kalerkantho


প্রতিমুখ মুখরতা

আলী সিদ্দিকী

১১ মে, ২০১৮ ০০:০০



প্রতিমুখ মুখরতা

এত দ্রুত এত ঘটনা ঘটে যাবে, বদলে যাবে পুরো চালচিত্র, ঘোলাটে অচেনা আর সংশয়পূর্ণ হয়ে উঠবে সব কিছু তা ভাবতেও পারেনি কেউ। চেনা পথগুলো, অতিচেনা মুখগুলো, শাণ দেওয়া স্বপ্নগুলো এমন করে চুরমার হয়ে যাবে তা কারোরই ভাবনায় ছিল না। মানুষের ঘামগন্ধরক্ত নিংড়ানো মুক্তির দিগন্তে ভাঙনের উন্মত্ততায় বিহ্বলতার দীর্ঘ ছায়াপাতে উজ্জীবিত প্রাণগুলো মুচড়ে পড়ে। ওপরের দিক থেকে ফাটল দ্রুত নিচের দিকে নেমে এসে চৌচির করে দেয় জমাট হতে থাকা ভিত্তিমূল। লড়াকু মিছিলের মুখগুলো, মুষ্টিবদ্ধ হাতগুলো, অগ্নিময় কণ্ঠস্বরগুলো, নতুনের স্বপ্নে বিভোর প্রাণগুলো খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায় চুরচুর করে। দল-উপদলে কোন্দলের কাদা ছোড়াছুড়িতে উদ্দীপ্ত উদ্বেলিত মানুষগুলো ছিটকে গেল দিগ্বিদিকে। কোন দিকে যাবে, কাকে বিশ্বাস করবে, কোন পথে পা বাড়াবে এই দোলাচলে পড়ে অনেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে গেল শুয়োপোকার মতো। স্বপ্নহারা দিশাহারা কেউ কেউ হয়ে গেল ভীষণ খেপাটে, রগচটা, মারমুখী। তুবড়িফোটা মুখে যেন পড়ে গেল অদৃশ্য তালা। আত্মমুখী হতে গিয়ে অনেকে নিজেদের আবিষ্কার করে দুঃসহ রূঢ় এক বাস্তবতায়। স্বপ্নের ঘোরে যে জীবন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এত দিন, সেই বাস্তবতার বীভৎসতা তাদের নিমজ্জিত করে ঘোর হতাশায়।

আমাদের গল্পের মেহরাজ তাদেরই একজন। মেহরাজ দেখে ব্যক্তি মানুষটি সবার মাঝে থেকেও একটি আলাদা একক কিন্তু তার কোনো স্পেস নেই। নিজের চৌহদ্দির অধিকারটুকুর জন্য তাকে চারপাশের আপনজনদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সাংঘর্ষিকতার মধ্য দিয়ে হচ্ছে যেতে। ঈর্ষা, হিংসা, বিদ্বেষ কেমন যেন থিকথিক করছে সবার ভেতর। সবাই যেন গোপন চোরকাঁটা নিয়ে একে অপরের পিছে পিছে ঘুরছে দিন-রাত। সবাই আছে গলায় গলায় অথচ অন্তরে বিষাক্ত বুদবুদ, আমি আমি। সবার গলায় শোভনীয় নানা বর্ণের নানা পদের জপমালা। প্রতিমুখে মুখ ঢেকে মূকাভিনয়ে সবাই সততকৌশলী। সে মুখগুলো পড়তে চায় কিন্তু বর্ণমালাগুলো বড়ই দুর্বোধ্য আর অচেনা। এ মুহূর্তে তার অফিসের মুখগুলো নানা আদলে, বহুবিধ বর্ণিলতায় আর মুখ-প্রতিমুখতা নিয়ে সামনে চলে আসে ঝপাৎ করে। পাঁচ বছর অমানুষিক পরিশ্রমের পর তাকে পদোন্নতি দেওয়ার কথাটা চাউর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখগুলো ঢেকে যেতে থাকে প্রতিমুখের বর্ণিল আড়ালে। আবডালে তো বটেই, নানা ধরনের টিকা-টিপ্পনীসহ কথাচ্ছলে-গল্পচ্ছলে শুনিয়ে দেওয়া হয় তাকেও। যাদের সঙ্গে জীবনের সিংহ ভাগ সময় কাটে তাদের ঈর্ষাকাতরতার কুটিল চেহারা দেখে বুকে নীরব রক্তক্ষরণ অনুভব করে মেহরাজ। এক ধরনের বিহ্বলতার শীতলতা তার হাড় ও মজ্জায় কাঁপুনি তোলে। কি, মন খারাপ? দুপুরে খাবারের অবসরে চাপা স্বরে অন্যদের কাছে পদোন্নতির বিষয়টি ফাঁকা আওয়াজ বলে খোঁচা দেওয়া মুশারফ কাঁটা ফোটায়। আমি কী বলেছি? রূঢ়তা ঝলসে দেয় তার চোখ-মুখ, নিজের চরকায় তেল দিন।

