kalerkantho


সাহিত্যিকদের ফুটবল

বোর্হেস বনাম মার্কেস

দুলাল আল মনসুর   

৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বোর্হেস বনাম মার্কেস

ফুটবল বিশ্বকাপ ২০১৮-এর চূড়ান্ত ম্যাচটি আসন্নপ্রায়। সারা বিশ্বে দর্শকদের মধ্যে চলছে উন্মাদনা। সাধারণ দর্শকদের মুখ থেকেও বের হচ্ছে বিশেষজ্ঞের দৃঢ়তা। বিশেষ বিশেষ দলের প্রতিযোগীদের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে তাদের সমর্থকদের প্রতিযোগিতা। পুরনো এই খেলার রয়েছে জীবনের সবখানে প্রভাব ফেলার ইতিহাস। অন্যান্য অঙ্গনের মতো সাহিত্যেও রয়েছে ফুটবলের সরব উপস্থিতি। কোনো কোনো লেখক নিজের লেখার মধ্যে ফুটবল নিয়ে এসেছেন। কেউ কেউ ফুটবল সম্পর্কে নিজের পছন্দ-অপছন্দের মন্তব্যটিও প্রকাশ করেছেন। ফুটবলের প্রচারের পক্ষে কাজ করেছেন কেউ কেউ। কারো রয়েছে ফুটবলের প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণাও। এ প্রসঙ্গে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেন আর্জেন্টিনার কালজয়ী কথাসাহিত্যিক হোর্হে লুই বোর্হেস এবং কলম্বিয়ার নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস।

পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সাহিত্যে খেলাধুলার জায়গা বেশ সমীহের পর্যায়ে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, উইলা ক্যাথার, আলবেয়ার কামু, জাঁ পল সার্ত্রে, স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, মারিও বার্গাস য়োসা, নরমান মেইলার, ডন ডেলিলো, টম স্টপার্ড, জয়েস ক্যারল ওটস, ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস, সালমান রুশদি, জুলিয়ান বার্নস—সবাই তাঁদের সাহিত্যে খেলার প্রসঙ্গ এনেছেন কিংবা খেলা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। খেলার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দর্শকদের উপস্থিতি, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা এবং তাঁদের ব্যক্তিত্বের অতিরঞ্জিত অবস্থা—এসব বিষয় খেলাধুলার সাধারণ বৈশিষ্ট্য। লেখকরা এগুলোকেই পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করে মানব মনের গভীরে দৃষ্টি ফেলে সাহিত্য সৃষ্টি করেন। আর স্বাভাবিকভাবেই সে সাহিত্য খেলাধুলার পর্যায় থেকে উতরে সাহিত্যের নিজস্ব মহিমায় পৌঁছে যায়।

ফুটবল সম্পর্কে তাঁদের নানাজনের রয়েছে নানা রকম দৃষ্টিভঙ্গি। প্রথমে বলা যায় স্যার ওয়াল্টার স্কটের কথা। তিনি জীবনের তুলনা করেছেন ফুটবলের সঙ্গে। বলেছেন, ‘জীবনটাই একটা ফুটবল খেলা।’ আলবেয়ার কামু বলেন, ‘নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কে আমি যা কিছু জেনেছি, তার জন্য আমি ফুটবলের কাছে ঋণী।’ আর জ্যাক দেরিদা বলেন, ‘আমি পেশাদার ফুটবলার হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে ফুটবল ছেড়েই দিতে হয়েছে। কারণ আমি ভালো খেলতে পারতাম না।’ ভ্লাদিমির নবোকভ বলেন, ‘গোলরক্ষক হলেন একাকী ইগল, রহস্যময় মানুষ, সর্বশেষ প্রতিরক্ষাকারী।’ জর্জ অরওয়েল তাঁর মন্তব্যে বলেন, ‘ফুটবল খেলায় সবাই আঘাত পায় এবং প্রত্যেক জাতিই নিজস্ব শৈলীতে খেলে থাকে। তবে সে শৈলী অন্যদের কাছে অন্যায় মনে হয়।’ অন্যদিকে জাঁ পল সার্ত্রে বলেন, ‘ফুটবল খেলায় অন্য দলের উপস্থিতির কারণে সব কিছু জটিল হয়ে যায়।’ ফুটবল সম্পর্কে অস্কার ওয়াইল্ড চমকপ্রদ একটি মন্তব্য করেন, ‘রাগবি হলো অসভ্য লোকদের খেলা; কিন্তু খেলে থাকেন ভদ্রলোকরা। আর ফুটবল হলো ভদ্রলোকদের খেলা; কিন্তু খেলে থাকেন অসভ্য লোকরা।’

