kalerkantho


বুড়োর লম্বা দাড়ির কাহিনি

ধ্রুব এষ

৮ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বুড়োর লম্বা দাড়ির কাহিনি

অঙ্কন : মাসুম

রূপকথার এক বুড়ো।

এই লম্বা তার দাড়ি।

এই লম্বা মানে কত লম্বা?

সেই রূপকথার যুগে তো আর গজ-ফিতা ছিল না রে ভাই, মানুষজন মাপ ধরত হাতের হিসাবে। এক হাত, দুই হাত, তিন হাত—এ রকম। এই হিসাবে সেই বুড়োর দাড়ি ছিল সাড়ে ২১ হাত লম্বা। রাজ্যের সবচেয়ে লম্বা হাতওয়ালা মানুষটি মেপে বলেছিল। তার মানে! চিন্তা করা যায়?

সেই বুড়ো থাকত এক পাতার কুটিরে। ছোট এইটুকু এক কুটির। এত লম্বা দাড়ি সেই কুটিরে ধরে? বুড়ো যখন ঘুমাত, কী করে আর, কুটিরের জানালা গলিয়ে দাড়ি অনেকটা বের করে রাখত। কেমন দেখাত? সে আর বলতে! সাদা রঙের এক মস্ত বাঘের লেজ যেন। হাওয়া উঠলে এমন উড়ত, তখন আর বাঘের লেজ নয়, মনে হতো লম্বা সাদা রঙের নিশান। আবার কখনো যা মনে হতো, তা সহজে বলার মতো নয়। তাও বলা যায় কি না দেখি। কী মনে হতো কখনো কখনো? মনে হতো আকাশের অনেক তারা বুঝি ঢুকে পড়েছে বাঘের লেজ কি নিশানে। তারা না, জোনাকি আসলে। অযুত-নিযুত জোনাকি। রাতের অন্ধকারে কি জোছনায় সে এক দেখার মতো দৃশ্য!

এর মধ্যে রূপকথার রাজ্যের ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী চাঁদে থাকতে গেছিল কিছুদিনের জন্য। চাঁদ থেকে তারা সবাই দেখে। কিন্তু এক রাতে কী হয়েছিল, ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসির সঙ্গে গল্প করতে করতে বেজায় ঘুম পেয়ে গিয়েছিল তাদের। তারা ঘুমিয়ে পড়েছিল। এ জন্য কিছু দেখেনি। জোনাকিরাও সে রাতে ঘরের বার হয়নি। শীত বলে। শীত কী শীত! কনকনে ঠাণ্ডা। কিন্তু বেচারি বুড়ো তো নিরুপায়, একা। এত শীতেও তাকে তার দাড়ি সেই বের করে রেখেই ঘুমাতে হয়। ঘুমিয়েছিল। কুকাণ্ড ঘটল। ১৩১৩টা দাড়ি চুরি হয়ে গেল বুড়োর। সকালে যখন কুয়াশা কেটেছে, রোদ উঠেছে, বুড়ো সেই রোদে ঠাণ্ডা দাড়ি শুকাচ্ছে, জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিত ইউনিকল মানে তার একচাকার সাইকেলে চড়ে পাঠশালায় যাচ্ছিল, সে দেখে আঁতকে উঠল, ‘কী সর্বনাশ! ও বুড়ো!’

বুড়ো বলল, ‘কী হয়েছে রে?’

জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিত বলল, ‘তোমার দাড়ি চুরি হয়ে গেছে, বুড়ো।’

বুড়ো খ্যাক করে উঠল, ‘তুই কি চোখের মাথা খেয়েছিস? পাঠশালায় কী করে পড়াস? আমার দাড়ি চুরি হয়ে গেছে মানে? এগুলো কী, রোদে শুকাচ্ছি? পক্ষীরাজ বাঘের লেজ?’

জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিত ইউনিকল স্ট্যান্ড করে নেমে বলল, ‘তুমি আমার কথা বোঝোনি, বুড়ো। আমি তোমার দাড়ি গুনে দেখেছি। ১৩১৩টি দাড়ি কম পড়েছে। একটা, দুটা, তিনটা হলেও মানা যায়, তা না ১৩১৩টি?’

‘তাতে কী হলো? দাড়ি কী তোর?’

বুড়ো বলল।

জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিত বলল, ‘হায়রে আফসোস! তোমার দাড়ি আমার হবে কেন, বুড়ো? তোমার দাড়ি তোমার। অবশ্যই তোমার। কিন্তু তোমার দাড়ি কি এই রাজ্যেরও সম্পদ নয় কো?’

‘তা ঠিকই বলেছিস অবশ্য।’

‘তবে? চিন্তা করে দেখো দেকিনি একবার। বছরে অন্তত ৪০ লাখ ভিনদেশি এই রাজ্যে আসে কি না শুধু তোমার এই দাড়ি দেখবে বলে। তাতে রাজ্যের আয় কম হয়কো? রাজকারিগর পাথর কুঁদে তোমার ৯০ হাত লম্বা মূর্তি গড়েছেন! রাজকবি তোমার প্রতিটি দাড়ি ধরে ‘দাড়িমাহাত্ম কাব্য’ রচনা করেছেন! সেই তোমার ১৩১৩টি দাড়ি নিকেশ! হুয়া হুয়াকো! হুয়া হুয়াকো!’

