kalerkantho


আরমানের জাবজ্জীবন

নাসিমা আনিস   

৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



আরমানের জাবজ্জীবন

অঙ্কন : পুজা দাশগুপ্ত

জিকে লেকের পাড়ে বসে আছি একা। একা বসে থাকতে অনেকের ভালো লাগে; কিন্তু আমার ভালো লাগে না। আজ এই একাই ভালো। ভালো এই অর্থে যে আজ কারো সঙ্গ আমার অসহ্য। একা বসে আছি আসরের আজানের পর থেকে। এখন সন্ধ্যা শেষ হয়েছে, ইচ্ছা করলে কাছাকাছি মসজিদে গিয়ে মাগরিবের নামাজটা শেষ করে আরমানের জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে তাঁর রুহের জন্য দোয়া করতে পারি। কিন্তু আমার উঠতে ইচ্ছা করছে না; কারণ আমি এখন কোনো মানুষ দেখতে চাই না, ছায়াও না।

লেকের পানি এখন কালো। এটা লেক নয়, এটা কাটা খাল, আইয়ুব খানের কাটা খাল, জিকে প্রজেক্ট, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সংযোগ খাল। গঙ্গা আসলে এ অঞ্চলে পদ্মা। আচ্ছা, এটি পিকে প্রজেক্ট না হয়ে জিকে প্রজেক্ট নামকরণ হলো কেন? গঙ্গার পানির হিসসা নিয়ে মাথাব্যথা ছিল বুঝি!

জানা যাবে না সহজে। ইতিহাসবিদ ইমরুল খান বেঁচে থাকলে কলেজে গিয়ে কালই জিজ্ঞেস করতাম তৎকালে আইয়ুব খানের মনোভাব। তিনি তো আরো পনেরো বছর আগেই মোটরসাইকেল অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন, না একটা সাইকেল আরোহীকে বাঁচাতে গিয়ে দুই মোটরসাইকেল আরোহীর প্রাণনাশ। সে যাক, ইমরুল অবশ্য এখানে মারা যাননি, মারা যাওয়ার আগের বছর নিজ এলাকায় কলেজে জয়েন করেছিলেন। এলাকার কলেজটা সরকারি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, আবার বৃদ্ধ মা-বাবাকেও একটু সেবা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

বসে আছি ঝিম মেরে। মাথা ফরসা, কাজ করছে না। এটাকে বাংলায় বলে স্থাণু অবস্থা। বাঁয়ে বসন্ত বাতাসে কাশগাছ নড়ছে। পায়ের কাছে একটি হিজলে কুঁড়ি বের হয়ে লটপট করছে, অন্ধকারে তাকে ভূতের মতোই দেখাচ্ছে। পশ্চিমে সূর্যের ল্যাতকানো কুসুম ঢেকে যাচ্ছে ছাইয়ে।

হঠাৎ সাদেক খন্দকার যেন পাশে এসে বসে। বলে—স্যার, কেমন আছেন? সাদেক আমাদের কলেজের দীর্ঘদিনের অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিল। খুব সুন্দর ছিল তার হাতের লেখা। দ্রুত লিখত নির্ভুল ও সুন্দর। তিনটি বিয়ে করেছিল, অনেক ছেলে-মেয়ে। শেষ বউটা বিহারি ছিল, দয়া করে নাকি বিয়ে করা, একটি পা খোঁড়াও। বাহাত্তরে দেশ স্বাধীনের পর এই অঞ্চলে বিহারিদের কেটে কুচি কুচি করার পর বউ-বাচ্চা কিছু বেঁচে গিয়েছিল, তার স্ত্রী তাদেরই একজন। দ্বিতীয় স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সে তৃতীয় স্ত্রী গ্রহণ করায় আমরা তার ওপর খুব বিরক্ত ছিলাম, তার ওপর বিহারি! প্রসঙ্গ উঠলে পান খাওয়া দাঁত বের করে বলত—স্যার, পা একটা খাটো, কিন্তু চোখ ফেরানো যায় না এত, সুন্দর! বিয়ে হচ্ছিল না, স্যার! সে যাক, এখন সাদেক পাশে বসে আছে, যেন বড় খাতা বের করে বলছে—নেন, স্যার; সই করেন, শবেবরাত উপলক্ষে পাঁচ শ টাকা। অন্তত দুই বছর আগের কোনো এক জানুয়ারি মাসের বেতনের কলেজ অংশটুকুর অংশ। আমি বলছি, হালুয়া-রুটি তো হুজুররা খাইতে নিষেধ করতেছে, সাদেক ভাই। সাদেক হাসে—স্যার, গরিব মানুষ; একটু উপলক্ষ হলে ভালোমন্দ খাই, এটা বন্ধ করবেন না, প্লিজ! পাঁচটা এক শ টাকার নোট হাতে দিতে দিতে বলে—স্যার, অসুবিধা না হলে আমাকে এক শ টাকা ধার দেন। বেনিফিট-আসলে দিয়ে দেব। আমি জানি, সাদেক এটা আর কোনো দিন দেবে না। না দিক, আমার তো প্রাইভেট আছে, ওর আছে দুইটা বউ!