অকপটতার অভিনয় করতে গিয়ে আড্ডার মানুষগুলোও কথার পেছনে কথা লুকিয়ে মুখের কথায় আসর মাত করার ক্ষেত্রে বড়ই চতুর। আত্মগরিমার কদর্যতাকে আড়াল করার নানা লেভেলের বর্ণচ্ছটায় নিজেদের মুখ ঢাকে। মেহরাজ খুঁটিয়ে নিখুঁত হারামিপনা খোদিত মুখগুলো দেখে আর ভাবে, মানুষগুলো কি অবলীলায় নিজের সঙ্গে সৎ থাকার অভিনয় করে যায়। আর এ সবের পেছনে সক্রিয়ভাবে ক্রিয়াশীল থাকে নিজস্ব জাগতিক প্রাপ্তি বরমাল্যে ও পদভূষণে। ঘৃণার ঘূর্ণি তার ভেতরে বিবমিষা জাগায় এবং তীব্র বমনেচ্ছায় সে পেট চেপে বসে পড়ে। কী হয়েছে তোর? ছায়াসঙ্গী মুকিত কাঁধে হাত রাখে। এত দুর্গন্ধ নিয়ে মানুষ কিভাবে ঘুরে বেড়ায়? তুই মানুষ দেখলি কোথায়? মুকিত চিকন হাসে, সব তো গিরগিটি—গিজগিজ থিকথিক করছে। তাহলে ওরা নিজেদের মানুষ পরিচয় দিচ্ছে কেন? এটাও বুঝলি না, খ্যাকখ্যাক হাসে মুকিত, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব বলে। মেহরাজের হিমশীতল সর্পস্পর্শের অনুভূতি হয়। সে যেন অনাবিষ্কৃত কোনো এক সর্পশংকুল পৃথিবীতে পতিত হয়েছে। চতুর্দিকে শুধু হিস্ হিস্ ধ্বনি। লিকলিকে জিভগুলো ঝরাচ্ছে লোভের লাভা। সবুজবিহীন রুক্ষ প্রান্তরে সে যেন দংশনে দংশনে নীল হতে হতে পোকামাকড়ে রূপান্তরিত হয়। সে দেখে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী কিছু মানুষ কি অবলীলায় ধনের পাহাড় চূড়ায় উঠে পড়ে। মিছিলে, মিটিংয়ে, আড্ডায়, মজলিশে, মগজধোলাই কারখানায় তাদের স্বাপ্নিক জাদুমন্তরে জীবন বাজির মেলা বসে। ঋষিজীবীর আলখেল্লায় ঢেকে দেয় শত তারুণ্যের জাগরণের আলো। মন্ত্রমুগ্ধ আত্মভোলা তারুণ্য পোড়ায় স্বপ্নের পাখা অবলীলায়। দ্রোহের দাহে ভস্মীভূত হয় তারুণ্যের ক্লেদহীন ভালোবাসা। দিশাহারা দরিদ্ররা থাকে তাদের ওপর প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে চলে আসা ঘাম-গন্ধ আর রক্তের মূল্যহীন জাঁতার উপকরণ হয়ে। দেবতা হয়ে ওঠা মানুষগুলো দারুণ নৈপুণ্যে নিজেদের রাক্ষুসী মুখ আড়াল করে নেয় প্রতিমুখে। গোপনে-প্রকাশ্যে লোভ-লালসার কণ্ঠলগ্ন হয়ে নিংড়ে নিতে থাকে মানুষের রক্ত সহজাত সাবলীলতায়। আবার প্রতিমুখ নিয়ে নতুন সার্কাস শুরু করে মানুষের মুক্তির স্লোগানে শহীদ মিনারে, পল্টনে, কাপাসিয়ায়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়।

