kalerkantho


বই আলোচনা

জুলফিকার মতিনের ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’

আমিনুল ইসলাম

১০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



জুলফিকার মতিনের ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট যেমন এক দিনে রাতারাতি হয়নি, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের প্রভাবও বাঙালির জাতীয় জীবনে ফেলেছে সুদূরপ্রসারী। এমনকি এই ২০১৭ সালেও ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নিয়ে শরগরম হয়ে ওঠে রাজনীতির মাঠ থেকে ব্যক্তিজীবন।

প্রকৃতপক্ষে সেই যুদ্ধের কঠিনতম বাস্তবতা শুধু ভূখণ্ডগত লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যক্তিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম হয়ে উঠেছিল বলেই মানুষ যেন অনেকটা বংশানুক্রমিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে গিয়েছিল। গল্পকার জুলফিকার মতিনের ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ বইয়ের আটটি গল্পে সে বিষয়গুলোই ফুটে উঠেছে বারবার।

প্রথম গল্প ‘শেষ চিঠি’তেই একজন মানুষের মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট নির্মোহভাবে ফুটে উঠেছে লেখকের লেখনীতে। গল্পকথক সত্তরের নির্বাচনে ভোট দিতে বাড়িতে যায়, তারপর আর ফেরা হয়নি ঢাকায়। গ্রামীণ জীবনে প্রকৃতির সাহচর্য তাকে বেশ আমুদে করে তোলে সহজেই, খালাতো বোন তথা প্রেমিকা নীলার চিঠি নিরালায় বসে পড়ায় পায় অমলিন তৃপ্তি। এরই মধ্যে একদিন আসে ২৬ শে মার্চ তারিখটা। সকালে রেডিও অন করে দেখে কোনো সাড়া-শব্দ নেই, ভাবে রেডিওটাও বুঝি নষ্ট হয়ে গেছে অথচ ততক্ষণে নষ্ট হয়ে গেছে তার স্বপ্নবিভোর কল্পনার পৃথিবীটা। খবর এলো পাকিস্তানিরা ঢাকা আক্রমণ করে মেরে ফেলেছে হাজার হাজার মানুষকে। ঢাকা এখন মৃত্যুপুরী।

জান নিয়ে পালাচ্ছে সবাই। ওদের অজপাড়াগাঁয়েও নেমেছে মানুষের ঢল। অনাগত আত্মীয়ের মতো মানুষ আর মানুষ। গল্পকথক বিচলিত হয়, সবাই এলো কিন্তু নীলার কোনো খোঁজ নেই। বেশ কিছুদিন পর খালা-খালু এলেন কিন্তু সঙ্গে নীলা নেই। নীলা হারিয়ে গেছে বিষাক্ত সাপের নীলদংশনে। স্বপ্নের মৃত্যু। এমনি হাজারো স্বপ্নের বিসর্জনে অর্জিত মহান স্বাধীনতার গল্পই গেঁথেছেন অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক ও গল্পকার তাঁর লেখনীতে।  

‘পূর্বজন্মের হত্যাকাণ্ড’ গল্পটি যেমন একটি ভিন্ন আবহ তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষের জীবন-বাস্তবতা তুলে ধরেছে। মানুষ যে স্বভাবতই হিংস্র, আত্মরক্ষার স্বার্থে প্রতিবাদী হবে, এমন কোনো কথা নেই। একটি বিশাল জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ভয়ে বেঁচে থাকে। গল্পের নায়ক সাখায়াত্ তেমনি একজন মানুষ। উচ্চশিক্ষিত ও পাকিস্তানপন্থী হলেও পাকিস্তানিদের হামলার সময়ে সে ভয়ে থতমত খেয়ে যায়। কিন্তু তার সুশিক্ষিতা ও গুণবতী স্ত্রী জেরিনা সাহসী। সাহস করেই পাকিস্তানি অফিসারের মুখোমুখি হয়, উর্দু ভাষার দক্ষতা দিয়ে প্রথমে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর তার শরীরটা ব্যবহার করে আত্মরক্ষার বর্ম হিসেবে। নারীর সবচেয়ে দুর্বলতাই তার আত্মরক্ষার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে। জেরিনা তেমনিভাবে বেঁচে থাকে। সাখায়াত্ তীব্র মানসিক যন্ত্রণা আর অন্তর্দহনে জ্বলতে থাকে। দুজনের মনোমালিন্য তৈরি করে তীব্র ব্যবধান। ভালোবাসার জায়গাটা পূর্ণ হতে থাকে ঘৃণায়। সাখায়াত্ কাপুরুষ হিসেবেই বারবার জেরিনার কাছে উপস্থাপিত হয়। অথচ এত সবের ভেতর দিয়েও মানুষের আদিম বাসনা জেগে ওঠে। কাপুরুষও পৌরুষ যন্ত্রণায় হাত বাড়ায় নারীর শরীরে; কিন্তু সে নারী তো মরে গেছে বহুদিন আগে। জেরিনা স্বপ্ন দেখে, বীভত্স স্বপ্ন, যে স্বপ্ন ঘৃণা, যে স্বপ্ন নষ্ট জীবনের।

