kalerkantho


বিশ্বকাপের যত অদ্ভুতুড়ে ঘটনা

এ বছর বসেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২১তম আসর। দীর্ঘ পথচলায় অদ্ভুত ঘটনারও কমতি নেই। কিছু কিছু ঘটনা তো এতই অদ্ভুত, সেগুলোর কথা বিশ্বকাপের দর্শকরা কিছুতেই ভুলতে পারেন না। এমনই কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বিশ্বকাপের যত অদ্ভুতুড়ে ঘটনা

সের্হিয়ো গয়কোচিয়া

ফিজিও নিজেই অজ্ঞান!

১৯৩০ সালে যখন বিশ্বকাপ ফুটবল যাত্রা শুরু করল, তখন থেকেই প্রতিটি দলের সঙ্গে একজন করে ফিজিও থাকেন। ঘটনাটি সেই বিশ্বকাপেরই। এক ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের এক খেলোয়াড় ব্যথা পেয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। রেফারির ইশারা পেয়ে ফিজিও ছুট লাগালেন। কিন্তু খেলোয়াড়ের কাছাকাছি আসতেই পা হড়কে পড়ে গেলেন। হাতের ব্যাগটাও আছাড় খেয়ে পড়ল। দ্রুত ফিজিও উঠে দাঁড়ালেন। ব্যাগটা হাতে তুলে নিলেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে! রহস্যটা খোলাসা হলো, ফিজিওর ব্যাগটা খুলতেই। ব্যাগের ভেতর ক্লোরোফর্মের একটা ভাঙা বোতল। আগে খেলোয়াড়রা কোথাও বেশি ব্যথা পেলে সেখানে খানিকটা ক্লোরোফর্ম লাগিয়ে দেওয়া হতো। তাতে জায়গাটা অবশ হয়ে যেত, ব্যথাটাও টের পাওয়া যেত না। ফিজিও আছাড় খেয়ে পড়তেই বোতলটা ভেঙে চারপাশের বাতাসে ক্লোরোফর্ম ছড়িয়ে পড়ে। ফিজিও যখন নিচু হয়ে আবার ব্যাগটা তুলে নিচ্ছিলেন, ওই ক্লোরোফর্মই নাকে-মুখে ঢুকে তাঁকে অজ্ঞান করে ফেলেছিল।

 

কম্পিউটার গেমস তারকাদের শরণ!

২০০২ সালে যৌথভাবে বিশ্বকাপের আয়োজন করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। সেবার দক্ষিণ কোরিয়া পৌঁছে যায় সেমিফাইনালে। সেখানে মুখোমুখি হয় জার্মানির। জার্মানদের হারানো তো আর মুখের কথা নয়। সে জন্য ‘বিশেষ কিছুর’ প্রয়োজন। সেবার কোরিয়ানদের কোচ ছিলেন গাস হিডিঙ্ক। তিনিও খেলোয়াড়দের উদ্দীপ্ত করার জন্য বিশেষ একটা কিছুই করলেন। কোরিয়ায় তখন স্টারক্র্যাফট নামের একটা কম্পিউটার গেইম ভীষণ জনপ্রিয়। হিডিঙ্ক সেই খেলায় কোরিয়ার সেরা খেলোয়াড়দের ডেকে নিয়ে এলেন ড্রেসিংরুমে! যাঁরা ঘরে বসে বসে খেলেন, তাঁরা উদ্দীপ্ত করার দায়িত্ব নিলেন মাঠের খেলোয়াড়দের!

কিন্তু হিডিঙ্কের এই বিশেষ কিছুতে কাজ হয়নি। সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে সেবার দক্ষিণ কোরিয়ার স্বপ্নযাত্রা শেষ হয়েছিল।

 

কার লাথি কে মারে!