এখানেই কোথায় বাঁধের ধারে ঘর করে থাকত, ঘরভাড়া লাগত না। ও খুব খেতে ভালোবাসত। ছেলে-মেয়ে একটাও মানুষ হয়নি। প্রথম ঘরের একটাই ছেলে, আগে ব্ল্যাক করত ইন্ডিয়ার জিনিস, ক্রসফায়ারে মারা গেছে। চাকরি শেষ হওয়ার ছয় মাস পরই সাদেক মারা গেল বিনা নোটিশে।

সাদেক হিজলগাছের গুঁড়ির দিকে নামতে নামতে বলে—স্যার, আরমান স্যার এলেন আজ। আপনারও সময় হয়ে এলো, আসছেন তো, স্যার?

কলেজ তো আমাকে ছাড়ে নাই, অনার্সে পড়াই। টাকাকড়ি যা দেয়, একা মানুষ, চলে যায়। কিন্তু আরমান স্যারকে রিটায়ারের পর আর রাখার সুযোগ ছিল না। এর পরপরই অসুস্থও হয়ে গেলেন..., আমার একটু দেরিই হচ্ছে। কাজে থাকলে আজরাইল বিরক্ত হয় তো, কাছে আসে না।

স্যার, কলেজটা সরকারি হলো না!

সাদেক খন্দকার নেমে গেলে হিজলের তলা থেকে উঠে এলেন নিনা হামিদ। না, তিনি সংগীতশিল্পী নন, আমার বিভাগেরই শিক্ষক। একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়ালেন, আগের মতো গিয়াস ভাই বলে আহ্লাদিত হলেন না। বললেন, কলেজের পেছনে হিসনা নদীর গা ঘেঁষে যে সফেদাগাছটা ছিল, সেটা কি আছে? আর আমাদের তৈরি বাগানটা?

মহিলারা আসলে খুব সৃষ্টিশীল, তিনি রীতিমতো কৃষিবিদ ছিলেন। অনেক দিন আগের স্মৃতি মনে করায় একটু অন্য রকম ফ্লেভার পেলাম সন্ধ্যারাতে; কিন্তু অল্প সময়ের জন্য। ঝট করে বলে উঠলেন, আরমান ভাইকে এভাবে যেতে দিলেন? আপনার তো কোনো ঝামেলা ছিল না। ভাবি বেঁচে নেই, আপনার ছেলে-মেয়েরা সংসার করছে সুন্দর, আরমান ভাইকে একটু দেখে রাখতে পারলেন না! আপনারা তো সব সময় একসঙ্গে থাকতেন। এত বড় একটা ঘটনা ঘটাতে যাচ্ছেন তিনি, আপনি কিছুই বুঝলেন না! টের পেলেন না!

নিনা ম্যাডাম, আপনি যে চলে যাবেন সেটা কি মতলুব ভাই বুঝতে পেরেছিলেন? তবে আমার স্ত্রী যে যাবেন সেটা আমি জানতাম, দৃশ্যটা আমার কাছে আঁকা ছিল, ড্রয়িংমাফিক সব হয়েছে। অপারেশন করলে বাঁচবে না, তো সোহরাওয়ার্দী নিয়েও গিয়েছিলাম। নার্স ছিল একজন পরিচিত; বলল, পারলে পাশের দেশে নিয়ে যান। আমি আকুল হয়ে সুধাই, একজনও বাঁচেনি! এখানে এই পেশেন্ট একজনও বাঁচে না, পরিসংখ্যান তো জানি না, আমার দেখা কেউ বাঁচেনি।

