kalerkantho


একটা লিচুর গল্প

হাসনাত আমজাদ

১১ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



একটা লিচুর গল্প

অঙ্কন : মাসুম

লিচুটা গড়িয়ে গড়িয়ে চলেছে। এর-ওর পায়ের গুঁতা খেয়ে গড়াচ্ছে।

কদিন আগেও বেশ ছিল। আজ সকাল থেকে এই অবস্থা।

বেশ সুন্দর গাছের ডালে ঝুলছিল। টকটকে লাল। গাছের মালিক বলছিল, লিচুগুলো সব পেকে গেছে। পাড়তে হবে। ব্যস, ভোরবেলা কজন লোক নিয়ে এসে ঝটপট ছিঁড়ে ফেলল গাছ থেকে সব লিচু। থোকা থোকা করে সাজিয়ে ফেলল। সে-ও ছিল এক থোকার মধ্যে।

কিন্তু ঝুড়িতে যখন তুলছিল তখন টুপ করে নিচে পড়ে গেল।
পড়তে দেরি হলো, কিন্তু তুলতে দেরি হলো না। একটা পাখি শাঁই করে উড়ে এসে ঠোঁটের কোনায় তুলে নিয়ে চলল তাকে। উড়ছে লিচুটা। উড়ে চলেছে সে। বেশ মজা লাগছিল তার। এভাবে আকাশে এর আগে কখনো ওড়েনি সে। পাখিদের ওড়া দেখেছে। মাথার ওপর দিয়ে বিমান উড়ে যেতে দেখেছে। ঠিক তেমনি এখন সে নিজে উড়ছে। বেশ মজা। ঠোঁটের কোনায় করে নিয়ে যেতে যেতে পাখিটার মুখ মনে হয় ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। উড়তে উড়তে কিছুক্ষণ পর হঠাত্ ঠোঁট থেকে টুপ করে লিচুটি ফেলে দিল পাখিটা। লিচু ঝপ করে এসে নিচে পড়ল। নিচে মানে, একেবারে লোকজনের ভেতরে। বোধ হয় একটা বাজার হবে সেটা। রাস্তার ধারে ছোট্ট একটা বাজার। দোকান আছে, মানুষ আছে, আবার গাড়ি-ঘোড়াও আছে। আশপাশে কয়েকটা বাড়ি। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে উফ করে উঠল সে। বেশ ব্যথা লেগেছে। একটু পর আবার ব্যথা। উফ! কে যেন লাথি মেরেছে। তাকাল সে। দামি প্যান্ট-শার্ট আর জুতা পরা একটা মানুষ। বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। গড়াতে শুরু করল লিচু। থামল কিছুদূর গিয়ে। যাক বাবা, ব্যথাটা কিছু কমেছে। খুব একটা বোঝা যাচ্ছে না। আস্তে করে চারদিকে তাকাল সে। হুম, ঠিকই আছে। যা ভেবেছে সেটাই। ছোট বাজার। ছোট ছোট দোকান। ওর পাশেই একটা দোকানের সাইনবোর্ড। আবদুর রহিম ক্লথ মার্চেন্ট। কাপড়ের দোকান। মুখটা বাঁকা করল। ছোট্ট এক দোকান, সাইনবোর্ডে লিখেছে মার্চেন্ট। মানুষগুলো আজকাল কী যে ভাবে নিজেকে। বাজারের নামটা পড়ার চেষ্টা করল, পারল না। তার আগেই আবার একটা গুঁতা। একটা মেয়ের হাইহিলের গুঁতা খেয়েছে এবার। আবার গড়াল। গড়াচ্ছে। উঠে পড়ল পাকা রাস্তায়। এবার সুন্দরভাবে গড়িয়ে চলল। মন্দ লাগছে না। সারা জীবন তো গাছেই ঝুলে থেকেছে। ওড়ারও সুযোগ আসেনি, গড়ানোর মজাও বোঝেনি আগে।
