kalerkantho


মেলায় যাব, খেলনা কিনব

অনেক আগে থেকেই মাটি, কাঠ, বাঁশ, শোলা, বেতসহ নানা রকম সহজ উপাদান দিয়ে এ দেশে খেলনা তৈরি হয়ে আসছে। তবে গ্রামীণ এই খেলনা এখন গ্রামে পাওয়াই কঠিন। তবে মেলায় দেখা মেলে এসব খেলনার। পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে এমন কিছু খেলনার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন মোহাম্মদ আসাদ

১৩ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



মেলায় যাব, খেলনা কিনব

শখের হাঁড়ি

মাটির তৈরি রঙিন শখের হাঁড়ির থেকে চোখ ফেরানো কঠিন। একসময় রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার হাজারও কুমার এই হাঁড়ি তৈরি করত। বিয়ে অথবা দাওয়াতে মিষ্টি নেওয়ার জন্য এই লোকশিল্পটি ছাড়া চলতই না। প্রতিটি বাড়িতে ছিল ছোট-বড় নানা আকৃতির শখের হাঁড়ির সংগ্রহ। এই অঞ্চলের লোকজন লম্বা শিকায় শখের হাঁড়ির সাজিয়ে রাখত। অলংকার, জামা-কাপড় রাখত এই হাঁড়ির মধ্যে। ভাবছ শখের হাঁড়ির সঙ্গে ছোটদের সম্পর্ক কী? ছোট আকারের শখের হাঁড়ি শিশুরা খেলার জন্য ব্যবহার করত। বাংলাদেশে এখন একজন শখের হাঁড়ি শিল্পী টিকে আছেন। রাজশাহীর সুশান্ত কুমার পাল তাঁর ছেলেদের নিয়ে এখনো শখের হাঁড়ি, পঞ্জসাঝি (এক ধরনের ছোট রঙিন হাঁড়ি। পাঁচটি হাঁড়ি একসঙ্গে থাকে) এবং খেলনা হাঁড়ি তৈরি ও বিক্রি করে যাচ্ছেন। শখের হাঁড়ির মূল উপাদান মাটি ও অ্যাক্রিলিক রং। প্রথমে মাটি দিয়ে হাঁড়ি তৈরি করে পোড়ানো হয়। তারপর তার ওপর নানা রকম ফুল-পাখি, লতাপাতা এঁকে বানানো হয় শখের হাঁড়ি।

 

কাঠের খেলনা

মাটির খেলনা ভঙ্গুর হওয়ার কারণে একসময় কাঠের খেলনার জনপ্রিয়তা ছিল বেশি। ছেলেরা খেলত কাঠের ঘোড়া ও হাতি দিয়ে, আর মেয়েরা কাঠের পুতুল দিয়ে। এই খেলনা সব জেলায়ই তৈরি করত সূত্রধররা। প্লাস্টিকের খেলনা বাজার দখল করে নেওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে এ ধরনের খেলনা। বর্তমানে একজনই কাঠের খেলনার কারিগর টিকে আছেন। তাঁর নাম আশুতোষ চন্দ সূত্রধর। বাড়ি নারায়ণঞ্জের সোনারগাঁয়ে। প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি তৈরি করে চলেছেন কাঠের খেলনা। কাঠের খেলনা তৈরিতে প্রয়োজন মাপমতো কাঠ আর এনামেল রং। কদম, শিমুল, গামরি কাঠ ব্যবহার হয় কাঠের খেলনা তৈরিতে। ক্রেতার চাহিদামতো অনেক সময় দামি কাঠ দিয়েও বানানো হয়। খেলনার আকার হিসেবে ৩, ৬, ৯, ১২, ১৮, ২২ ইঞ্চি পুরু কাঠ প্রয়োজন হয়। এসব কাঠ গাছ কিনে স মিল থেকে কাটিয়ে আনতে হয়। তারপর পেনসিল দিয়ে হালকাভাবে যে খেলনা হবে তার একটা নকশা আঁকা হয়। এবার হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে কেটে বের করে আনা হয় হাতি, ঘোড়া বা পুতুলের আকৃতি। পরে এনামেল রং দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় কাঠ। তার ওপর চোখ-মুখ এঁকে ফুটিয়ে তোলা হয় খেলনার রূপ।

 