‘সীমন্তিনী’ গল্পটিতে আবার মুক্তিযুদ্ধ এসেছে বেশ কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্বের চিত্রকে সামনে নিয়ে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হাজারো তর্কবির্তক বেঁচে ছিল সে সময়ে, এমনকি আজ ২০১৭ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আরেকটি গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের কার্যকারণ সূত্র নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। এসব অবশ্য রাজনীতির মারপ্যাঁচ; কিন্তু তা থেকে বাদ যায়নি সাধারণ মানুষের জীবনও। ‘সীমন্তিনী’ গল্পে দেখা যায়, বৃদ্ধ আশ্রয় দেন মুক্তিযোদ্ধার একটি দলকে। অথচ তাঁর ছেলের কাছে এদের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে গ্রামীণ জীবনের একটি বিশাল অংশই মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তেমন কিছু জানতে পারেনি কোনো দিন, বেঁচে থাকার নিরন্তন সংগ্রাম, দুমুঠো অন্ন জোগাতে দিশাহারা মানুষের কাছে আক্রমিত হওয়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই ছিল না। তাই বৃদ্ধের পুত্র তার স্ত্রী টিয়াকে মুক্তি বাহিনীর নেতার সঙ্গে কথা বলতে দেখে সন্দেহের চোখে দেখেছে। মুক্তি বাহিনীকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য শান্তি বাহিনীকে খোঁজ দিয়েছে অথচ টিয়াকেই হারাতে হয়েছে সম্ভ্রম।

এ ছাড়া আছে ‘খোঁজা’, ‘বন্দুক’, ‘মেয়াদ’ ও গ্রন্থের সর্বশেষ গল্প ‘প্রতিরূপ’।

সার্বিকভাবে জুলফিকার মতিনের সব গল্পে উঠে এসেছে মানব চরিত্রের নানা দিক এবং তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সংশ্লিষ্টতা। একাত্তরকে বিষয়বস্তু করে অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক গল্প রচনা করেছেন। সহস্র গল্প পাওয়া যাবে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক; কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ, প্রিয়জন হারানোর ব্যথা, বীরত্ব, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ইত্যাদি বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে। জুলফিকার মতিন সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে দেখেছেন মানুষের অন্তর্জগতের যন্ত্রণা, হতাশা, নৈরাশ্য ও ব্যথাকে। তিনি বেছে নিয়েছেন ব্যক্তি চরিত্রের ভেতরের বাস্তবতাকে। তাই নীলাকে হারানোর হাহাকারটা শ্রেণি-চরিত্রধর্মী না হয়ে একান্ত ব্যক্তিগত হয়েছে, একই সঙ্গে সর্বজনীন ব্যঞ্জনা নিয়ে।   

‘মুক্তিযুদ্ধ’ বা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধ’ শুধু একটি ছোট্ট শব্দই না; জুলফিকার মতিন ঠিক সেটিকে স্পর্শ করে মুক্তিযুদ্ধের গল্প লিখতে বসেছিলেন। তাঁর অন্যান্য গল্পের অনুসন্ধান করব এবং পড়ব এমন প্রত্যাশা রইল নিজের কাছে। আটটি গল্প নিয়ে ছাপা ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল আফসার ব্রাদার্স থেকে। মূল্য ১০০ টাকা।


মন্তব্য