kalerkantho


গল্প

পরির পোষা প্রজাপতি

অরণ্য প্রভা

১০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পরির পোষা প্রজাপতি

আঁকা : মানব

পরিদের ব্যালকনিতে শোভা পাচ্ছে এখন চারটি রঙিন প্রজাপতি। একটির নাম নীল ডোরা, অন্যটির নাম সপ্তপদ্মরাগ আরেকটির নাম মেঘকুমারী, আর যেটা পরির সবচেয়ে প্রিয়, সেটার নাম হলো লোপামুদ্রা।

প্রজাপতির মেলা থেকে যে তথ্যবই এনেছে, সেখান থেকে জানতে পেরেছে পৃথিবীতে নাকি ২০ হাজার প্রজাতির প্রজাপতি রয়েছে। আর এ দেশে রয়েছে মাত্র ৫০০ প্রজাতির।

নীল ডোরাটা হলুদ গাঁদার পাপড়িতে, সপ্তপদ্মরাগ কেন জানি টবের স্যাঁতসেঁতে ভেজা মাটিতে পড়ে আছে। মাটিতে পড়ে থাকার কারণটা পরি বুঝতে পারে না। মেঘকুমারী পড়ে আছে অপরাজিতা ফুল আঁকড়ে ধরে। ডানা প্রসারিত করে মধু পান করছে। আর লোপামুদ্রা ঘাসফুলের ওপর পড়ে চারটি পাখা তির তির করে দোলাচ্ছে।

প্রজাপতি উড়ছে, উড়ে উড়ে ফুলের পাপড়িতে বসে বসে মধু খাচ্ছে। প্রজাপতির এমন ওড়াউড়ি দেখে পরির ভাবনারাজ্যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায়।

পরি যখন ব্যালকনির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন লোপামুদ্রা বলে ওঠে—আমাকে ছেড়ে দাও। আমি যেখান থেকে এসেছি সেখানে চলে যাব।

পরি বলে, তুমি কোথা থেকে এসেছ?

আমি ভারতের সিকিম রাজ্য থেকে এসেছি।

ও মা! সেকি! সে তো শত শত মাইল দূর। অত দূরে তুমি কেমন করে যাবে। আর তা ছাড়া পথে পথে ঝড়-বৃষ্টি আছে না?

তখন প্রজাপতিটা বিস্ময়করভাবে বলে, ওড়াউড়ির এই ৩০-৩৫ দিনের জীবনে আমরা প্রায় তিন হাজার মাইল পর্যন্ত উড়তে পারি। আমাদের পথেরও কোনো ভুল হয় না। আর তুমি যে বললে, পথে পথে ঝড়-বৃষ্টি। ঝড়-বৃষ্টির কথা আমরা অনেক আগেই টের পেয়ে যাই।

ও মা! তাই নাকি। অবাক ব্যাপার তো!

এবার নীল ডোরা বলে ওঠে—তোমাদের ব্যালকনির ফুলগাছগুলোতে আলো-হাওয়ার বড়ই অভাব, সে জন্যই গাছগুলো ঠিকমতো বড় হতে পারছে না, আর ফুলের মধুগুলোও তেমন মিষ্টি না। কারণ প্রকৃতির শিশিরবিন্দু আর ফুলের পাপড়ির সংমিশ্রণে যে মধুর সৃষ্টি হয়, তা হচ্ছে না। তোমরা নিশ্চয়ই বইতে পড়েছ, প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশু আর ইট-কাঠের দেয়ালের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে অনেক পার্থক্য।

পরি প্রজাপতির মায়ায় অনুরক্ত হয়ে ব্যালকনির নেটগুলো খুলে খুলে দেয়। প্রজাপতিগুলো কিছুদূরে উড়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে পরির মাথায়, গালে, হাতে পড়ে। প্রজাপতিগুলোকে আলতো করে স্পর্শ করে। কী নরম আর তুলতুলে রঙিন পাখা। তিনটি উড়ে চলে গেলেও একটি কী কারণে যেন ব্যালকনির গ্রিলে পড়ে থাকে।

রংধনুর সাতটি রং যেন একাকার হয়ে মিশে রয়েছে প্রজাপতির ডানায়। ব্যালকনির একেবারে কোনায় যে গোলাপগাছটায় হলুদ গোলাপ ফুটে আছে, সেই গোলাপের পাপড়িতে বসে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। তার রঙিন পাখা দুটি তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করার মতো দোল খাচ্ছে। প্রজাপতির পাখার সঙ্গে সঙ্গে পরির মনটাও যেন দুলে ওঠে।

