logo
আপডেট : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৫:২৮
লন্ডনের ইউনিভার্সিটিতে রোহিঙ্গা নিয়ে গবেষণা

লন্ডনের ইউনিভার্সিটিতে রোহিঙ্গা নিয়ে গবেষণা

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান পৈশাচিক অমানবিক নির্যাতন বরং প্রকাশ্য গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শক্তির তেমন কোনো প্রতিবাদ নেই। সেখানে এই জনগোষ্ঠীর ওপর বাস্তবে কী ঘটে যাচ্ছে, সে বিষয়েও কোনো খবরাখবর রাখার তেমন কেউ নেই। এমন পরিস্থিতিতে লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি এ বিষয়ে একটি তথ্যবহুল রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্টটি তৈরি করেছেন ওই ইউনিভার্সিটির তিনজন গবেষক : প্রফেসর পেনি গ্রিন, ড. টমাস ম্যাকমানাস এবং এলসিয়া ডি লা কোর ভেনিং।

গবেষণা করে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত মিয়ানমার সরকার এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অকথ্য নির্যাতন প্রকৃতপক্ষে জেনোসাইড বা গণহত্যার রূপ ধারণ করেছে। ইংলিশ ভাষায় রচিত এই রিপোর্ট প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সনে। COUNTDOWN TO ANNIHILATION : GENOCIDE IN MAYANMAR শীর্ষক এই রিপোর্টটি বাংলা ভাষায় রূপান্তর করেন লন্ডনপ্রবাসী তরুণ আলেম ও লেখক হোসাইন আহমদ। তার অনুবাদটি এ বছরের শুরুর দিকে টেকসই বাঁধাই আর ঝকঝকে কাগজে ছাপা হয়। 

সেই রিপোর্টের ভূমিকা লিখেছেন মিয়ানমারে হিউম্যান রাইটস অবস্থার ওপর জাতিসংঘের বিশেষ দূত (২০০৮-২০১৪) টমাস ওজি কুইনতানা। ভূমিকায় তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সার্বিক বেহাল অবস্থা মোটামুটি তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন।

তিনি লিখেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে তারা নিপীড়নের শিকার। সরকারিভাবে তারা এত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী সীমালঙ্ঘনের শিকার যে, হোলিস্টিকালি বিবেচনা করলে এবং পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করলে একটি হিমশীতল বিবর্ণ ফল প্রকাশিত হয়। 

এই উপসংহার কথার কথাও নয়, কিংবা কোনো শক্তির জোরেও বলা নয়। বিষয়টা গোপন রাখা হয়েছিল বহুকাল, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বৈষম্য ও নিষ্ঠুর নীতির দ্বারা। এই নীতি দশকের পর দশক ধরে ঐতিহাসিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বলতে গেলে আসল ফ্যাক্ট হলো এই নীতি প্রবলভাবে ওঠানামা করেছে। 

রোহিঙ্গাদের এই সংকটের সমাধানে ব্যর্থতার কারণ নিহিত মায়ানমারের রাজনীতি ও এর ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায়, যেখানে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত। এ ছাড়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও তাদের সহমর্মীদের প্রতি মিয়ানমারের দুর্ভাগ্যজনক শত্রুতাও একটি কারণ। এমনকি যারা হিউম্যান রাইটস ভাইয়োলেইশনের ভিকটিম, তারাও। 

যুগ যুগ ধরে চলে আসা মিলিটারি সরকারের কূটকৌশল ও কূটনীতিক মানিপুলেশন এই সংকটকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান রেখেই বলতে হচ্ছে, বর্তমান ব্যালেন্স সম্পূর্ণ নেগেটিভ। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে ব্যাপারে টানা উদ্বেগ ও চিৎকার তাদেরকে নিপীড়নকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পর্যাপ্ত নয়। এ ব্যাপারে কোনো পর্যাপ্ত উপলব্ধিরও উপস্থিতি নেই, যেটা মিয়ানমারে কোন মাত্রার কী ঘটে চলছে, সে ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা দিতে পারে। 

এই যখন অবস্থা, তখন আমরা আমলে নিয়েছি লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল স্টেট ক্রাইম ইনিশিয়েটিভ এর গবেষণাকে। ড্যানিয়েল ফায়ারস্টাইন এর বিশ্লেষণাত্মক ফ্রেমওয়ার্কের ভিত্তিতে এই রিপোর্ট প্রমাণ করে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে। আর তা একটি বিশ্বাসযোগ্য উপসংহারেও পৌঁছে যে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলছে একটি জেনোসাইড প্রক্রিয়া।

রোহিঙ্গা গ্রুপগুলোও জেনোসাইডের রিপোর্ট করে। কিন্তু ফ্যাক্ট হলো, অন্য খুব কম অর্গানাইজেশনই সমান উপসংহার টানে। সন্দেহ নেই, এটা একটা সূক্ষ্ম বিষয় এবং এ ক্ষেত্রে যেহেতু মিয়ানমারের রাজনৈতিক রূপান্তর জড়িত, তাই জেনোসাইডের ব্যাপারটা প্রকাশ করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি লজ্জাজনক বিষয়। তা সত্ত্বেও এ রকম অনুসন্ধান কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির এই রিপোর্টে আন্তর্জাতিক মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থাকে জেনোসাইড বিবেচনা করা ছাড়া উপায় নেই। 

রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্যজনক সংকট দ্রুত বাড়ছেই। এই সম্প্রদায় এখন কোণঠাসা ও ভীতসন্ত্রস্ত, যা তাদেরকে চালিত করছে ভয়ংকর অবস্থা থেকে পালিয়ে খোলা সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে, যেখানে অনেকেই মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্ব বিবেকও নামমাত্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। 

আমরা যদি একজন রোহিঙ্গা মহিলার একটি মুহূর্তের অনুভূতি কল্পনা করতে পারতাম, আমাদের সভ্যতার আসল চেহারা দেখতে পেতাম: অস্তিত্ব অস্বীকার, বঞ্চনা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য, কারারুদ্ধ অবস্থা, ধর্ষণের ভীতি, নিপীড়ন ও হিংস্রতার শিকার হয়ে মৃত্যু! এই অবস্থার পরিবর্তনে তাদের জন্য আমাদের কাজ করা আইনগত ও নৈতিক কর্তব্য।' 

এই গবেষণা বইয়ে রয়েছে আরাকানের ম্যাপ। রাখাইন সম্প্রদায়ের পরিচিতি। বর্তমান গণহত্যার কিছু বীভৎস চিত্রের রূপায়ন। রাখাইন রাজ্যের পরিধি কতটুকু আর এর উৎপত্তি কোথায় থেকে হয়েছে। রাখাইনদের ওপর নির্যাতন কবে থেকে কেন হচ্ছে তারও বিবরণী রয়েছে বইটিতে। মোটামুটি রাখাইন জাতি সম্পর্কে জানতে কোনো উৎসাহী পাঠকের যথেষ্ট খোরাক যোগাবে বইটি।

লেখক : আলোচক, ইকরা টিভি, লন্ডন

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com