তো, আমার টাকা অত নেই যে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাতে পারি। মাসুদ সাহেবের ছেলের জন্য আমরা যেমন চাঁদা তুলে ভেলর পাঠিয়ে সারিয়ে এনেছিলাম, পরে সে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে মা-বাপের জীবন ধন্য করেছে। আমার স্ত্রীর বেলায় কেউ এগিয়ে এলো না। মেয়েমানুষ, কী-ই বা তার ভবিষ্যৎ, কে-ই বা এগিয়ে আসে! আরমান একমাত্র যে উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যে নাই, সে সময় ভাবির একটা মিস ক্যারেজ হয়ে গেল। পরে আমিই নিরস্ত করেছি। শেষ মুহূর্তে কিন্তু ঢাকায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করালাম; কারণ হাসপাতাল তার অধিকার। আমি তার কষ্ট আর দেখতেও পারছিলাম না, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। সে নিশ্চয়ই এখন ভালো আছে।

আরমান ভাইয়ের কথা বলেন।

কী বলব? মাঝরাতে ভাবির মোবাইল—একটু আসেন, ভাই। যাওয়ার সময় বসন্তের মোলায়েম একটা বাতাস লাগছিল আমার সারা গায়ে, আমি মুন্নির গায়ের ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম, আখের ঘ্রাণ। তখনই আমি বুঝতে পারছিলাম, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে! পাশে বসে দোয়া-দরুদ পড়লাম, সকাল পর্যন্ত। আমি বুঝতে পারছিলাম চলে যাচ্ছেন...পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম। হাত ধরে বসে ছিলাম, মুঠির ভেতরে শেষ কম্পনটা অনুভব করেছিলাম। উনি আমাকে বিদায় সম্ভাষণ করেছেন, কিন্তু বলতে পারছিলাম না ভাবিকে। ত্রিশ বছরের সহকর্মী, বন্ধু; সুখ-দুখের ভাগীদার। তাঁর এমন কিছু জানতাম, তিনি আমার সব জানতেন! সকাল এগারোটায়!

হুজুর বললেন—নেই, ডাক্তার সেনকে খবর দিলাম...এইতো।

সলতে পাকানো হয়নি! এমনি এমনি প্রদীপ জ্বলে, গেল কি নিভে গেল!

সেসব থাক, মানুষের জীবন খুব বিচিত্র, জটিল। এই দেশে তো আরো, কোনো সুস্থ মানুষ এখানে মানুষ হিসেবে বাঁচবে না। সে বোকা, গাধা, স্টুপিড কিংবা চোর-বাটপার, মিথ্যাবাদী হিসেবে সমাজে পরিচিত হবে। হতে বাধ্য। আমার-আপনার অনেক উপকার উনি করেছেন, অথচ আড়ালে লোকটাকে বলা হতো বোকা মানুষ, স্টুপিড! নিজের খেয়ে উনি বনের মোষ চরান, মানুষের জন্য কাজ করেছেন, লাভের আশা কখনো করেননি। একবার জয়পুরহাট থেকে প্রবল শীতের রাতে ফিরে এলাম। একদল লোক তাঁর বাড়িতে আশ্রয় পেল, ভাবি নিশ্চিত বিরক্ত হয়েছেন, তিনি ভর্ত্সনার শিকার হয়েছেন। কিন্তু আরমান তো এমনই!

হ্যাঁ, তিনি এমনই। জয়পুরহাটের সেই দলে আমিও ছিলাম। ভাবি সেই রাতে রান্না করে খাইয়েছেন। আমি ভাবতে পারছি না, তিনি নেই। তিনি ছাড়া কী করে সংসার, প্রতিবেশী, কলিগ, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের চলে!

বসন্ত বাতাস!