ফুটবল প্রসঙ্গে অন্যদের নামের সঙ্গে আরো জোরালোভাবে উচ্চারিত হয় বোর্হেস ও মার্কেসের নাম। মার্কেস স্কুলে পড়ার সময় খেলাধুলার প্রতি খুব আগ্রহী ছিলেন না। ক্লাসের ফাঁকে বিরতিতেও বসে বসে বই পড়তেন। তবে ধীরে ধীরে বন্ধুদের সঙ্গে তিনি ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট হন।     

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত যেতে যেতে তাঁর মধ্যে ফুটবলের প্রতি প্রবল টান জন্মে যায়। ইউনিভার্সিটি অব কার্তাজেনায় আইন পড়ার সময় মার্কেস নিয়মিত পড়াশোনার প্রতি ছিলেন প্রচণ্ড উদাসীন। প্রসঙ্গ উঠলেই আইন বিষয়ের প্রতি তাঁর ঘৃণা প্রকাশ করতেন। তবে ইউনিভার্সিটির বড় করিডরগুলোতে যখন-তখন ফুটবল খেলার আয়োজন করে ফেলতেন।

বার্সেলোনার মুন্ডো দেপোরতিবো নামের স্পোর্টস পত্রিকার সাংবাদিক হোর্হে ওমার পেরেজ ২০০৬ সালে উল্লেখ করেন, সাহিত্যের অন্যান্য অর্জন ছাড়া শুধু খেলাধুলা সম্পর্কে লেখালেখি করার জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতো যোগ্যতা রাখেন এমন লেখকও আছেন। পেরেজ তাঁদের ২০ জনের একটি তালিকা তৈরি করেন। সে তালিকায় মার্কেসও ছিলেন। অন্যদের মধ্যে এমবার্তো একো, মিগুয়েল হার্নান্দেজ, ভ্লাদিমির নবোকভ, কেনজাবুরো ওয়ে, গুন্টার গ্রাস, গ্যালিয়ানো ও য়োসা অন্যতম।

মার্কেস সাহিত্য ও ফুটবলের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ তৈরি করেছেন। বারাংকুইলা মিউনিসিপ্যাল স্টেডিয়ামে স্থানীয় আতলেতিকো জুনিয়র দলের সঙ্গে মিলিওনারিওস এফসি দলের আকস্মিক ফুটবল ম্যাচের আয়োজনে অংশগ্রহণ করার সময় তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার স্মৃতির কথা তুলে ধরেন তাঁর ছোটগল্প ‘দ্য শর্ন ইন’-এ। সেদিন আতলেতিকো জুনিয়র দলের হয়ে খেলায় অংশ নিয়েছিলেন পরবর্তীকালের ব্রাজিলের ফুটবল কিংবদন্তি হেলেনো দে ফ্রেইতাস। অন্যদিকে মিলিয়নারিওস দলের রোস্টারে নাম ছিল দ্য স্টেফানোর। সেদিনের ২২ জন খেলোয়াড়ের নৈপুণ্য দেখে মোহিত হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা সুন্দর ছন্দময় গদ্যে তুলে ধরেন মার্কেস। ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় তিনি যে অনুভূতির অভিজ্ঞতা লাভ করেন, এ কারণে তাঁর সহজাত পরিহাসের বিষয়টিই ভুলে যান তিনি। জুনিয়র দলের একজন সমর্থক বনে যান তিনি।