কিছুদূর গড়ানোর পর থামল লিচুটা। চারদিকে তাকাল। একটা মোরগ। লিচুকে দেখেছে। রাস্তা থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খাবার খাচ্ছিল মোরগটা। লিচুকে দেখে এগিয়ে এলো। বেশ বড়সড় ঝুঁটিওলা মোরগ। দ্রুত এগিয়ে আসছে। কাছে এসে ঠোঁট দিয়ে প্রথমে আলতো করে একটা ঠোকা দিল লিচুটার গায়ে। এতেই লিচুর দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। বুঝতে পারছে মোরগটা ঠুকরে ঠুকরে খেয়ে ফেলবে ওকে। ঠিক সেই সময় ওপাশ থেকে দৌড়ে এলো একটা কুকুর। রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে ও। কী মনে করে মোরগটার দিকে তেড়ে এলো কুকুরটা। মোরগ ডানা ঝাপটিয়ে দিল দৌড়। লিচুকে কুকুরটা দেখতে পায়নি। যাক বাবা, বাঁচা গেল।
চুপচাপ বসে রইল লিচু বেশ কিছুক্ষণ। ঘুম ঘুম ভাব। চোখ বন্ধ করে রইল কিছুক্ষণ। চোখ খোলার পর দেখল একটা কালো পিঁপড়া বসে আছে পাশে। ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে পিঁপড়াটা। মুচকি হেসে বলল, ও ভাই লিচু, তুমি কোত্থেকে এলে এই রাস্তায়? আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছ বুঝি? বাস ধরবে নাকি? পিঁপড়াটার দিকে তাকিয়ে লিচুও হাসল। এতক্ষণে কথা বলার মতো কাউকে পেয়েছে। বলল, নারে ভাই, যা ভাবছ তা না। এই এত দূরে আত্মীয় কোথায় পাব? ছিলাম গাছে, ঘুরতে ঘুরতে এসেছি এইখানে। কোথায় যাব বুঝতে পারছি না। পিঁপড়া বলল, তাহলে শিগগির সরে পড়ো। একটুও দাঁড়িয়ো না এখানে। দেখছ না কত গাড়ি রাস্তায়? কখন কার তলায় পড়বে ঠিক নেই। লিচু ভয়ে ভয়ে চারপাশে তাকাল। একটা ট্রাক দ্রুতবেগে ছুটে আসছে উল্টো দিক থেকে। ওর কাছাকাছি চলে এসেছে প্রায়। লিচু অসহায়ের মতো পিঁপড়ার দিকে তাকাল। বলল, ভাই পিঁপড়া, আমি তো একা একা চলতে পারি না। কী হবে আমার এখন? ট্রাকটা বেশি দূরে নেই। লিচু ভয়ে চোখ বুঁজে ফেলল। বুঝতে পারল এক্ষুনি সে মরে যাবে।
মিনিটখানেক পর পিটপিট করে চোখ খুলল লিচু। না, মরেনি! অল্পের জন্য বেঁচে গেছে সে। ট্রাকটা একদম পাশ দিয়ে চলে গেছে। পিঁপড়া বলল, এবারের মতো বেঁচে গেলে ভাই লিচু। কিন্তু এরপর কী করবে? এখান থেকে আমাদের নিরাপদ জায়গায় যেতে হবে। নইলে দুজনই মরব। কিন্তু এই বিপদে তোমাকে রেখে যাই কিভাবে? একা আমি তোমাকে সরাতেও পারব না। আরো পিঁপড়া লাগবে। লিচু বলল, ভাই, যা করতে হয় করো। আমাকে বাঁচাও। পিঁপড়াটা চারদিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক শব্দ করল। অমনি আশপাশ থেকে আট-দশটা পিঁপড়া হাজির। নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করল। তারপর সবাই মিলে টেনে লিচুকে রাস্তা থেকে সরিয়ে নিয়ে এলো। পিঁপড়াদের মিলিত শক্তি আর একতা দেখে অবাক হলো লিচু। ছোট্ট প্রাণী। এত ছোট যে পায়ের তলায় ঘোরে। চোখে পড়ে না কারো। কিন্তু কত কিছু শেখার আছে এদের কাছে। লিচু বলল, ভাই পিঁপড়া, তোমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। তোমার কথা সারা জীবন মনে থাকবে। পিঁপড়ার দল বিদায় নিয়ে চলে গেল।