নিনা হামিদ চলে গেলেন হিজলের তলা দিয়ে। খালের পানিতে বাতাস কালো ছায়া ফেলছে।

আমি গিয়াসউদ্দিন, বাড়ি রাজবাড়ী, মানুষ সহ্য হচ্ছে না বলেছিলাম শুরুতে; কিন্তু মানুষ ছাড়া কি এক মুহূর্তও আছি! আরমান সাহেব তো এলেন না! এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, শুধু বেঁচে থাকার জন্য আমার এখন বেঁচে থাকা। কোনো অর্থই নেই বেঁচে থাকার। দুই মেয়ে এক ছেলে মানুষ করে দিয়েছি, করে-কম্মে খাচ্ছে। আমি গ্রামে ফিরে যেতে পারি; কিন্তু সেখানে ভালো লাগে না। সামান্য কিছু বাল্যস্মৃতি ছাড়া হাতড়ে বেড়ানোর আর কিছু নেই। আর এখানে, এই স্মৃতিপুর? কী নেই—বন্ধু, স্ত্রী, সন্তান, কলিগ, আমার যৌবন, কর্ম, হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী, কামনা-বাসনা—সব এই ছোট্ট অথচ প্রাণবন্ত শহরজুড়ে রাত-দিন খেলা করে। পুকুরপাড়ে আরমানের সঙ্গে গল্প করে রাতের প্রথম প্রহর পার করেছি যুগের পর যুগ। চারিত্রিক দিক থেকে আমরা খুব বিপরীত মেরুর ছিলাম। আমি কবিতা লিখতাম, তিনি কবিতা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না; কিন্তু জীবনকে কবিতার মতো কিছু একটা ভাবতেন। সব সুন্দরভাবে হতে হবে, সবার। আর ভোরের হাওয়ায় বিলসুকা গ্রাম, অমরবাবুর কবিতার আসর, উচ্চারণ লিটলম্যাগ, প্রভাতফেরি কিংবা পহেলা বৈশাখ, ঝড়ের কবলে পশুর হাট থেকে ছাগল কিনে ফিরতে ফিরতে কাকভেজা—সব, সব সময়ের সঙ্গী আরমান। কবিতার আসরে যান আমি যাই বলে; উচ্চারণে শুভ কামনা জানিয়ে বাণী দেন আমি তাতে কবিতা লিখি বলে।

মাঝে মাঝে তাঁর সংসারে ভয়াবহ ঝড় উঠত, আমি আরমানকেই বোঝাতাম, কখনো ভাবিকে বোঝাতে যাইনি। বলেছি—মেয়েরা এমনই, ছোটখাটো অপরাধ ঢাকতে তারা বড় বড় প্রতিরোধ তৈরি করে। কারণ একটাই, নিজেদের সব সময় সহায়হীন ভাবার ব্যারাম। তিনি ছোটবেলায় ঢাকায় ছিলেন, একটা ভালো কিংবা উদার কালচারের মধ্যে বড় হয়েছেন। হোটেলে কি পার্লারে তিনি কাজ করতেই পারেন, আপনি কে তাঁকে ভর্ত্সনা করার! আরমানের একটা ব্যাপার ছিল, খুব সহজ করে তিনি ভাবতে পারতেন, আমি পারতাম না। আমার একটু সন্দেহবাতিক ছিল, সোজা করে কিছু যেন হতেই পারে না। আমি সব কিছুতে গোপন একটা অভিসন্ধি খুঁজে পেতাম আর তাঁকে বলতাম, ব্যাপারটা এমন নয়, দেখেন! আর আরমান কিছুদিন বিস্ময়াভিভূত হয়ে বলতেন, কী করে টের পেলেন গিয়াস ভাই, আশ্চর্য! সব কিছুর সহজ সমাধান ছিল তাঁর কাছে। বললাম, আপনার ভাবি তো কয় দিন ধরে বিরক্ত, কোথাও বেড়াতে যেতে চায়। অমনি আরমান বলে বসবেন—চিন্তা নেই, কাল হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে ঘুরে আসি, চলেন; নিলুফারকেও বলি। কিংবা বললাম, টাকা নাই; অথচ বাড়ি যেতে হবে। উনি বললেন, কত লাগবে, কাল নিয়ে আসব। ধার নিলে শোধ করার কথা বলতেন না।

