kalerkantho


ম্যারাডোনা থেকে মেসি

বিশ্বকাপ ফুটবলের নানা প্রসঙ্গ

অদিতি ফাল্গুনী   

৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বিশ্বকাপ ফুটবলের নানা প্রসঙ্গ

অঙ্কন : বিপ্লব

সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ—

হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত পানে চাহো।

বাঙালির চির অমর সংগীতের ঈশ্বর রবীন্দ্রনাথ সব খর্বতার বিনাশ চেয়েছেন তাঁর গানে। ধরে নিচ্ছি, এই ‘খর্বতা’ প্রতীকী। চরিত্র বা স্বভাবের খর্বতা, আমাদের যাবতীয় তুচ্ছতা, সংকীর্ণতার প্রতীক। ভাষার রাজনীতি তবু থেকেই যায়, যা শ্রেণি রাজনীতিরই প্রতিফলন মাত্র। দোষ রবীন্দ্রনাথের নয়। তাঁর জীবদ্দশায় আজকের মতো ‘রাজনৈতিক সঠিকতা’ বা ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেসে’র চশমা এত তীক্ষ হয়নি। তবু তো রবীন্দ্রনাথ ‘কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখে’র কথা বলেছেন। ‘আফ্রিকা’ কবিতায় সেই ‘মানুষ ধরার দলে’র কথা বলেছেন, ‘নখ যাদের তীক্ষ’ ছিল আফ্রিকার ‘নেকড়ের চেয়ে’ও। ভাষার রাজনীতি তবু সহজে মোছার নয়। কালো রং আজও যাবতীয় অশুভতার প্রতীক। ‘খর্বতা’ মানেই নেতিবাচক কিছু। জোনাথন সুইফটের বাঁকা পরিহাস এই অধম নিবন্ধকার কিশোরী বয়স থেকে অদ্যাবধি বুঝে উঠতে পারল না। ছয় ইঞ্চি লিলিপুটদের দেশে ‘মানব পর্বত’ গালিভারই দৈত্যাকৃতি ব্রবডিংন্যাগিয়ানদের দেশে গিয়ে নিজেই ‘লিলিপুট’ বনে যায়। বিত্তশালী ও উচ্চ বর্ণের অভিজাত রবীন্দ্রনাথ নিজে ছিলেন ছয় ফুটের ওপর দীর্ঘকায়। দীর্ঘাকৃতি সৌন্দর্য, আভিজাত্য ও বংশগৌরবের প্রতীক। প্রতীক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরও। পাশাপাশি খর্বতা? দারিদ্র্য ও বংশানুক্রমিক অপুষ্টির সঙ্গে তার একটি বড় যোগ থেকেই যায়। তাই পশ্চিমের দীর্ঘদেহি ডাচ্, রুশ, সুইডিশ বা জার্মানের পাশে মাচুপিচু বা আন্দিজ পর্বতমালার পাশের দরিদ্র লাতিন খেলোয়াড়রা বড় ‘খর্বকায়।’ একে তো রেড ইন্ডিয়ান মাতৃসত্তা স্প্যানিশ কনকিস্তাদরের হাতে ধর্ষিতা হতে হতে এই সংকর জাতি, যাদের উচ্চতা, গাত্রবর্ণ মায় চুলের রং বেশ অবাক করার মতো হলেও মাঝেমধ্যে আমাদের দক্ষিণ এশীয়দের সঙ্গে মিলে যায়। তারপর আছে সামরিক শাসন, মার্কিন আধিপত্য, মাদক ও খ্রিস্টধর্ম দিয়ে দরিদ্রকে ভোলানোর শাসক শ্রেণির রাজনীতি আর শত শত বছরের দারিদ্র্য ও অপুষ্টি। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা আর কালো ঝাঁকড়া চুলের ম্যারাডোনা হাসি-খুশিমুখে ১৯৮৬ সালের টিভি পর্দায় আমাদের চোখে অনেকটা যেন খুবই পরিচিত এক ‘পাড়ার বড় ভাইয়ের’ চেহারায় আবির্ভূত হলেন। ছোটখাটো এই মানুষটি যখন দীর্ঘদেহি, ফকফকে সাদা জার্মানদের হারিয়ে হাতে সোনার পরি বিশ্বকাপ তুলে নিলেন, সে যেন এশিয়া-লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি খর্বকায়, মিশ্র বর্ণের আর সামান্য বিত্তসম্পন্ন মানুষদেরই জয়! একইভাবে ইস্পাত কারখানার শ্রমিক পিতা আর পরিচ্ছন্নতাকর্মী মায়ের সন্তান লিওনেল মেসির গ্রোথ হরমোনজনিত রোগে স্বাভাবিক উচ্চতা হওয়ারই কথা ছিল না। তবে নিছকই ক্রীড়া প্রতিভার কারণে বার্সেলোনা ক্লাবের চোখে পড়ে যাওয়ায় ক্লাবই তাঁর ট্রিটমেন্টের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করাসহ তাঁকে নিয়ে আসে আজকের অবস্থানে। প্রতিভা তো ছিলই! তবু একজন ডাচ্, রুশ বা সুইস খেলোয়াড়ের গড় উচ্চতার পাশে কতটাই বা দীর্ঘ তিনি? আকৃতির খর্বতাকে তবু প্রতিভার ক্রোধ পুড়িয়ে দেয়। প্রতিভার আগুনে সেই খর্বতা আকাশ সমান উঁচু হয়ে যায়। যেমন উঁচু হয়েছিলেন ম্যারাডোনা বা বিশ্বকাপে সব ব্যর্থতা নিয়েও লিওনেল মেসি যতটাই ‘দীর্ঘ!’

