logo
আপডেট : ৮ নভেম্বর, ২০১৭ ১৩:৪৪
‘আয়নাবাজি’ বা ‘ঢাকা অ্যাটাক’ নিয়েও আলোচনা হয়েছে, তবে সবটাই প্রশংসামূলক। ‘ডুব’ ব্যতিক্রম। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর এই ছবি নিয়ে দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত—এক দল পক্ষে, আরেক দল বিপক্ষে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনো ছবি নিয়ে এমন পক্ষ-বিপক্ষ লড়াইয়ের নজির নেই, অনলাইনে তো নয়ই। টাইমলাইন অনুযায়ী কে কী বলেছেন, তার নির্বাচিত অংশ নিয়ে এই আয়োজন
ডিভাইডেড বাই ডুব

ডিভাইডেড বাই ডুব

*    আমরা একদিকে প্রতিদিন বাংলাদেশকে আমাদের থেকে ছোট করে তুলছি, অন্যদিকে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সেই দেশটাকে উপমহাদেশের চেহারা দিচ্ছে। সবাই তাই একবার দেখি ‘ডুব’। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকি।
অমিতাভ রেজা চৌধুরী, পরিচালক [ফেসবুক, ২৬ অক্টোবর]

*    ভিলেনহীন ছবিটিতে দর্শকের মননে লুকিয়ে থাকা নৈতিক-অনৈতিক বোধগুলোই যেন একেকজন ভিলেন হয়ে সামনে আসে। নিজ ভাষায় নির্মিত বলেই চোখে জল আসছিল কি না বোঝার জন্য সন্তর্পণে চোখ মুছতে মুছতে আশপাশে খেয়াল করি! কোরীয়সহ বিদেশি অন্য দর্শকের একই সঙ্গে চোখ মোছা দেখে বুঝতে পারি, স্থান-কাল-পাত্রের সীমারেখা ভেদ করে ‘ডুব’ হয়ে উঠেছে মানবিক ও সর্বজনীন।
আবু শাহেদ ইমন, চলচ্চিত্র পরিচালক [ফেসবুক, ২৭ অক্টোবর]

*    ছবিতে যে অসম বয়সের প্রেম, বিবাহবহির্ভূত প্রেম আর তাকে ঘিরে পরিবারের সব সদস্যের যে অসহায়তা দেখানো হয়েছে, তা যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘটে চলেছে। কোনো নির্দিষ্ট দেশের কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গেই এটা ঘটেছে, তেমনটা কিন্তু নয়। ফলে আমার মতে, এটি একটি মৌলিক গল্প, একটি গভীর প্রেমের গল্প। ছবির ট্রিটমেন্টও খুবই শক্তিশালী। তার মধ্যে যেটা সব থেকে চোখে পড়ার মতো সেটা হলো একটা ‘থিন মিস্ট অব স্যাডনেস’। বিষণ্নতার পাতলা একটা কুয়াশা ওড়নার মতো সারাক্ষণ ছবিকে লেপটে রাখে।
মেঘদূত রুদ্র, ভারতীয় সমালোচক [আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৭ অক্টোবর]

*    ‘ডুব’ কি হুমায়ূন আহমেদের জীবনী অবলম্বনে বানানো সিনেমা? এককথায় উত্তর—না। ‘ডুব’ জাভেদ হাসানের গল্প, সাবেরীর গল্প। নীতু কিংবা মায়ার গল্পও। অভিযোগ ছিল, মেহের আফরোজ শাওনকে প্রতিনিধিত্ব করা পার্নো মিত্র অভিনীত ‘নীতু’ চরিত্রটিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সিনেমায়। কিন্তু যতক্ষণ না পরিচালক স্বীকার করছেন যে ‘ডুব’ হুমায়ূন আহমেদের বায়োপিক, ততক্ষণ নীতুর সঙ্গে শাওনের মিল খুঁজতে যাওয়াটা বোকামি। কোথাও দুটি গল্পে খানিকটা মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু আপনি যদি পর্দায় হুমায়ূন আহমেদকে খুঁজতে না চান, নীতুর মধ্যে জোর করে শাওনকে আবিষ্কারের নেশায় না নামেন, ‘ডুব’ আপনার জন্য চমত্কার একটা গল্প আর সুন্দর মেকিং নিয়ে অপেক্ষা করছে।
মুহাম্মদ সাইদুজ্জামান আসাদ, সমালোচক [সিনেমা হলের গলি, ২৭ অক্টোবর]

*    খুবই কঠিন একটা বিষয় পর্দায় এনেছে ফারুকী। কিন্তু দারুণভাবে সামলেছে। এই ছবির বড় গুণ হলো ‘পরিমিতিবোধ’। প্রত্যেকটা চরিত্রকে মানবিকভাবে দেখানো হয়েছে। তবে আগের ছবিগুলোতে দর্শককে তুষ্ট করার যে উপাদানগুলো রাখত, এই ছবিতে সেটা রাখেনি ফারুকী। ও ভীষণ সত্ ছিল।   
মোরশেদুল ইসলাম, চলচ্চিত্র পরিচালক [সময় টিভি, ২৮ অক্টোবর]