এক রোদেলা দুপুরে মেহরাজ তেমন এক ঋষিজীবীর কলার ধরে তীব্র ঝাঁকুনি দেয়, বন্ধ কর তোদের ভণ্ডামি। করছিস কী তুই? মুকিত এসে বগলদাবা করে তাকে, এভাবে শুধু নিজেকেই শেষ করতে পারবি। কী করতে বলিস তুই? ক্রুদ্ধতার অগ্নস্ফুিলিঙ্গ মেহরাজের চোখে, আত্মহত্যা করতে? তিলে তিলে মরতে? একা কেন মরব? নিজেকে কন্ট্রোল কর মেহরাজ, মুকিত জলদকণ্ঠে বলে, আমরা কী করতে পারি? একটি-দুটি নিয়ে তো মরতে পারি মুকিত, মেহরাজ গা-ঝাড়া দেয়, কাপুরুষের মতো মরব না আমি। মেহরাজের মস্তিষ্কে দড়াম দড়াম হাতুড়িপেটা চলে অহর্নিশ। উদভ্রান্ত ঝোড়ো দিন আর নিরাশার বিস্তৃত রাত যাতনার নকশি বোনে মগজের কোষে কোষে। গুলিবিদ্ধ সামন্তের রক্তাক্ত দেহটি যখন সব রক্ত নিংড়ে তার প্রিয় মাতৃভূমিকে উৎসর্গ করছিল, তখন কেউ ছুটে এসে ওর মুখে একফোঁটা জল দেয়নি। তাকেও সবাই এক প্রকার জোর করে অগ্রসরমাণ সাঁজোয়া যান থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল।

সামন্তের ক্ষয়ে আসা চোখের আলোর শেষ ঝিলিক যেন আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে চৌপর সময়। অস্থিরতার সুতীক্ষ করাত যেন তার অস্থিমজ্জা কাটে দিন-রাত, পল অনুপল। ইচ্ছা হয় পুরো জগত্টাকে এক টানে ছিঁড়ে ফেলে ফড় ফড় করে। যত্ত সব বদমাস অফিসে তাকে পেছন থেকে টেনে ধরে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে, ইচ্ছা হয় তাদের সবার মাথা তরমুজের মতো ফালি ফালি করে মুখে পুরে নেয় সতৃপ্তিতে। নয়তো জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলে যত্ত সব পরগাছা ঋষিমুখী ক্রীড়নকদের। যারা রাতারাতি মানুষের হাড়-মাংস-রক্ত হজম করে দিব্য বনে যাচ্ছে শুভ্রতার প্রতীক। তাদের উলঙ্গ করে ঘোরায় রাজপথ-টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। সব ক্ষোভ, রাগ, দুঃখ আর অসহায়ত্ব সহজেই করায়ত্ত করে নেয় তার মাথার চুল। খোকা, আর কত নিজেকে কষ্ট দিবি? জীবনের অপরপ্রান্ত থেকে বুঝি মা তার তুলোর মতো কোমল হাত রাখে কাঁধে। মায়ের তুলনাবিহীন কষ্টের স্মারক সহস্র বলিরেখায় খোদিত মুখে মৃদু আলো নিয়ে জ্বলতে থাকা চোখের দুই কোণ চিক চিক করে। শুভ্র মেঘের সিঁড়িতে আবহমানের খলজলের স্পর্শের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে মা যেন তার চুলে বুলিয়ে দিচ্ছে পরম নির্ভরতার আঙুল। মেহরাজের ভেতরের আগুনে বুঝি একপশলা বৃষ্টির ছোঁয়া লাগে। সহোদরদের নিজস্ব ভঙ্গির গৃহকোণ রচিত হওয়ার পর সে দেয়ালের অপরপ্রান্ত থেকে শুধু হিস্ হিস্ শুনতে পায় দিন-রাত। মুখোমুখি প্রতিপক্ষ নয় কেউ কারো তবে আবডালে প্রতিনিয়ত চলে নানা কসরত, কুৎসা, বিদ্বেষ ছড়ানো আর আততায়ী উল্লাসে শাণ দেওয়া। কী চমত্কার একে অন্যের সীমানায় ঠেলে দেয় যাবতীয় বর্জ্য আর সুকৌশলে পাতে টেনে নেয় বাড়তি আবদার। পলিশ করা মুখগুলো ঘরের পুরো আবহ বদলে দিয়ে জড়ত্বের চাদরে ঢেকে দেয়।