প্রিয় পাঠক! ভাবছেন, আমি বুঝি আর্জেন্টিনা দলের প্রবল সমর্থক? আদৌ তা নয়। আসলে আমি ভালো খেলার দর্শক ও ভালো খেলা উপভোগ করি। ব্রাজিলের সমর্থক বলেই আমাকে মেসিকে নিয়ে যাচ্ছেতাই কথা বলতে হবে বা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করি বলে নেইমারকে গালি না দিয়ে ভাতই খাব না—এমন নীতিতে আমার প্রত্যয় নেই।

একজন ফুটবল দর্শক হিসেবে ১৯৮২-এর বিশ্বকাপের সময় বিশ্বকাপ ফুটবল বোঝার মতো যথেষ্ট বড় হইনি। ১৯৮৬-এর বিশ্বকাপে ওই ক্লাস ফাইভের টেক্সটবুকে ব্রাজিল ও পেলে সম্পর্কে পড়ার কারণে ব্রাজিলকে সমর্থন করি। ‘সাদা পেলে’ জিকোর পেনাল্টি মিস করার পর ব্রাজিল হারলে ভীষণ কান্নাকাটি করেছিলাম। জিতে গেল ম্যারাডোনা ও তাঁর দল। ১৯৯০-এর বিশ্বকাপে রবার্তো ব্যাজিও আর তাঁর ইতালিকে কে না সমর্থন করছে? তরুণ প্রজন্মের সদ্য উদীয়মান অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত থেকে আমি—সবাই! সহপাঠিনী ও শিল্পকলা নিয়ে পরবর্তী সময়ে খুব ভালো লিখে নাম করবে যে শিকোয়া নাজনীন—শিকোয়া আর আমি কলেজ ড্রেস পরে পরীক্ষা দিতে গিয়ে আলাপ করি যে ব্যাজিও আর তাঁর দলকেই সমর্থন করতে হবে। কেন? কেন আবার? ব্যাজিওর গাঢ় সবুজ চোখেই তো মেয়েরা পাগল! ফুটবল কি আমরা ছাই অত ভালো বুঝতাম নাকি? নীল জার্সিতে সুদর্শন ইতালীয়রা দেবদূতের মতো দেখতে! সঙ্গে আবার রমাপদ চৌধুরীর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা সেই উপন্যাস তখন মাত্র পড়ছি। ওই যে একটি ইতালীয় ছেলে ব্রিটিশের কারাগার থেকে পালিয়ে এক বাঙালি পরিবারে আশ্রয় পায়। সুভাষ বসুর সমর্থক আর কট্টর ব্রিটিশবিরোধী বাঙালি পরিবারটি ইতালিকে বন্ধু মনে করে ছেলেটিকে বাঁচাতে চায়। তাকে ধুতি-পাঞ্জাবি পরিয়ে, কপালে তিলক-চন্দন দিয়ে সাজিয়ে, বাড়ির বাঙালি মেয়েটির সঙ্গে বর-বউ সাজিয়ে পালাতে সাহায্য করার সময় সে ধরা পড়ে আর মারা যায়! মৃত্যুর সময় কি দান্তের একটি লাইন উচ্চারণ করেছিল ছেলেটি? অনেক আগের পড়া। এখন হুবহু মনে নেই। তা ইতালি হারল। রাগে-দুঃখে আমার জীবন অস্থির হয়ে গেল! যে দলই সমর্থন করি, সে দলই হারে। সব বিশ্বকাপেই আমি হারু দলে আছি! কমলা জার্সির রুদ গুলিত যেন শ্যামবর্ণেই কমলা টিউলিপ-জেতেনি তবু ডাচ্ দল। ১৯৯৪-এ জার্মানরা অত লাতিন দলের মতো ‘শিল্পকলায় ধ্রুপদি নৃত্য’ দেখায়নি, তবে ‘গোল দিতে অক্ষমতা’র সূত্র কাটিয়ে নিখুঁত যান্ত্রিক খেলা খেলে কাপ জয় করল। ব্যস, আমি তখন থেকে জার্মানির সমর্থক।