আরমান মানুষকে খুব ভালোবাসতেন আর মাঝেমধ্যে কারো ভালোবাসা না পেয়ে খানিক ব্যথিত হয়ে উঠতেন। ভালোবাসা মানে শুধুই ভালোবাসা, নাথিং এলস। কোনো গরিব ছাত্রকে একা সাহায্য করতে না পারলে লজ্জায় আমাকে বলতেন। আমি খুব সাহায্য করতে পারতাম না, অল্প কিছু দিলে তিনি সারা বছর আমার গুণ মানুষের সঙ্গে গাইতেন—গিয়াস ভাইয়ের মতো পরোপকারী মানুষই হয় না! আমি তখন লজ্জায় মারা যেতাম। আমি যত বলতাম—আচ্ছা, আপনি এমন কেন? আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলতেন, আপনার মতো মানুষ দেখিনি, উপকার করলেন অথচ কিছুতেই স্বীকার করতে চান না। এ যাত্রায় আমি আরো লজ্জা পেতাম; কারণ তাঁর তুলনায় আমি সিকি ভাগও না।

স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন আবার ঘৃণাও করতেন কখনো প্রবল; স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক তো সব সময় অনিশ্চিত-অস্থির, কাচের ঘরে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পর্ক! আর হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, পৃথিবীর সবাই জানত, তাঁর স্ত্রীর নাম নিলুফার। তিনি নিলু ডাকতেন না, পুরো নাম ধরেই ডাকতেন। দশটা বাক্য বললে অন্তত তিনটা বাক্য থাকবে নিলুফারকে নিয়ে। নিলুফার এই বলল, নিলুফার ওই বলল, নিলুফার এই ভালোবাসে, নিলুফার ওই ভালোবাসে!

১৯৮৫ সাল থেকেই কলেজ সরকারি হওয়ার আওয়াজ পাই। এরশাদ সাহেব আমাদের কলেজ সরকারি করতে এসে স্টেজে বসে কানে কী যেন কুমন্ত্রণা পেলেন, সরকারি করলেন আমলা কলেজ। ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়া যেথায়-সেথায় সরকারি করতে লাগলেন এরশাদেরই মতো। তিনি এসে আমাদের কলেজেই ঢুকলেন না, পাইলট স্কুল মাঠে বলে গেলেন, পর্যায়ক্রমে হবে সরকারি। অথচ বাঘা বাঘা নেতা এখানে। অতঃপর কত কত টিনের দোচালা ঘর সরকারি কলেজ হয়ে গেল, আমাদের ১৯৬২ সালের বিশাল তিনতলা অট্টালিকা, বিশাল মাঠ। সব দেখে, নাকি বিশাল নেতার অবস্থান দেখে কেউই আর সরকারি করতে চাইলেন না। কিছুদিন পর শুরু হলো তলে তলে সরকারীকরণ, সেখানেও আমরা পিছিয়ে রইলাম রাজনৈতিক কারণে। কলেজটা নিয়ে কিংবা ঘিরেই হলো এখানকার রাজনীতি। কিন্তু পাশেই উপজেলা অফিস, শুনেছি সেখানে আবার একাট্টা হয়ে টেন্ডার সাবমিট করে, আবার ছাত্রদের ভর্তি আর ফরম ফিলআপের সময়ও একাট্টা হয়ে কলেজের শিক্ষকদের হকের টাকা মেরে ছাত্রদের কাছ থেকে পয়সা খেয়ে শুধু বোর্ড ফি দিয়ে কাজ করে দেয়। তো, সরকারি হয়ে গেলে বছরে এই লাখ লাখ টাকার ব্যবসার কী হবে!

২০১৫ সালের দিকে চাকরি শেষ হওয়ার আগে আবার কলেজ সরকারি হবে হবে করছে। আমরা মন্ত্রী-এমপি ধরার জন্য আবার তহবিল তৈরি করি প্রাণপণ। এবার তো বড় নেতা এমপি ও মন্ত্রী, বিশাল সুযোগ! রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত পাতিনেতাদের ধরে চা-পানি খাইয়ে মিটিং করি, টাকা দিই প্রকাশ্যে। তাঁরা আশ্বাস দেন। দুজনেই আমরা জুনে যাব, মাসের এমাথায়-ওমাথায়। স্বপ্ন দেখতে তো আমাদের জুড়ি নেই—সরকারি হলে কত টাকা পাব, সরকারি ঘর থেকে সে হিসাব করি। আরমান বলেন—গিয়াস ভাই, হিসাব করতে তো অসুবিধা নাই, পাই না পাই সে পরে। আমরা রাত-দিন পুকুরপাড়ে বসে হিসাব করতাম—যদি ডিসেম্বর নাগাদ ঘোষণা হয়ে যায়, হতেই পারে, ডাকসাইটে মন্ত্রী এখন এই এলাকার, তিনি একবার শুধু মুখ ফুটে বলবেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই কলেজটা ১৯৬২ সালের, এই কলেজের নিজস্ব ভূমি...। ২০১৬ সালের জুনে এসে একে একে দুজনই বিদায় নিলাম। আমি বিদায় নিলেও আবার নতুন করে চুক্তিতে জয়েন করলাম অনার্স পড়াতে, আরমানের সে সুযোগ ছিল না। তাঁর সাবজেক্টে অনার্স খোলা হয়নি।

