেন মাখনের পরশ। আনন্দে আবার চোখ বুজলেন সুচিতার শাশুড়ি।

ছয়.

জামিলা মজিদ ভালোভাবে দেখলেন সুচিতাকে। বললেন, না, সব ঠিক আছে, ইউ আর আউট অব ডেঞ্জার। তবে মা, বলি তোমাকে, সবই আল্লাহর দান। আমরা কিছুই করতে পারি না, যদি না ওপর থেকে নির্দেশ থাকে। পাশে বসা সুচিতার শাশুড়িকে বললেন, আসলে মানুষের জীবনটা একটা রেলগাড়ি করে কোথাও যাওয়ার মতো। রেলগাড়িটা যাচ্ছে, কিন্তু ওপরের নির্দেশে যার যেখানে নেমে যাওয়ার সে সেখানে নেমে যাচ্ছে। কিচ্ছু করার নেই।

সুচিতার শাশুড়ি বললেন, তা তো অবশ্যই। কিন্তু আপনি ছিলেন আপা অছিলা। আপনি হাত না দিলে যে এ বিপদ থেকে কিভাবে উদ্ধার পেতাম জানি না।

জামিলা মজিদ আবার দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, না, না, সবই আল্লাহর ইচ্ছা।

সাত.

আমি তো মারা যেতে লাগছিলাম।

সুচিতার কথায় সাজু বললেন, হ্যাঁ, ডাক্তার জামিলা না হলে আসলে কী হতো জানি না। আমি এত ভয় পেয়েছিলাম, শুধু মনেপ্রাণে আল্লাহকে ডেকেছিলাম, তিনি যেন বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।

সুচিতা খুব ঠাণ্ডা গলায় বলল, আমি মারা গেলে কী হতো! পৃথিবীর আলো-বাতাস ঠিক আগের মতোই চলত। মাঝখান থেকে তুমি হয়তো একটা বিয়ে করতে।

সাজু প্রায় বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, খবরদার ওই কথা বলবে না। কুকথা মুখে আনতে নেই। তারপর স্বাভাবিক গলায় বললেন, এখন আব্বা বলছেন, বৌভাত না, নাতির আকিকা করবেন। ওইটাই বরঞ্চ ভালো। কি বলো?

রকিকে সাজুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, একটু ধরো।

সুচিতা এরপর বিছানা থেকে নেমে মেঝের মধ্যে চাদর বিছাল। কোল বালিশটা দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে পিঠে হেলান দিয়ে বসল।

সাজু বলল, কী, সেতার বাজাবে?

সুচিতা মৌন ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ।

সাজু রকিকে বিছানায় রেখে ঘরের কোণে রাখা সেতারের কাভার খুলে সেটা সুচিতার কাছে এগিয়ে দিল।


মন্তব্য