মার্কেস ফুটবলকে কাব্যিক এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। এ জন্য তাঁর কাছে ফুটবলের ঋণ অপরিসীম। ২০১৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর বলা হয়, সারা বিশ্বে সাহিত্যের পাঠকদের মধ্যে শোকাবহ আবেগ তৈরি করেছে তাঁর মৃত্যু। আর যাঁরা ফুটবলের ভাষায় কথা বলেন এবং সাহিত্যের খেলা খেলেন, তাঁদের মধ্যে শুধু শোক-দুঃখ নয়, অন্য রকম প্রতিক্রিয়াও তৈরি করেছে। আরো বলা হয়, তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিশ্ব একজন খাঁটি ও পরিপক্ব ফুটবল সমর্থককে হারাল। মার্কেস তাঁর ব্যাপক ও কালজয়ী সাহিত্যের মাধ্যমে অমর হয়ে থাকবেন। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম—যাঁরা ফুটবলের মতো খেলা নিয়ে কলম চালিয়ে যাবেন, তাঁরাও তাঁকে উষ্ণ হৃদয়ে সম্মানের আসনে বসিয়ে রাখবেন। কারণ ফুটবলের মতো ঐতিহ্যের সঙ্গে সাহিত্যের মেলবন্ধন তৈরি করেছেন তিনি।

তবে ফুটবল সম্পর্কে ঠিক তাঁর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেন আর্জেন্টাইন কথাসাহিত্যিক হোর্হে লুই বোর্হেস। ফুটবল সম্পর্কে বোর্হেস বলেন, ‘আহাম্মকি জনপ্রিয় বলেই ফুটবলও জনপ্রিয়।’ তিনি ফুটবলকে ‘নন্দনতাত্ত্বিক দিক থেকে কুিসত’ মনে করেন। তিনি আরো বলেন, ‘ইংল্যান্ডের বড় বড় অপকর্মের অন্যতম হলো ফুটবল।’ বোর্হেস ফুটবল নিয়ে এতটাই বিরক্ত ছিলেন যে ১৯৭৮ সালে বিশ্বকাপ চলাকালে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের দিনই তিনি ইচ্ছা করে তাঁর একটি বক্তব্যের তারিখ নির্ধারণ করেন। অবশ্য ফুটবলের প্রতি বোর্হেসের বিতৃষ্ণার কারণ শুধু নন্দনতত্ত্বে নয়, তার চেয়েও গুরুতর একটি বিষয়ে। বিশ শতকের কিছু ভয়াবহ রাজনৈতিক আন্দোলনের পেছনে নেতাদের উসকে দেওয়া অন্ধ সমর্থকদের চিত্রগুলো তাঁর কাছে অসহ্য মনে হয়েছে। তিনি নেতাদের অন্ধ সমর্থকদের চিত্রই দেখতে পান ফুটবলের গোঁড়া সমর্থকদের মধ্যে। আর্জেন্টিনার রাজনীতিতে তিনি ফ্যাসিবাদ, পেরোনিজম এমনকি অ্যান্টিসেমিটিজমও দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থা সম্পর্কে একটা ধারণা প্রচলিত আছে; সেটিই আমার কাছে ভয়াবহ মনে হয়।’

বোর্হেসের মতে, প্রায় সব মানুষ বিশাল কোনো বিশ্বজনীন পরিকল্পনার অংশ হওয়ার তাড়না বোধ করে। তাদের কারো কারো এ রকম তাড়নার প্রতি দৃষ্টি রেখে কাজ করে থাকে ধর্ম। বাকিদের জন্য কাজ করে ফুটবলের মতো বিষয়। মানুষ বিশাল পরিকল্পনার অংশ হওয়ার তাড়নায় এতটাই মগ্ন থাকে, তারা আর চোখ খুলে দেখেও না, ওই বিশাল পরিকল্পনার মধ্যে ত্রুটি পয়দা হয়ে গেছে। কিংবা বুঝতেই পারে না, ত্রুটি সেখানে আগে থেকেই ছিল, শুধু অপ্রকাশিত অবস্থায় ছিল। বোর্হেসের ‘দ্য কংগ্রেস’-এর কথক যেমন মনে করিয়ে দেয়, বৃহৎ আখ্যানের লোভ মানুষের জন্য অতিশয় অতিরঞ্জন হয়ে যায়। তাঁর মতামতটাই যথাযথভাবে প্রযোজ্য কোটি কোটি ফুটবল দর্শকের জন্য।

বোর্হেসের ফুটবলবিরোধী যুক্তি অনেকটাই অকাট্য। তবে তাঁর দলের সমর্থকরা প্রায় প্রচারবিমুখ। আমজনতার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন যাঁরা, তাঁরা মার্কেসের দলের মানুষ। সংখ্যায় তাঁরাই বৃহৎ। ফুটবলকে সাহিত্যের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চেষ্টা করেন তাঁরাই।

 



মন্তব্য