কল্যাণ তহবিল আর সরকারের ঘরে সামান্য টাকার জন্য দরখাস্ত করতে আমাদের সময় লেগে গেল অনেক। এই কাগজ, সেই কাগজ—কত কী যে চায়!

তারপর কল্যাণের টাকাটা পাওয়া গেল দেড় বছর পর, বাকিটার খবর এখনো জানি না। পাব হয়তো, সরকারের নাকি এবার বরাদ্দ কম, ঢাকার অফিস থেকে এসব বলছে। আর আরমানের স্বাস্থ্য দ্রুত ভাঙতে লাগল। তাঁর ছেলেটা অনার্স শেষ করে চাকরির জন্য চেষ্টা করছে, মেয়েটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছে বছরখানেক আগে। কপাল এক অর্থে ভালো, ভাবি প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করে সামলে নিচ্ছেন সব। কিন্তু আরমান দিনকে দিন অচেনা হতে লাগলেন। আমাদের একটা প্রিয় জায়গা ছিল, একদিন বললাম—চলেন সেই জায়গাটায়, ঘুরে আসি!

আপনাদের বলি, বিলসুকা গ্রামের অনেক ভেতরে একটা উঁচুমতো ঢিবি আছে, চাষের জমির মাঝখানে। বড় কয়েকটা গাছ, এত সুন্দর জায়গা! জায়গাটা চিনিয়েছেন আমাদের ফিজিক্যাল শিক্ষক হিমেল বক্সি, পাশেই তাঁর খালার বাড়ি। পরে আমরা দুজন নিয়মিত যেতাম। একদিন সন্ধ্যায় আমরা হেঁড়ে গলায় গানও করেছিলাম। ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ’ আর ‘ও ভাই কানাই কারে জানাই দুঃসহ এই দুঃখ’।

তো আরমান রাজি হলেন না; বললেন, আরেক দিন যাব। বললাম—তাহলে চলেন, আফাজ ডাক্তারের কাছে, এক পুরিয়া হোমিও দিলে মন ভালো হয়ে যাবে। আরমান বলেন—না, এসবে হবে না, অনেক পরীক্ষা দিয়েছে। স্বাস্থ্যসচেতন আরমান চিরকাল; বলেন, সামনের সপ্তাহে যাব ভাবছি।  তাঁর এক সপ্তাহ কবে চলে গেছে, আমি এর মধ্যে একটু রাজবাড়ী গিয়েছিলাম মেয়ের শ্বশুরবাড়ি।

তারপর...তারপর কাল। কাল ভাবি ফোন দিয়ে বললেন, আরমানের বোধ হয় স্ট্রোক করেছে, একটু

আসেন। জানাজা শেষ করে যখন বলতে গেছি, সব খুব সুন্দরভাবে হয়েছে, অনেক মানুষ তাঁর জানাজায় এসেছিল। তখন ভাবি আমাকে একটা ডায়েরি দিয়ে বললেন, এটা আপনাকে দিতে বলেছে পরশু, আপনি কি এখন নেবেন, নাকি পরে? আমি সেটা নিয়ে এসেছি, আমাকে বলেছিলেন, কাদের জন্য আমাদের প্রিয় কলেজটা সরকারি হয়নি—তার যতটুকু জানি তা-ই একটা অধ্যায়ে লিখেছি, বাকিটা আমার জীবন। ছাপোষা মানুষের আর কী-ই বা বাকি জীবন!

এখানে আসতে আসতে পৃষ্ঠা উল্টেছি, পুরো

ডায়েরি সাদাই প্রায়, সাদা ঠিক না, একটু হলদেটে, ১৯৯১ সালের ডায়েরি। মাঝে মাঝে সামান্য লেখা। পড়তে ইচ্ছা করছে না!

 



মন্তব্য