১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে আফ্রিকা থেকে মূল পর্বে খেলার সুযোগ হয়েছিল জায়ারের। দেশটির নাম অবশ্য এখন কঙ্গো। সেবার প্রথম দুই ম্যাচে হেরেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায় তাদের। এর মধ্যে যুগোস্লাভিয়ার কাছে হারে ৯ গোলের বিশাল ব্যবধানে। শেষ ম্যাচে ব্রাজিলের সঙ্গেও হেরেছিল। তবে সেই ম্যাচের একটি মুহূর্তের জন্য দলটিকে মনে রাখবে বিশ্বকাপ দর্শকরা। মুহূর্তটা এসেছিল খেলার একেবারে শেষের দিকে। ততক্ষণে ব্রাজিল এগিয়ে গেছে তিন গোলে। জায়ারের পেনাল্টি বক্সের একটু বাইরেই ফ্রি কিক পেয়েছে ব্রাজিল। রিভেলিনো শট নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। সামনে জায়ারের খেলোয়াড়রা দেয়াল বানিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রেফারি বাঁশি বাজালেন। ওমা, রিভেলিনো শট নেবেন কি, তার আগেই জায়ারের এক খেলোয়াড় দৌড়ে এসে বলে কষে এক লাথি মেরে দিল! অদ্ভুতুড়ে এই কীর্তির জন্ম দেওয়া খেলোয়াড়ের নাম জোসেফ মুয়েপু ইলুঙ্গা। ম্যাচ শেষে এই কাণ্ড ঘটানোর কারণও বলেছিল সে। জায়ারে তখন চলছিল প্রেসিডেন্ট মোবুতু সিসি সিকোর সামরিক শাসন। আগের ম্যাচে যুগোস্ল্লাভিয়ার কাছে জায়ারে ৯ গোল খাওয়ায় মোবুতু ভীষণ খেপে গিয়েছিলেন। লোক পাঠিয়ে ফুটবলারদের স্রেফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, পরের ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে চার গোল খেলেই তাদের আর দেশেই ঢুকতে দেবেন না। ব্রাজিলের সঙ্গে সেই ম্যাচে এরই মধ্যে জায়ারে তিন গোল খেয়ে বসেছিল। আরেক গোল খেলেই আর পরিবার-পরিজনের কাছে যাওয়া হবে না, সেই ভয় থেকেই অমন পাগলাটে কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছিলেন ইলুঙ্গা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ব্রাজিলের কাছে তিন গোলেই হেরেছিলেন ইলুঙ্গারা। চার গোল আর হজম করেননি।

 

 

গয়কোচিয়া কাণ্ড

আর্জেন্টিনার হয়ে ১৯৯০ বিশ্বকাপ খেলেছিলেন গোলকিপার সের্হিয়ো গয়কোচিয়া। তবে আশ্চর্য ব্যাপার হলো যখনই খেলা পেনাল্টি শুট-আউটে যেত, গয়কোচিয়া গোলপোস্টের ঠিক সামনেই প্রাকৃতিক কাজটি সেরে নিতেন। শুধু তা-ই নয়, পরে জিজ্ঞাসা করা হলে ব্যাপারটা তিনি খোলাখুলিই স্বীকার করেছিলেন।

