kalerkantho


বই আলোচনা

দহনকথা : তেভাগার শিল্পরূপ

১৩ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



দহনকথা : তেভাগার শিল্পরূপ

দহনকথা : শরীফ আতিক-উজ-জামান প্রকাশক: ধ্রুবপদ। প্রচ্ছদ : রিও মূল্য : ১৬৩ টাকা।

বাংলার কৃষক আন্দোলনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। যেসব এলাকায় তেভাগার আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল নড়াইল জেলা তার মধ্যে অন্যতম। তেভাগা আন্দোলন মোটেও সফল হয়নি ইতিহাসের কাল বিচারে এ কথা বলা যাবে না। কারণ ১৯৪৬ সালে শুরু হওয়া এ আন্দোলন যে ইশতেহার রচনা করেছিল যে কৃষককে আর শোষণের ওই স্তরে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া তেভাগা, টংক নানকার নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ সবই বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের এক একটি সোপান। শরীফ আতিক-উজ-জামান অসম্ভব মেধাবী একজন লেখক, শিল্পী ও ইতিহাসবেত্তা। নড়াইলের মাটিবর্তী এই শিল্প কারিগর তেভাগা নিয়ে মাইলফলক সব কাজ করেছেন। সম্প্রতি মাটির দায় মেটাতে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের এ শিক্ষক লিখেছেন উপন্যাস দহনকথা। তেভাগা গণসংগ্রাম নিয়ে এমন উপন্যাস সম্ভবত এটাই প্রথম। ‘চিত্রা নদীর পারে বিশাল হাট। নদীর পার ঘেঁষে রাস্তা। খোয়া উঠে মাঝেমধ্যে হাঁ হয়ে আছে। সেই রাস্তার ওপরই হাট। উত্তর থেকে দক্ষিণ দিক, একেবারে ভিক্টোরিয়া কলেজ পর্যন্ত টানা লম্বা রাস্তা। শুরুতেই মেছোহাট, তারপর চাল, মুদি, তরিতরকারি, গুড়, মিষ্টি, জলফক্কর, লুঙ্গি, জামা-কাপড়, মাটির বাসনকোসন, মেয়েদের সস্তা প্রসাধনী, অন্তর্বাস, শোলার তৈরি পুতুল ইত্যাদির বিক্রি চলছে পাশাপাশি পসরা সাজিয়ে। এর মাঝেই বিকট ও বিচিত্র হাঁকডাক করে ফেরিওয়ালারা কেউ দাঁদের মলম, কেউ ইঁদুর-তেলাপোকা মারার বিষ, কেউ যৌন দুর্বলতার ভেষজ ওষুধ, কেউ বা বিছানায় পেচ্ছাব, কিশোরদের স্বপ্নদোষ ও নানাবিধ জানা-অজানা স্ত্রীরোগ নিরাময়ের তাবিজ-কবচ বিক্রি করছে। সব সমস্যার একই তাবিজ। পরিচিতজনের দৃষ্টি এড়িয়ে কেউ কেউ যৌনবর্ধক ওষুধ কিনছে। দ্রুত দাম মিটিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাচ্ছে।’ (পৃষ্ঠা-৮) শরীফ আতিক-উজ-জামানের এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে তেভাগার অঞ্চলগুলোর আর্থ-সামাজিক পরিচয় মেলে। বর্ণনার সারল্য প্রমাণ করে এই অঞ্চলের প্রতিটি বালুকণার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা থেকে কাজটি করেছেন। এই সমাজ কোন সমাজ? মরচে পড়া এই সমাজের ফাঁকফোকরে জেগে থাকে শুয়োপোকা, সাপ, স্বর্ণবোড়া। রাঘব-বোয়াল রাষ্ট্র চায় এ সমাজকে টিকিয়ে রেখে শোষণ করতে। তাদের সহযোগী হয় এসব শুয়োপোকা, সাপ গোছের মানুষরা। মেহনতি মানুষের রক্ত শোষণ করে বেঁচে থাকা পুঁজিনির্ভর রাষ্ট্রের পেটোয়া পেটিবুর্জোয়ারা। তাদের সারা বছরের শ্রম শোষণ করে তাদের দাঁদ, প্যাটরায় ভরে দেয় সমাজের দেহ। মানুষ বিশ্বাস হারায়। আত্মবিশ্বাস হারানোয় যৌনজীবনে আসে অবিশ্বাস। এমন সমাজ সংগ্রাম ছাড়া যে বদলায় না, তা তারা জানে না। মাঠে মাঠে সোনালি ধান ঢেউ খেলে, সেই ধান দেখে কৃষক স্বপ্ন বোনে। ধান উঠলে তার বেশির ভাগ চলে যায় মহাজনের গোলায়। এর বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। কারণ এর মালিকরা রাষ্ট্রের পেটোয়া। এই বাস্তবতা যারা বোঝে, তারা তেভাগাকে মুক্তির ইশতেহার হিসেবে মেনে নিয়ে লড়াই-সংগ্রাম শুরু করে। তেভাগার ডাকে কৃষকরা দলে দলে আসতে থাকে। কৃষকদের অবিসংবাদিত নেতা নূর জালাল সব তদারকি করতে থাকে। দীর্ঘদিনের শোষণে অতিষ্ঠ কৃষক যে তেভাগার মধ্য দিয়ে মুক্তির ইশতেহার খুঁজেছিল লেখক তা সুচারুভাবে বর্ণনা করেছেন। এবং এই শান্ত অঞ্চলের শোষিত কৃষক একদিন দধীচির হাড় হয়ে উঠেছিল, ‘হয় ধান নয় প্রাণ’ এর প্রশ্নে কৃষক মেহনতি মানুষ সর্বস্ব নিয়ে মাঠে নেমেছিল। তাদের নেতা নূর জালাল, মোদাচ্ছের, অমল সেনাদের নেতৃত্বে। পাকিস্তানি জান্তার অত্যাচারে মাথায় একদিন তারা ধরে ফেলে নূর জালাল অমল সেনদের। ফিরে দাঁড়ায় এক কৃষকের কিশোর ছেলে ছনু, কৃষক ছলেমানের ছেলে সে। সে পাথর ছুড়তে থাকে। এ পাথরকে লেখক যেভাবে ব্যবহার করেছেন তাতে মনে হয় একদিকে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে ছনু পাথর ছুড়তে থাকে; কিন্তু সব রোখা যায় না। পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা পতিত পাথরের ভেতরেই জগদ্দল আকার নেয়। আবার তারা ছোবল মারতে মরিয়া হয়ে ওঠে, তবু লেখক হতাশ হন না।  তেভাগা যেসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল তার একটি লড়াকু অংশ নড়াইল। এ অঞ্চলের সংগ্রামের পটভূমি নিয়ে লেখা উপন্যাসটি তেভাগার শিকড়ের সন্ধানীর যেমন ডায়রি, তেমনি ‘দহনকথা’ নড়াইল অঞ্চলের গণসংগ্রামের শিল্পরূপ বললে অত্ত্যুক্তি হবে না। তবে এটা ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলও। একজন রাজনীতিক গবেষকের কাজটিও তিনি করেছেন সুচারুরূপে। সুপাঠ্য ও বাঙালির গণসংগ্রামের এ দলিল পাঠককে পাঠের আনন্দ দেবে বলে ধারণা করি। শরীফ আতিক-উজ-জামানের ‘দহনকথা’ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে বলে বিশ্বাস করি।

 

দীপংকর গৌতম


মন্তব্য