kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

সামাজিক বাস্তবতা আর কল্পনা মিগুয়েল আস্তুরিয়াসের লেখায়

১০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সামাজিক বাস্তবতা আর কল্পনা মিগুয়েল আস্তুরিয়াসের লেখায়

১৯৬৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান গুয়াতেমালার কবি, সাংবাদিক, নাট্যকার ও কথাসাহিত্যিক মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল আস্তুরিয়াস। কঠিন বাস্তবতার বর্তমান আর ভাবালু অতীতের মিশেলে তৈরি হয়েছে আস্তুরিয়াসের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম।

লাতিন আমেরিকার রোমান্টিসিজম বিষয়ে তিনি নোবেল ভাষণে উল্লেখ করেন, ‘লাতিন আমেরিকার রোমান্টিসিজম শুধু সাহিত্যিক ঘরানা নয়, দেশপ্রেমমূলক পতাকাও বটে। কবি, ইতিহাসবিদ ও ঔপন্যাসিকরা তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আর সৃষ্টির স্বপ্ন বুননের জন্য তাঁদের দিন-রাতকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। ’

আস্তুরিয়াসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা গুয়াতেমালায়। তবে জীবনের একটা বড় সময় তিনি কাটিয়েছেন দেশের বাইরে। পড়াশোনার জন্য একসময় ছিলেন প্যারিসে। পরবর্তী সময় স্বৈরাচারী শাসনের বিপক্ষে সরাসরি মতামত প্রকাশ করার দায়ে তাঁকে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশে এবং ইউরোপে নির্বাসনে থাকতে হয়। ১৯৪৬ সালে আস্তুরিয়াস কূটনীতিকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

মধ্য আমেরিকার মায়া সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব পড়েছে আস্তুরিয়াসের লেখার ওপর। তাঁর লেখার বিষয়বস্তু ও শৈলীর ধরন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে মায়া সংস্কৃতি।

স্পেনীয় দখলদারদের আগমনের আগে মায়া সভ্যতা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক অগ্রসর ছিল। মায়া ঐতিহ্যে আস্তুরিয়াসের গভীর বিশ্বাস ছিল। তাঁর উপন্যাসে মায়া সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতীয় চিত্রকল্পের মিশ্রণ ঘটিয়ে প্রচলিত কাহিনিগুলোকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। প্যারিসের সোরবনে পড়াশোনা করার সময় সেখানে মায়া সভ্যতার বিশেষজ্ঞ জর্জ রেনোডের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন আস্তুরিয়াস। ১৯২৬ সালে তিনি গুয়াতেমালার প্রাচীন ইতিহাস ও পুরাণকথার পবিত্রগ্রন্থ ‘পোপল ভুহ’ অনুবাদ করেন। এখানেই তিনি দেখা পান তাঁর জন্মস্থানের মায়া সংস্কৃতির লোককাহিনির। মায়া সভ্যতায় ভুট্টা একটি বিশেষ অপরিহার্য প্রসঙ্গ। শুধু প্রধান খাবার হিসেবে নয়, কাহিনি তৈরিতেও ভুট্টার ভূমিকা ছিল। আস্তুরিয়াসের ‘মেন অব মেইজ’-এর নাম থেকেই তাঁর ওপরে মায়া সভ্যতার প্রভাব বুঝতে পারা যায়। এ উপন্যাসে মায়া সংস্কৃতির জীবনযাপন, রীতি-প্রথা, মনমানসিকতা ইত্যাদির সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয় এই কল্পকাহিনি।

আস্তুরিয়াস কোনো মায়া ভাষায় কথা বলতেন না। তবে তিনি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন, মায়া সংস্কৃতির মানসিকতা ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি শুধু অন্তর্জ্ঞান ও অনুমানের ওপর নির্ভর করেছেন। কাহিনি তৈরির জন্য এ রকম স্বাধীনতার কারণে ভুলত্রুটি হওয়া খুব স্বাভাবিক। তবে তাঁর অন্তর্জ্ঞান কট্টর বাস্তবতার চেয়ে বরং ভালো মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর লেখায় বাস্তবতার কঠিন সমর্থনের ওপর ভিত্তি না করে পর্যবেক্ষণমূলক শৈলী ব্যবহার করার পক্ষপাতী ছিলেন।

মায়া সংস্কৃতির মানস ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে আস্তুরিয়াসের নিজস্ব ধারা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘লোকমুখে অনেক শুনেছি, কল্পনা করেছি অল্প, তবে বাকিটা নিজেই তৈরি করে নিয়েছি। ’ অনেক উপাদান তিনি নিজের মতো করে তৈরি করে থাকলেও মায়া সংস্কৃতির নিজস্ব জীবনযাপনে তাঁর নিজের প্রজ্ঞা মেশানোর কারণে তাঁর উপন্যাস আরো যথার্থতা পেয়েছে, আরো বিশ্বাসযোগ্য ও প্রাণবন্ত হয়েছে।

গুয়াতেমালার সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৭৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দেশের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর নামে সাহিত্য পুরস্কার ও বৃত্তির প্রচলন করে। এ রকম একটি পুরস্কারের নাম হলো ‘মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল আস্তুরিয়াস সাহিত্য পুরস্কার’। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেন্ট্রো কালচারাল মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল আস্তুরিয়াস গুয়াতেমালা সিটি ন্যাশনাল থিয়েটার। দেশের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধাসহ স্মরণ করে, কারণ গুয়াতেমালার নিজস্ব দেশীয় সংস্কৃতিতে তাঁর গভীর বিশ্বাস ছিল। আস্তুরিয়াসকে লাতিন আমেরিকার এবিসি লেখকদের অন্যতম মনে করা হয়। এবিসি লেখকরা হলেন আস্তুরিয়াস, বোর্হেস ও কার্পেন্তিয়ের। তাঁরা লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে আধুনিকতার প্রচলন করেন। জাদুবাস্তবতা ধারার অন্যতম অগ্রপথিক মনে করা হয় আস্তুরিয়াসকে। আস্তুরিয়াস তাঁর লেখার মধ্যে চেতনা প্রবাহের ব্যবহার শুরু করেন বলে তাঁর কথাসাহিত্যকে ফ্রান্জ কাফকা, জেমস জয়েস ও উইলিয়াম ফকনারের কথাসাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে।

দুলাল আল মনসুর


মন্তব্য