পরি প্রজাপতির আরো কাছে আসে। দুই আঙুল দিয়ে পাখাটা ধরতে চায়। স্পর্শ করা মাত্র উড়ে চলে যায়। আঙুলে লেগে থাকে প্রজাপতির কোমল রঙের রঙিন রং। কত নরম আর তুলতুলে ছিল তার পাখা, সেটাই এখন অনুভূতিতে খেলা করে। আর তাদের ঘ্রাণশক্তি এত প্রখর যে অনেক দূর থেকেই ফুলের ঘ্রাণ চিনতে পারে।

বিষণ্ন মনে পরি গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে অপলক চেয়ে থাকে। পরির মলিন মুখ দেখে আম্মু প্রশ্ন করেন—প্রজাপতিগুলোর চিন্তায় তুমি কি নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেবে? অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ আছে, খাঁচায় পোষা পাখি আছে, তোমার খেলার সাথি পুতুলগুলোর সঙ্গে পোষা বিড়ালটাও আছে। কী নেই তোমার? এখন আবার বলছ, প্রজাপতিগুলো চাই?

প্রকৃতির আলো-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা প্রজাপতিগুলো তুমি খাঁচায় বন্দি করে তাদের স্বাধীনতা হরণ করতে চাও? একবার ভেবে দেখো, তোমাকে যদি কোনো বনে বন্দি করে রাখা হয়, তখন তুমি নিশ্চয়ই কষ্ট পাবে, আর আমাদেরই বা কেমন লাগবে? ঠিক তেমনই ওদেরও মা-বাবা আছে, ফুলে ফুলে মধু খেয়ে ওরাও ফিরে যেতে চায় তাদের কোলে। কেউ কেউ আছে প্রজাপতিকে কী মনে করে জানো? মনে করে, দেবতাদের চোখের জল থেকেই ওদের জন্ম। আবার কেউ মৃত আত্মার প্রতীকও মনে করে প্রজাপতিকে।

পরি মন খারাপ করে থাকলে আম্মু এসে বলেন—প্রজাপতি, মৌমাছি এদের কারণেই পরাগায়ণ ঘটে, ফুল হয়। ওরা না থাকলে গাছে গাছে ফুল ফুটবে না। প্রকৃতির সুন্দর স্মৃতিগুলোর মধ্যে পাখি, ফুল আর প্রজাপতিই সেরা, সেটা আরো বড় হলে তুমি জানতে পারবে। ঠিক আছে, এবার গ্রীষ্মের ছুটিতে তোমাকে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, সাফারি পার্ক ও পতেঙ্গায় প্রজাপতি পার্ক দেখাতে নিয়ে যাব।

এবার পরিকে আব্বু বলেন—চলো, লক্ষ্মী সোনা, স্কুলে যাবে। প্রজাপতিকে কখনো পোষ মানানো যায় না। খোলা প্রকৃতি ছাড়া ওরা বাঁচতে পারে না। হঠাত্ কোনো প্রজাপতি ঘরে ঢুকে পড়লে সকালে কিন্তু দেখা যায়, প্রজাপতিটা মরে পড়ে আছে। পরি বলে, হ্যাঁ, সেদিন নীল ডোরা আমাকে বলেছে, তোমাদের ব্যালকনিতে টবের ফুলগুলোর মধু তেমন মিষ্টি না।

স্কুল ছুটি শেষে পরি অপেক্ষা করে বাবার জন্য। স্কুলের পাশের সরিষাক্ষেতে প্রজাপতিদের সমারোহ দেখে বলে ওঠে—অ্যাই, তুমি লোপামুদ্রা না? তুমি আমার ওই পোষা প্রজাপতি? হয়তো প্রজাপতিটা শুনতে পায় পরির কথা। সে কারণেই তার একেবারে খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়।  

বিকেলের রোদ তখনো ফিকে হয়ে যায়নি। বিড়ালের মিউমিউ ডাকে ঘুম ভেঙে যায় পরির। সেই ডাক অনুসরণ করে এক পা-দুই পা করে এগিয়ে যায় ব্যালকনির দিকে। সেখানে একটি রঙিন প্রজাপতি দেখে চমকে ওঠে। প্রজাপতির রঙিন পাখা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে আনন্দে নেচে নেচে পরি বলতে থাকে, এটা আমার মেঘকুমারী? না, লোপামুদ্রা!


মন্তব্য