kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

সোভিয়েতবিরোধী তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয় ব্রডস্কির কবিতায়

১৩ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



সোভিয়েতবিরোধী তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয় ব্রডস্কির কবিতায়

‘চিন্তার স্পষ্টতা আর কাব্যিক তীব্রতায় প্রাণিত সর্বগ্রাহী লেখকসত্তার’ জন্য ১৯৮৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান রুশ আমেরিকান কবি ও প্রবন্ধিক যোসেফ ব্রডস্কি। জন্ম ১৯৪০ সালের ২৪ মে।        

যোসেফ ব্রডস্কির কবিতা সম্পর্কে ১৯৭৩ সালে অডেন বলেছিলেন, ‘তাঁর কবিতায় রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা, মানুষের সামগ্রিক অবস্থার চিত্র তথা মানুষের অস্তিত্বের অর্থ এবং মৃত্যু সম্পর্কিত নিজের চিন্তা-চেতনার প্রকাশ।’ ব্রডস্কির কবিতায় স্থান পেয়েছে মেক্সিকান ও ক্যারিবীয় সাহিত্য থেকে শুরু করে রোমের কবিতা অনুরণন। এসব বিষয়ের সঙ্গে তিনি মিশিয়েছেন বাহ্যিক ও অধিবিদ্যার উপাদান। কোথাও সরাসরি স্থান এবং স্থান সম্পর্কিত চেতনার প্রবেশ দেখা যায়। আর বর্তমানকে তিনি সমৃদ্ধ করেন অতীত ও ভবিষ্যতের ছায়া এনে। ব্রডস্কির কবিতার ধরন সম্পর্কে স্টিফেন স্পেন্ডার বলেন, ‘তাঁকে উদারপন্থী কিংবা সমাজতান্ত্রিক মনে করার কোনো কারণ নেই। তাঁর কাজকর্ম নিরানন্দে ভরা হিংস্র সত্য নিয়ে। তিনি অতিশয় বাস্তববাদী; তাঁর বাস্তবতার মধ্যে স্বস্তি পাওয়ার ব্যাপারটিই নেই। পাঠক হিসেবে আপনি চাইবেন তিনি যেন সুন্দরের কথা ভাবেন। কিন্তু তিনি সে রকমটি ভাববেন না মোটেও। তবে পরম মাত্রায় সত্যবাদী, নির্ভীক ও পবিত্র। ভালোবাসতে পারেন, ঘৃণাও করতে পারেন।’

এমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী কবিকে সহ্য করতে হয়েছে শাসকারোপিত অশেষ যন্ত্রণা। ১৯৬৩ সালে লেনিনগ্রাদের এক খবরের কাগজ ব্রডস্কির কবিতার নিন্দা জানায় : সোভিয়েতবিরোধী তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয় তাঁর কবিতায়। এরপর থেকে নানা রকম হেনস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। গ্রেপ্তারও করা হয়। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ মনে করে, কবি হিসেবে সমাজের প্রতি তাঁর কোনো অবদান নেই।  

ব্রডস্কিকে পরগাছা আখ্যা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি রুশ কর্তৃপক্ষ। তাঁকে পাঁচ বছরের সশ্রম নির্বাসন দেওয়া হয় লেনিনগ্রাদ থেকে ৩৫০ কি.মি. দূরে। কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেন তিনি। সে সময়ও তাঁর লেখা থেমে থাকেনি। ইংরেজ ও আমেরিকান কবিদের কবিতা পাঠ করতেন নিয়মিত। তখন বেশি পড়তেন ডান, ফ্রস্ট, অডেন প্রমুখের কবিতা। 

জীবনের কঠিন সময় ধৈর্যের সঙ্গে পার করেন তিনি। তবে কবি ব্রডস্কির রসবোধের ঘাটতি ছিল না। রুশ কর্তৃপক্ষের অফিসাররা শেষ পর্যন্ত তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। মস্কো ত্যাগ করার আগে তিনি নিওনিদ ব্রেজনেভকে এক সরস আবেদনে লিখে যান, রাশিয়ার সাহিত্য থেকে এবং রাশিয়ার মাটি থেকে যেন তাঁর নামটা মুছে ফেলা না হয়। ১৯৬৪ সালে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। বিচারক জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনাকে কবির স্বীকৃতি কে দিয়েছে? কবিদের কাতারে আপনাকে কে তুলেছে?’ ব্রডস্কি যথাযথ উত্তর দেন, ‘কেউ না। আমাকে মানুষের কাতারেই বা কে তুলেছে?’ তাঁর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরে এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি আমেরিকার নাগরিক হয়ে রুশ ভাষার কবিতার জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন। নিজেকে রুশ, না আমেরিকান মনে করেন?’ উত্তরে বলেন, ‘আমি একজন ইহুদি, একজন রুশ কবি, একজন ইংরেজ প্রবন্ধকার এবং অবশ্যই একজন আমেরিকান নাগরিক। পুরস্কার পাওয়াটা আমার জন্য বড় পাওয়া হলেও মানবজাতির জন্য তুচ্ছ একটা ঘটনা।’

তাঁর কবি মানস গঠনে অগ্রজ কবিদের প্রভাব বেশ স্পষ্ট। ইংরেজ মোটাফিজিক্যাল কবিদের খুব পছন্দ করতেন ব্রডস্কি। রবার্ট লোয়েল, অক্টাবিও পাজ, ডেরেক ওয়ালকট, সিমাস হিনি, টমাস ভেনক্লোভা প্রমুখের কবিতার ভক্ত ছিলেন তিনি। ওয়ালকট ও হিনির সঙ্গে ছিল দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্বও। ব্রডস্কির ওপর ছিল অগ্রজ কবি আনা আখমাতোভার অফুরন্ত আশীর্বাদ। তাঁকে নিয়ে আখমাতোভার উচ্চাভিলাষও ছিল। ব্রডস্কির ওপর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের নির্যাতনের প্রতিবাদে আখমাতোভা বিরক্তি প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, ‘এদের কাজকর্ম দেখে মনে হচ্ছে ব্রডস্কি এদের এসব করার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভাড়া করেছেন।’ শহীদ কবি ওসিপ ম্যান্ডেলস্টামের স্ত্রী নাদেঝদা ম্যান্ডেলস্টামও ব্রডস্কিকে স্নেহের চোখে দেখতেন। তাঁর এবং আনা আখমাতোভার নয়নমণি ছিলেন ব্রডস্কি। তাঁরা দুজনই স্বপ্ন দেখতেন। ব্রডস্কি একদিন রুশ কবিতাকে আলোর পথে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন, তাঁদের শিকড়ের কাছে পৌঁছে দেবেন কবিতাকে। এক কথায়, ব্রডস্কি ছিলেন তাঁদের প্রত্যাশার প্রতিমা।  অডেনসহ আরো অনেক অগ্রজ কবির পক্ষ থেকে তাঁর বিপদের দিনে ব্রডস্কি অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছিলন। ব্রডস্কির অকালপ্রয়াণ ঘটে ১৯৯৬ সালে।

দুলাল আল মনসুর


মন্তব্য