*    আমি মনে করি, সেলিব্রিটি হুমায়ূন আহমেদ ও তাঁর মেয়ের বান্ধবী মেহের আফরোজ শাওন পরস্পররে বিয়া কইরা আমাদের কূপমণ্ডূক সমাজে চমত্কার একটা উদাহরণ দান করছিলেন। ‘ডুব’ তা থেকে আমাদেরকে পিছনে নিয়া যাইতে পারে। শাওনকে চটুলভাবে উপস্থাপন করা হইছে ছবিতে। যদি বায়োপিক ধরি, না ধরার কারণ নাই, খুব নিরপেক্ষ উপস্থাপন এইটারে বলা যাবে না। সমাজে এর পরে এই ধরনের র্যাডিক্যাল বিয়ে করাটা আরো বেশি বিরোধিতার মুখোমুখি হবে। একগামিতার পক্ষে সেক্যুলার রক্ষণশীলদেরকে আরো বেশি নৈতিক শক্তি দান করবে ফারুকীর ‘ডুব’। হুমায়ূনের আগের ঘরকে যথাযোগ্য মর্যাদা এবং শিল্পগত পক্ষপাত ফিরাইয়া দেওয়ার কারণে এবং শাওনকে নেগেটিভ চরিত্রে রূপদানের মাধ্যমে ‘ডুব’ আমাদের বদ্ধমূল ও পশ্চাত্পদ নাগরিক দর্শকদের কাছে অনেক বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করার কথা।
ব্রাত্য রাইসু, কবি ও ব্লগার [‘কুতর্কের দোকান’, ২৮ অক্টোবর]

*    ছবি দেখা উচিত খোলা মনমানসিকতা নিয়ে। ছবিটা যখন দেখছিলাম তখন মনে হলো, এই ছবির গল্প কারো জীবনের হোক বা না হোক কিচ্ছু যায় আসে না। আমি শুধু জীবন দেখছিলাম।
অরিন্দম শীল, ভারতীয় পরিচালক [ফেসবুক, ২৮ অক্টোবর]

*    ‘ডুব’ যদি আপনার ভালো না লাগে, সে দায় আপনার নয়, নির্মাতার। আসলেই তো ‘ডুব’ সবার জন্য নয়। কিন্তু এই ছবির প্রচার করা হয়েছে বাণিজ্যিক ছবির মতো। এই ছবি সবাই অ্যাপ্রিশিয়েট করতে পারবে না, এটা খুব স্বাভাবিক।
আনিসুল হক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক [ফেসবুক, ২৯ অক্টোবর]

*    ‘ডুব’ আপনার ভালো না লাগলে আমার কোনো সমস্যা নাই, কিন্তু ছবিটা যদি আমার ভালো লাগে, সেখানে আপনার সমস্যা কোথায়? কেন আমাকে দালাল বলতে হবে! তাহলে কি আপনি হেটার? এই যে দুটা ভাগ করে দিচ্ছেন—দালাল আর হেটার, এখানে সিনেমার আলাপ কোথায়! পুরোটাই তো ব্যক্তি আক্রমণ। যাঁরা নাটক-টেলিফিল্ম বলেন, তাঁদেরও কিছু বলার নাই। কারণ জীবনে যত ভালো ছবি দেখেছি, তার সবই সেই হিসেবে নাটক-টেলিফিল্ম।
দাউদ হোসাইন রনি, সাংবাদিক ও সমালোচক [ফেসবুক, ২৯ অক্টোবর]

*    মেয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করার একটা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করলেও হুমায়ূন আহমেদের কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই ইরফানের কৃত চরিত্রের মধ্যে নেই। হুমায়ূন আহমেদের চলাফেরা, কথায় রস সৃষ্টি, গুনগুন করে গান করা—তার বিন্দুমাত্র নেই এ ছবিতে। ইরফান সাহেব যেভাবে চলেছে, যেভাবে কথা বলেছে, তার কোনো ছাপই আমাদের হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে নেই। হুমায়ূন আহমেদ নামে এই ছবিটার এত প্রচার হয়েছে যে সামান্য যে দর্শক আসছে, সেটা তারই ফসল। শো শেষে তারই প্রমাণ পেলাম ভার্সিটির এক তরুণের কথা শুনে। তরুণটি তার পাশের বন্ধুকে বলছে, ‘ওই বেটা, তুই কইলি হুমায়ূন আহমেদের জীবন নিয়া ছবি, এখানে তো তাঁর কিছুই দেখলাম না।’ সেই বন্ধু উত্তর দিল, ‘আরে দোস্ত, আছিল, শাওন কমপ্লেন দিয়া সেন্সর বোর্ড থেইকা কাটাইয়া দিছে।’