লিচু বুঝতে পারল তার একা চলার শক্তি নেই। চুপটি করে বসে রইল অনেকক্ষণ। মনটাও খারাপ। এতক্ষণ বেশ লাগছিল। মনে হচ্ছিল দেশ ভ্রমণে বের হয়েছে। এখানে ঘুরছে ওখানে ঘুরছে। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। খিদেও পেয়েছে খুব। গাছে থাকার সময় ক্ষুধা-তৃষ্ণা টের পেত না। শিকড় থেকে তরতর করে খাবার চলে আসত। গাছ ছিল ওর মা। ছায়া দিত, খাবার দিত। আগলে রাখত সব সময়। ‘কত নিরাপদে ছিলাম। এখন বাইরে এসে বুঝতে পারছি’।
কী করবে ভাবছে লিচু। এমন সময় পেছন থেকে জোরেসোরে গু্তা। অবহেলাভরে কে যেন একজন লাথি মেরেছে। গড়াতে গড়াতে এক ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায়। চারদিকে আঁধার নেমে আসছে। তবে ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায় বেশ আলো। কয়েকটা টোকাই শিশু সেই আলোতে বসে পড়ছে। সুর করে নামতা মুখস্থ করছে সবাই। এক এককে এক। দুই এককে দুই। একটু বড় একটা মেয়ে ওদের পড়াচ্ছে। অবাক হলো লিচু। ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে পড়ছে কেন ওরা? ভালো করে তাকাল। বাড়িঘর নেই এদের? বইগুলো পুরনো। হঠাত্ একটা মেয়েশিশুর নজরে পড়ল সে। আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল মেয়েটা। ওমা, কী সুন্দর লিচু। বেশ বড়সড়। রসে টইটুম্বুর করছে। এই লিচু, তুই কোত্থেকে এলি রে? ওর কথা শুনে সবাই তাকাল ওর দিকে। ততক্ষণে মেয়েটা লিচুকে কুড়িয়ে নিয়েছে। যত্ন করে ওর জামা দিয়ে লিচুকে মুছে দিল। বলতে লাগল, শোন তোরা, এই লিচু আমি কাউকে দেব না। আমাদের ঘরে নিয়ে যাব। সুতা দিয়ে বেঁধে ঘরে সুন্দর করে ঝুলিয়ে রাখব। ও হবে আমার বন্ধু। গল্প করব। তারপর লিচুর দিকে তাকিয়ে বলল, কিরে, আমার বন্ধু হবি? এক দৌড়ে গিয়ে রাস্তার পাশের ট্যাপ থেকে হাতে করে আঁজলা ভরে পানি নিয়ে এলো। ধুয়ে পরিষ্কার করল লিচুকে। এত আদর-যত্ন দেখে লিচু অবাক। সেই সকাল থেকে পায়ে পায়ে ঘুরছে। এ পা থেকে ও পা। ময়লা-কাদায় চেহারা কখন নোংরা হয়ে গেছে টের পায়নি। সারা দিন কেউ এতটুকু খেয়াল করেনি। অথচ এই শিশুর কাছে তার কত আদর। ওর মা গাছের কথা মনে হলো। মেয়েটা যেন ওর মা গাছের মতো। চোখে পানি চলে এলো লিচুর। লিচুটা আবার ঝুলছে। আগে গাছে ঝুলত, এখন ঘরে ঝুলছে। বস্তির ছোট্ট ঘরে।


মন্তব্য