kalerkantho


লেখার ইশকুল

সাহিত্য হলো জীবনের অনুসন্ধান—নাদিন গর্দিমার

১১ মে, ২০১৮ ০০:০০



সাহিত্য হলো জীবনের অনুসন্ধান—নাদিন গর্দিমার

নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সময় তাঁকে বলা হয়, ‘আলফ্রেড নোবেলের কথা অনুযায়ী তাঁর বিশাল চমকপ্রদ মহাকাব্যিক লেখার মাধ্যমে মানবতার প্রভূত মঙ্গল নিয়ে এসেছেন।’ দক্ষিণ আফ্রিকার মানবতাবাদী লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী নাদিন গর্দিমার ১৯৯১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। মানুষের নৈতিক অবস্থা এবং জাতিগত বিষয় নিয়ে বেশি লিখেছেন। তাঁর কথাসাহিত্যজুড়ে আছে বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ। তিনি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসেও যোগ দেন। তিনি নেলসন ম্যান্ডেলার সহযোগী এবং পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। ম্যান্ডেলার বিখ্যাত ভাষণ ‘আমি মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত’ সম্পাদনা করে দেন তিনি। ১৯৯০ সালে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ম্যান্ডেলা যাঁদের প্রথমে দেখতে চান তাঁদের অন্যতম নাদিন গর্দিমার।  

গর্ডিমারের শৈশব কেটেছে জোহানেসবার্গের বাইরে খনি শহর ওয়েস্ট ল্যান্ডে। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ কর্মীদের কাজ করতে দেখেন। তখনই বুঝতে থাকেন, তারা তাঁর সমাজের বাইরের মানুষ। মানুষে মানুষে পার্থক্যের বুর্জোয়া সচেতনতা ধরতে পারেন তিনি। এমনকি তাঁর মা-বাবার মধ্যেও এ রকম পার্থক্যের চিত্রটি দেখতে পান : উঁচুতলার মা আর শ্রমজীবী শ্রেণির বাবার মধ্যে শ্রেণি সচেতনতা দেখেন। 

লেখক হিসেবে প্রস্তুতি পর্বে পড়াশোনার ভালো সুযোগ পান এবং কাজে লাগান গর্ডিমার। বড় হতে হতে তিনি উনিশ শতক ও বিশ শতকের বাস্তববাদী কথাসাহিত্য পড়েন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিশেষ পছন্দের লেখকদের কথা বলতে গেলে তলস্তয়, তুর্গেনেভ, দস্তয়েভস্কি প্রমুখের কথা বলতেন। তবে অন্যান্য এলাকার সাহিত্যের প্রতিও তাঁর ভালোলাগা ছিল। পাঠক হিসেবে বইয়ের পাতায় যে জগৎ দেখেছেন, বাস্তবে সে জগৎ দেখার সৌভাগ্য তাঁর বহুবার হয়েছে। মিলিয়ে দেখার চেষ্টাও করেছেন। মাঝেমধ্যে বাস্তবের মধ্যে কল্পনার সেই জগৎ খুঁজেও পেয়েছেন। ১৯৮৩ সালে ‘দ্য প্যারিস রিভিউ’ পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘লন্ডন আমার খুব আপন মনে হয়। ওখানে গিয়ে বুঝতে পারি, লন্ডনের চিত্র আমার কাছে এসেছে বই থেকে। বিশেষ করে ডিকেন্স এবং ভার্জিনিয়া উলফের বই থেকে।’ আগে তিনি মনে করতেন, অরওয়েলের মতো লেখকরা ইংরেজদের জীবন সম্পর্কে তাঁর ভেতর মুগ্ধতা তৈরি করেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাস্তব লন্ডনের সঙ্গে তেমন মিল পাননি। তাঁদের মধ্যে গভীর স্থান-বোধ নেই, মনে করেন গর্ডিমার। তিনি মনে করেন, ‘ডিকেন্স ও উলফের মধ্যে এই বোধ স্পষ্ট ছিল। কাজেই আমি যখন চেলসিতে ঘুরে বেড়িয়েছি আমার মনে হয়েছে, সত্যিই এটা মিসেস ড্যালওয়ের দেশ।’ একবার ভিক্টোরিয়া স্টেশনের কাছে একটা হোটেলে তিনি ছিলেন। রাতেরবেলা মনে হয়েছিল, আশপাশের সব ভবন যেন ডিকেন্সের বইয়ের জগতের।

নাদিন গর্দিমার লেখার ক্ষেত্রে আপসহীন। তাঁর লেখা নিয়ে কে কী মনে করবে তা ভাবেননি। শ্বেতাঙ্গ সরকার তাঁর বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কৃষ্ণাঙ্গ চরমপন্থীরা প্রতিবাদ তুলেছে : তিনি শ্বেতাঙ্গ হয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য বিশ্বাসযোগ্য লেখা লিখতে পারেন না। কিন্তু গর্ডিমার শেতাঙ্গ কিংবা কৃষ্ণাঙ্গ কারো একক চিত্রকল্প নিয়ে ভাবেননি। তিনি চেষ্টা করেছেন সত্য তুলে ধরার, চেষ্টা করেছেন জটিলতার প্রকাশ ঘটানোর। তাঁর এই সত্য বর্ণবাদকে ঘৃণা করে। 

দীর্ঘ লেখক জীবনের পরিক্রমায় তিনি আবেগকে নিরপেক্ষতাদানের চেষ্টা করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক হিসেবে তাঁর জগতের চারপাশেই নানা রকম আবেগের চিত্র দেখেছেন। তবে আবেগকে লেখার আঙ্গিকে তুলে আনার মতো পরিশোধনও করেছেন। তাঁর লেখার আরেকটি দিক হলো, তিনি বিষয়ের প্রতি যত্নবান থেকেছেন। যেকোনো লেখকই মানব অবস্থার কথাই বলেন; তবে তাঁর জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার জীবন নিয়ে লেখার ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্কতার দরকার ছিল; তিনি সেটা অবলম্বন করেছেনও।

দুলাল আল মনসুর


মন্তব্য