এ বছর আমার একেবারেই খেলা দেখা হচ্ছে না। ফেসবুকে বন্ধুদের স্ট্যাটাস দেখে খেলার খবর পড়া হচ্ছে। তবে অনেক অঘটন ঘটছে জানতে পারছি। সবচেয়ে বড় অঘটনটা আজ ঘটেছে নিঃসন্দেহে।    

‘খুদে, পীতাভ’ মানব কোরিয়া হারিয়ে দিল আর্য রক্তের অহম ভরা জার্মানিকে? যত ছোট দেশ জয়ী হচ্ছে, তত নিশ্চিত হচ্ছি, যে রাষ্ট্রের নাগরিকরা যত ভালো খেতে-পরতে পাবে, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য যত বেশি হবে, তত তারা খেলাধুলাসহ জীবনের সব ক্ষেত্রেই বিকশিত হবে। প্রতিভা বা সামর্থ্য সব মানুষের সমান। যেকোনো অসমতাই মূলত বঞ্চনা থেকে—‘Discrepancies of the Centuries’ থেকে উদ্ভূত। সত্যি কথা হলো, কোরিয়া তো আজ আর ‘খুদে’ মানবের দেশ নেই। চীনা বা জাপানিদের গড় উচ্চতা আজ যথেষ্টই ভালো। ভাবা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির ব্লকের এশীয় শক্তিধর যে জাপান কোরীয় নারীদের ধর্ষণ করেছিল, সেই ‘অক্ষম’ কোরিয়া আজ খোদ জার্মানিকে হারায়? অর্থনীতি! তোমার অর্থনীতি আছে— নাগরিকদের ভাত-কাপড় আর খেলার মাঠ আছে তো সব আছে। নেই তো কিছুই নেই!

দুঃখিত! ফুটবলের কথা বলতে গিয়ে স্বভাবদোষেই আলোচনা নানা দিকে ডাল-পালা মেলল। এবারের বিশ্বকাপে ঘোষিত বড় দলগুলোকে হারিয়ে দিয়ে উঠে আসছে অসংখ্য ‘ডার্ক হর্স’ বা ছোট দল। জার্মানি আর কোরিয়ার খেলায় দীর্ঘদেহী ও অভিজ্ঞ জার্মানরা হেরে গেছে স্রেফ বয়সে নবীনতর কোরীয়দের গতি আর দমের কাছে। একের পর এক ঘটছে নানা অঘটন। রাশিয়ার কাছে স্পেনের পরাজয় যেমন! আর হ্যাঁ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন আধিপত্যের যে একমুখী বিশ্বব্যবস্থা আবারও চালু হয়েছিল, আপনি ভালো বলুন আর মন্দ বলুন, তাঁকে একনায়ক বলুন আর যা-ই বলুন—লৌহমানব পুতিন ফিরিয়ে আনছেন রাশিয়ার হৃত গৌরব। ইতিহাসে রাশিয়া একমাত্র দেশ, যে তার কোটি কোটি পুত্রের মৃত্যুর বদলেও কখনো কোনো যুদ্ধে হারেনি। ভৌগোলিকভাবেই শীতার্ত এই বিপুল, বিশাল জনপদের মানুষ স্রেফ শীত থেকে জীবন বাঁচাতেই ভদকাশ্রয়ী হলেও জাতির যেকোনো যুদ্ধে তার বীর চারিত্র্য সর্বত্যাগের বদলেও জয়ী হতে চায়—যার কাছে হেরে যায় নেপোলিয়নের ফ্রান্স বা হিটলারের জার্মানি। রাশিয়া এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সাফল্য ছিনিয়ে নিলেও তাই অবাক হব না।

 



মন্তব্য