বাবার সংগ্রামে পোড় খাওয়া শরীরে বয়সের ঘুনপোকা বিমর্ষতা আর বিবর্ণতার জাল বুনে চলে। বাজখাঁই গলায় জমাট বাঁধে নিশ্ছিদ্র নীরবতার জমাট অন্ধকার। তীব্র আলোয় উদ্ভাসিত চোখ জোড়ায় বর্ণহীন ভাষা। তাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা, অবহেলা আর গঞ্জনার নির্মমতায় বিমূঢ় বাবা চলে যায় পক্ষাঘাতের আশ্রয়ে। ভ্রাতৃবধূদের প্রতিযোগিতা তুঙ্গে ওঠে আত্মশ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার কদর্য পথে। তার গলায় ভ্রাতৃবধূদের নিজ নিজ অনুজের ফাঁস পরানোর জটিলাঙ্কের ফাঁদ থেকে সে পিছলে পিছলে শটকে পড়েছে। আর তাতে চতুর্গুণ হয়েছে প্রতিহিংসার লেলিহান শিখা। ষড়যন্ত্র আর শত্রুতা এত হীনতায় পৌঁছে যে মেহরাজ নিজেকে একেবারে নিঃসঙ্গ, বাস্তুহীন হিসেবে আবিষ্কার করে। নিজের যৎসামান্য জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে সে পথের খোঁজে পা বাড়ায় পথে। কিন্তু একজন পথচলায় অকস্মাৎ ব্যারিকেড দিয়ে দাঁড়াল, তোমার এভাবে ভেসে চলা চলবে না। জ্ঞাতি ভ্রাতৃবধূ গলির মুখে আটকাল তাকে দুই হাত প্রসারিত করে, ওরা চায় তুমি বাড়ি ছেড়ে যাও।