গয়কোচিয়া প্রথমে যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে তিনটি, তারপর ইতালির সঙ্গে সেমিফাইনালে আরো দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন। তাঁর বীরত্বেই আর্জেন্টিনা পৌঁছে যায় ফাইনালে। এই সাফল্যের রহস্য? তাঁর মতে ওই মূত্র বিসর্জন! শুরু কোয়ার্টার ফাইনালে যুগোস্ল্লাভিয়ার সঙ্গে খেলায়। সেই খেলার ৯০ মিনিটে তো বটেই, অতিরিক্ত সময়েও কোনো দলই গোল দিতে পারেনি। এরপর যখন পেনাল্টি শুট-আউট শুরু হবে, তখন গয়কোচিয়ার ভীষণ বেগ পেয়ে গেছে। মানে যাকে বলে প্রকৃতি ডাক দিচ্ছে। উপায় না দেখে মাঠের মধ্যেই, গোলপোস্টের সামনে কাজ সেরে নিলেন। তারপর পেনাল্টি শুট-আউটে রীতিমতো অসাধ্য সাধন করলেন। যুগোস্লাভিয়ার প্রথম শট ঠেকিয়ে এমনিতেই তিনি আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তৃতীয় শটে ম্যারাডোনা, পরে আরো এক খেলোয়াড় পেনাল্টি মিস করে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েই দিচ্ছিলেন। পরে যুগোস্লাভিয়ার শেষ দুই শট ঠেকিয়ে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়ে দেন গয়কোচিয়া। গয়কোচিয়ার মনে বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যায়, তাঁর ওই সাফল্যের রহস্য ওই মূত্র বিসর্জন। অতএব পরের ম্যাচে ইতালির সঙ্গে ১-১ সমতায় খেলা শেষ হলে, সেদিনও পেনাল্টি শুট-আউটের আগে একই কাজ করেন। ফলও পান হাতেনাতেই। ইতালির দুটি শট ঠেকিয়ে আর্জেন্টিনাকে তোলেন ফাইনালে। ফাইনালে অবশ্য ব্যাপারটা আর পরখ করে দেখতে দেয়নি জার্মানি। তারা ৯০ মিনিটের খেলায়ই আর্জেন্টিনাকে এক গোলের ব্যবধানে হারিয়ে দেন।

 

তিন হলুদ কার্ড!

২০০৬ বিশ্বকাপের এফ গ্রুপের শেষ খেলায় মুখোমুখি হয়েছিল ক্রোয়েশিয়া আর অস্ট্রেলিয়া। দুই দলেরই নকআউট পর্বে যাওয়া নির্ভর করছিল সেই ম্যাচের ওপর। অস্ট্রেলিয়া ড্র করলেই চলবে। কিন্তু ক্রোয়েশিয়াকে জিততেই হবে। খেলাটা স্বভাবিকভাবেই উত্তেজনাপূর্ণ হলো। প্রমাণ, সেই ম্যাচে রেফারি গ্রাহাম পোলকে হলুদ কার্ড দেখাতে হয়েছিল ৯ বার! এর মধ্যে তিনবারই তিনি হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন ইয়োসিপ সিমুনিচকে। গ্রাহাম পোল ৬১ মিনিটে ইয়োসিপ সিমুনিচকে প্রথম হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন। ৯০ মিনিট শেষে যখন ইনজুরি টাইমের খেলা শুরু হলো, তখন ক্রোয়েশিয়া একেবারে তেড়েফুঁড়ে খেলতে শুরু করল। আরেকটি গোল দিতে না পারলে যে তাদের বিশ্বকাপটাই শেষ হয়ে যাবে। দুই দলই তখন ১০ জনের। ঠিক তখনই আবারও সিমুনিচকে হলুদ কার্ড দেখাতে হলো পোলের। কিন্তু উত্তেজনায় ভুলেই গিয়েছিলেন আগেই সিমুনিচকে হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন তিনি। শুধু গ্রাহাম পোলই নয়, মাঠের আর কারোরই তা মনে ছিল না। তাই দুই হলুদ কার্ড নিয়েও মহানন্দে খেলতে থাকলেন সিমুনিচ। কিন্তু সে মাত্র ৩ মিনিটের জন্য। তার পরই আবারও ফাউল, আবারও পোল হলুদ কার্ড দেখালেন সিমুনিচকে। এবার হলুদ কার্ডের পর তাঁর পকেট থেকে ঠিকই লাল কার্ড বেরোল। আর ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক ম্যাচে তিন হলুদ কার্ড দেখার রেকর্ড গড়লেন ইয়োসিপ সিমুনিচ।



মন্তব্য