খেলনা টমটম

খেলনা টমটম তৈরি করতে প্রয়োজন হয় ছোট্ট একটি মাটির পাত্র, সিমেন্টের বস্তার কাগজ ও বাঁশের কাঠি। প্রথমে মাটির ছোট্ট পাত্রের ওপর কাগজটি শক্ত করে লাগিয়ে দিয়ে ঢোলকের মতো তৈরি করতে হয়। এই ঢোলকটি বহনের জন্য বাঁশের কাঠি দিয়ে তৈরি করতে হয় একটি ছোট্ট গাড়ি। গাড়ির পেছনে শুধু দুটি চাকা থাকে। গাড়ির ওপর ঢোলকটি শক্ত করে বসিয়ে দিয়ে চাকার পাশে রাবার দিয়ে দুটি কাঠি বসিয়ে দেওয়া হয়। গাড়িটি টানলে চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে দুটি কাঠি ঢোলকের ওপর বাড়ি খেয়ে গুড় গুড় শব্দ করে। এই শব্দ করাটাই খেলনা টমটমের আসল মজা। সারা দেশে এই খেলনা জনপ্রিয় হলেও তৈরি হয় শুধুই বগুড়ায়। সেখানের দক্ষ কারিগররা টমটম তৈরি করে ছড়িয়ে দেন সারা দেশে। তাই তো খেলনা টমটম মেলায় সহজলভ্য খেলনা।

 

মাটির খেলনা

লোকজ খেলনার বেশির ভাগই মাটির তৈরি। এসব খেলনা সব জেলায়ই কুমাররা তৈরি করে। খেলনাগুলোর প্রধান উপাদান মাটি ও রং। খেলনার মধ্যে আছে—গরু, হাতি, ঘোড়া, নৌকা, পুতুল, পাখি, হুঁকা হাতে বুড়ো, নানা রকম ফল, মাছ, খেলনা হাঁড়ি-পাতিল ইত্যাদি। খেলনা মাটির ব্যাংকও ছোটদের ভারি পছন্দ। ব্যাংকের গায়ে ফুটো থাকে। ওখান দিয়ে কয়েন ফেলে ব্যাংকে জমানো যায়।

 

 

কাগজের চরকি

কাগজের চরকি দারুণ এক খেলনা। এটা বাতাসের দিকে ধরলেই ঘুরতে থাকে। যন্ত্র ছাড়া কোনো কিছু ভনভন করে ঘুরবে, ভাবা যায়! অথচ মজার এই খেলনা তৈরি করা যায় সহজেই। গ্রামেগঞ্জে চরকি ঘরেই তৈরি করা হয়। এক টুকরা কাগজ, একটু তার, এক খণ্ড কাঠি আঠা দিয়ে লাগিয়েই চরকি তৈরি করা হয়। ঢাকায় খড়ের তৈরি লাঠিতে শত শত চরকি সাজিয়ে ঘুরে বেড়ায় বিক্রেতারা। বৈশাখের মেলায় অনেক চরকি বিক্রেতা দেখতে পাওয়া যায়।

 

শোলার পাখি

মালাকাররা শোলার কাজ করে থাকে। তারা মূলত বিয়ের মুকুট তৈরি করে। বিয়ে-শাদি যখন কম থাকে তখন তৈরি করে শোলার মাছ, পাখি, ফুলসহ নানা রকম খেলনা। শোলার খেলনা তৈরি করতে লাগে শোলা, বাঁশের কাঠি, সুতা ও রং। শোলা এক ধরনের জলজ উদ্ভিদ। কাণ্ডনির্ভর এই উদ্ভিদ জন্মে ধান ক্ষেতের মধ্যে। নরম এই শোলা কেটে সহজেই খেলনা তৈরি করা যায়। একসময় মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুরসহ সারা দেশেই এই শিল্প জনপ্রিয় ছিল। বর্তমানে মাগুরা, নড়াইল ও খুলনার কয়েকজন মালাকার এই কাজ ধরে রেখেছে।

 

টেপাপুতুল

টেপাপুতুল জনপ্রিয় এক খেলনা। উত্তরবঙ্গের সব এলাকায়ই এটি এখনো জনপ্রিয়। তাই তো মেলা বা উৎসবে দেখা যায় টেপাপুতুলের দোকান সাজিয়ে বসেছে। মাটি দিয়ে তৈরি বিশেষ এক ধরনের পুতুল এই টেপাপুতুল। হাত দিয়ে টিপে টিপে পুতুলের আকৃতি দেওয়া হয় বলে একে টেপাপুতুল বলে। টেপাপুতুলে সাধারণত কোনো রং ব্যবহার করা হয় না। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সারা দেশ থেকে লোকশিল্প সংগ্রহ করেছিলেন। তার বড় একটা অংশ টেপাপুতুল। তিনি ঢাকার রায়েরবাজারের পাল বংশের সন্তান মরণ চাঁদ পালকে টেপাপুতুল তৈরির কৌশল শেখান। মরণ চাঁদ পালকে চাকরিও দিয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে চারুকলা ইনস্টিটিউটে। মরণ চাঁদের টেপাপুতুল ছড়িয়ে দিয়েছিলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। মরণ চাঁদের মৃত্যুর পর আধুনিক টেপাপুতুল কমই দেখা যায়। তবে উত্তরবঙ্গের কয়েকজন কুমার এখনো টেপাপুতুল নিয়ে আসেন ঢাকার মেলায়।


মন্তব্য