সন্দেহাতীতভাবে ভ্রু কুঁচকে যায় মেহরাজের এই আহ্লাদি আচরণে। সে গভীর চোখে নিরীক্ষণ করে পথরোধকারিণীকে। এই জ্ঞাতি ভাইয়েরা সারা জীবন বাবাকে হেনস্থা করে এসেছে নানা অজুহাতে, মারতে চেয়েছে পেছন থেকে ছুরি, বৈরিতার জাল বিছিয়ে চেয়েছে বিপদগ্রস্ত করতে। আজকের এই পড়ন্ত যৌবনা জ্ঞাতিবধূর কোনটা যে মুখ আর কোনটা প্রতিমুখ মেহরাজের সেলুলয়েডে ধরা পড়ে কি পড়ে না। মানুষের মুখগুলো এত অচেনা, এত ভাষা-বর্ণহীন, এত দুর্বোধ্য! মেহরাজ সজোরে থুথু ছোড়ে, ছি! গভীর মেঘপুঞ্জের আস্তরণ অপসারিত হলে মেহরাজের শরীর থেকে মায়ের হাতের স্পর্শের অনুভূতি হারিয়ে যায়। পার্কের বেঞ্চের চতুর্দিকে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট-বড় গাছগুলোতে মৃদু অন্ধকার গাঢ় হয়ে বসার আয়োজন করছে। পেট্রলের ঝাঁঝালো গন্ধে বাতাসের শ্বাসকষ্ট, গাছেরাও বেমালুম ভুলে যেতে বসেছে আত্মপরিচয়। অবশ্য মনুষ্যজাতি এমন অদ্ভুত প্রাণী তারা গাছের গোড়ায় ইটের ব্যারিকেড দিয়ে গাছের খাদ্যব্যবস্থা করে রেখেছে। বৃক্ষ তোমার মৃত্যুবরণ করা চলবে না। মানবজাতির ইতিহাসে ভণ্ডামির সৃষ্টিকাল কবে? আদমের হাওয়ার হাতে প্রতারিত হওয়া? নাকি অন্য কিছু? মানুষের মজ্জাগত? সহজাত? কিন্তু আমি তো প্রতারণা করতে পারি না, লুকোতে পারি না আমার মুখ-প্রতিমুখে। তুমি আত্মপ্রতারণা করছ, ভেতর থেকে দূরাগত স্বরে কে যেন গাম্ভীর্য নিয়ে বলে, তোমার ভীরুতাই তোমার প্রতিমুখ। বললেই হলো? অদৃশ্যমান কণ্ঠস্বরকে অনুসরণ করে মেহরাজ, আমি কখনোই কাউকে ঠকাইনি, ক্ষতি করিনি, প্রতারণা করিনি। এমনকি কাউকে কখনো দুঃখ দিইনি। তুমি নিজেকে নিজে ঠকাচ্ছ কিভাবে? আর্তনাদ করে মেহরাজের ভেতরের প্রাণ। নিজেকে প্রশ্ন করো—ভরাট কণ্ঠ বুঝি প্রস্থান করল। প্রশ্ন করতে পারো যত ইচ্ছা, উত্তরের নেই গ্যারান্টি। মেনে নাও, মানতে শেখো। আপ্তবাক্যের রাজকোষ সর্বত্র উপুড় করে ঢেলে দেয় জ্ঞানপাপী শতমুখ। নিয়মভাঙার শোডাউন চলে, বাড়ে রক্তের নিষিদ্ধ মিছিল, লোবানের গন্ধে বাতাস পোড়ে কিন্তু নিয়ম কেউই ভাঙে না। সবাই ঢুকে পড়ে গড় গড় করে নিয়মের মসৃণ জাগতিক মেশিনে, সুশীল অবয়বে। ফসিল হয় বন্ধু সামন্তের হাড়গোড়, মজ্জা, মগজ। সমাপ্তিহীন এক নৃশংস দুষ্টচক্র ভয়াল থাবায় পিষ্ট করে জীবন স্পন্দন।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি বালুকণায় মোতায়েন থাকে সুতীক্ষ বল্লম। কালবৈশাখীর ধ্বংসকামী গর্জন বুকে নিয়ে মেহরাজ উজানে চলে। বন্ধু স্বজনদের প্রতিমুখগুলো বিদ্রূপ কাটে, খ্যাক খ্যাক। রোশনাইয়ের রংধনুতে ওরা মেতে ওঠে গৌরবের আতিশয্যে। নদী সাগরে নর্দমায় জঙ্গলে পচে গলে কীটপতঙ্গ আর পশুর আহার হয় বেশুমার জীবন। পেট্রল পোড়ায় নরদেহ সভ্যতার প্রতিহিংসায়। নরবলির এই মচ্ছবে হুমায়ুন আজাদ আর অভিজিৎ রায়ের রক্তধারা চুষে নেয় বুভুক্ষু মাটি। সোল্লাসে পোড়ে মন্দির, গির্জা, বাড়িঘর, নারীর শরীর, ক্ষেতের ফসল, মানবতা। মরুর ঝড়ে টালমাটাল পলিপ্রান্তরে মেহরাজ যেন দিকশূন্য পাখি, বুনো মোষ। উদ্যত শিংয়ে যেন বিঁধে ফেলবে এই উদ্ভ্রান্ত সময়। বৈশাখ ফুটন্ত খরদুপুর তাকে তাড়িয়ে নিয়ে আসে তনিমাদের দারিদ্র্যের কশাঘাতে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ির দরোজায়। দ্বিধাখণ্ডিত আঙুল জংধরা কড়া নাড়ে কী নাড়ে না, তনিমা ঝাঁপিয়ে পড়ে অবরুদ্ধ কান্নায়। উদ্বেলিত যৌবনের লেলিহান রমণেচ্ছায় মেহরাজের জাগৃতি আকুতি করে। ঘোরবিদ্ধ মেহরাজ চরম সন্দিহান। সে তীব্রতার বশীভূত ক্ষিপ্রতায় তনিমার নাকে, মুখে, বুকে, প্রতিমুখ খোঁজে। কঁঁকিয়ে ওঠে কুঁকড়ে যায় তনিমা, তুমি কি পশু হয়ে গেলে? এক ঝটকায় রাস্তায় নেমে এসে মেহরাজ চার পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে সামনের স্রোতে মিশে গেল।


মন্তব্য