পক্ষীরাজ বাঘ এ সময় উড়ে উত্তরের পাহাড়ে যাচ্ছিল। জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিত ও বুড়োকে বািচত করতে দেখে নামল। ডানা গুটিয়ে ঘাসের চেয়ারে বসে বলল, ‘কী হয়েছে, বুড়ো?’

বুড়োর আগেই জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিত বলল, ‘আর বলো না, সর্বনাশের আর কিছু বাকি নেই কো! কাল রাতে ১৩১৩টি দাড়ি চুরি হয়ে গেছে বুড়োর!’

পক্ষীরাজ বাঘ বলল, ‘কী সর্বনাশ! ১৩১৩টি দাড়ি চুরি হয়ে গেছে বুড়োর! কী সর্বনাশ! কী সর্বনাশ!’

বুড়ো বলল, ‘আরে বাঘের পো, কথা তো শোনো...।’

কিন্তু কে শোনে কার কথা?

পক্ষীরাজ বাঘের আফসোস দেখে কে? ঘ্যাও ঘ্যাও করে বিস্তর আফসোস করে বলল, ‘তা বুড়োর দাড়ি ছিল কতটা?’

জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিত বলল, ‘যতটা ততটা। তেরো শ তেরোটি দাড়ি চুরি হয়ে গেছে, সেটাই কী কম কথা নয় কো?’

বুড়ো বলল, ‘কী যন্ত্রণা! কম পড়া আর চুরি যাওয়া কি এক হলো নাকি রে পণ্ডিত?’

জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিত বলল, ‘তা হলো না? বলছ কী বুড়ো! চুরি না হলে দাড়ি কম পড়বে কেন?’

পক্ষীরাজ বাঘ বলল, ‘হক কথা।’

জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিত বলল, ‘তবে?’

বলে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকল। যে সে কিছু লোক তো সে না, সিনিয়র শিয়াল পণ্ডিতের বংশধর। সেই সিনিয়র শিয়াল পণ্ডিত, কুমিরের ছানাদের পড়িয়ে মানুষ করে যার খুবই সুখ্যাতি হয়েছিল।

বুড়ো বলল, ‘তবে আর কী! তোরা দুটো এখন দূর হ। সাতসকালে যন্ত্রণা শুরু করেছে!’

জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিত বলল, ‘সে তুমি যা মনে করো, বুড়ো। ১৩১৩টি দাড়ি! মোটেও হেলাফেলার কথা নয় কো।’

পক্ষীরাজ বাঘ বলল, ‘হক কথা। ১৩১৩টি দাড়ি কী হেলাফেলার বিষয়? আমি যাই। জলদি জলদি খবর দেইগে সবাইকে। চোর ধরতে হবে এএসএপি।’

বুড়ো বলল, ‘এএসএপি! এ আবার কী রে বাঘের পো?’

পক্ষীরাজ বাঘ বলল, ‘অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল, বুড়ো। যত দ্রুত সম্ভব। হেস্তনেস্ত করতেই হবে একটা। আমি যাই।’

বলে উড়াল দিল পক্ষীরাজ বাঘ।

‘হুয়া! হুয়াকো!’

বলে তার ইউনিকলে উঠে রওয়ানা দিল জুনিয়র শিয়াল পণ্ডিতও।

বুড়ো চিন্তা করল, কী যন্ত্রণা!

শীতকালের রোদ নরমসরম হলেও বুড়োর দাড়ি শুকিয়ে গেছে এর মধ্যে। বুড়ো দাড়ি গুটিয়ে উঠল। পক্ষীরাজ বাঘের তত্পরতায় ততক্ষণে কোনা-কানায় খবর হয়ে গেছে রাজ্যের। হাহাকার উঠেছে সর্বত্র। ১৩১৩টি দাড়ির জন্য হাহাকার। রাজা শোকবাণী দিয়েছেন। ঢেরা পড়েছে, বুড়োর দাড়িচোর ধরা পড়ুক না পড়ুক, ১৩১৩টি দাড়ির সন্ধান কেউ দিতে পারলে রাজ্যের কোষাগার থেকে তাকে ১৩ লাখ ১৩টা স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে পুরস্কৃত করা হবে।

কাজ হয়েছে ঢেরায়। রাজসুদ্ধ লোক সেই থেকে দিনমান বুড়োর দাড়ির সন্ধানে ঘুরছে। একটা দাড়িও কেউ পায়নি এখনো। তাতে কী? গল্প ফুরাবে না? তাতে কী? সব গল্প কি ফুরায়? সব গল্পের শেষে কী বলা যায়,

নাট গাছটি মুড়ালো

আমার কথাটি ফুরালো?

বলা যায়। নাট গাছটির কথা না হোক, এ কথা তো অন্তত বলাই যায়, আমার কথাটি ফুরালো।

 


মন্তব্য