*    ফারুকী একজন বড়মাপের পরিচালক। আমরা ছবির গল্প পুরোটা না বুঝলেও তিনি পুরোটা বুঝেই এই চলচ্চিত্র বানিয়েছেন। চিন্তাভাবনার সংমিশ্রণ করে ছবির শট নিয়েছেন। ছবির চিত্রধারণ, সংগীত, আবহসংগীত, লোকেশন ও মেকিং খুবই ভালো, কিন্তু এই ভালোটা আমাদের বুঝিয়ে, সাধারণ মানুষদের জন্য সহজবোধ্য করে নির্মাণ করলে কী দোষটা ছিল। আমি বুঝতে পারি না, যে সৃষ্টি পাঁচ থেকে দশ শতাংশ লোকের বাহবা কুড়ায়, নব্বই শতাংশ লোককে সাথে নেয় না, সেই সৃষ্টির দরকার কী? আপনারা যাঁরা ভালো ছবি বানান, তাঁরা নিজেরা বিখ্যাত না-ই বা হলেন, সাধারণ মানুষরা আমাদের বিখ্যাত করে দিক।
ছটকু আহমেদ, চিত্রনাট্যকার-পরিচালক [রাইজিংবিডিডটকম, ২৯ অক্টোবর]

*    ছবিতে ফারুকী দেখাতে চাননি হুমায়ূন আহমেদের অসুখ আর তাঁর সেবাযত্নে ব্যস্ত শাওনকে। শাওনকে দেখানো হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের সংসার ভেঙে দেওয়া কোনো বাজে চরিত্রের স্বার্থপর মেয়ে হিসেবে, ‘অ্যাটেনশন সিকার’ হিসেবে, যে মানুষের সঙ্গে ব্যবহার জানে না, শীলার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে শীলার বাবাকে বিয়ে করে শোধ নেয়, যে শীলাকে তার বাবা কিছু উপহার দিক পছন্দ করে না, যে বাড়ির কাজের লোকদের খেতে দেয় না। শাওনের প্রতিভার সামান্য কিছুও প্রকাশ করা হয়নি ছবিতে। এ অনেকটা একটা শিশুতোষ ঠাকুরমার ঝুলি, যেখানে রাজা-রানির সুখের সংসার থেকে রাজাকে এক ডাইনি এসে উঠিয়ে নিয়ে যায়, বাকি জীবন রানির শোকে কাঁদতে কাঁদতে রাজা অন্ধ হয়ে যান, আর রাজার অপেক্ষা করতে করতে রানি বনবাসে যান। শিশুতোষ গল্পটির উপসংহার ফারুকী টেনেছেন এভাবে, জীবনে তারা এক না হতে পারুক, মৃত্যু তাদের এক করে দিয়েছে, তারা একে অপরের কাছে ফিরে এসেছে, অতঃপর তারা সুখে-শান্তিতে বাস করতে লাগলেন।

*    ‘ডুব’ ছবিতে নারীবাদের ন-ও পাইনি। পুরুষটি ভালো, পুরুষটি নিরীহ, পুরুষটি সবাইকে ভালোবাসে, সবাই পুরুষটিকে ভালোবাসে, সবার জন্য তার মন কাঁদে, আর নারী দুটির মধ্যে একটি ঝগড়াঝাঁটি করে, সন্দেহ করে, জল তেষ্টা পেলে জল দেয় না, আরেকটি সিডিউস করে, ডিস্টার্ব করে, মাথাটা খায়, হিংসা করে, ধন-সম্পত্তি সব দখল করে নেয়।
তসলিমা নাসরিন, লেখিকা [বাংলা ট্রিবিউন, ৩০ অক্টোবর]

*    যে গল্পটা ফারুকী বলার চেষ্টা করেছেন, সেটা যে হুমায়ূনের জীবন থেকে নেননি, সেটা হলফ করে বলতে পারবেন না তিনি। কাজেই অযথা বিতর্ক তৈরি না করে বললেই পারতেন, কথাসাহিত্যিকের জীবন থেকেই পেয়েছেন তিনি এই গল্পের প্লট।
বিধান রিবেরু, সমালোচক [এনটিভি অনলাইন, ৩০ অক্টোবর]

*    ক্যামেরার ফ্রেমের ভেতরে কিছু ঘটছে, ফ্রেমের বাইরেও কম কিছু ঘটেনি। কখনো কখনো জরুরি বিষয়গুলোই পরিচালক ফ্রেমের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন...ঘটনা বর্ণনায় ক্ষুদ্রর আড়ালে বৃহেক পাঠিয়ে দেওয়ার এই কারসাজি দর্শকের চলচ্চিত্র দেখার চেনা চোখে বিভ্রম তৈরি করে। গল্প বলার এই ভঙ্গি, গড় দর্শকের পছন্দ হবে না হয়তো।

*    সবটা না জানলেও আমরা সবচেয়ে বেশি জেনেছি জাভেদের পয়েন্ট অব ভিউ, সাবেরী আর মায়ার পারস্পেক্টিভও কিছুটা ধরতে পারা যায়। কিন্তু নীতুর পারস্পেক্টিভ অনুপস্থিত। নীতু কেন শৈশবের বান্ধবীর বাবার প্রতি আকৃষ্ট হলো? জাভেদ তার চলচ্চিত্রে শৈশব থেকেই সাবেরীর চেয়ে নীতুকে বেশি পরিসর দিত বলে? নীতুর অভিনয়প্রতিভার প্রতি জাভেদের আস্থায় কাবু হয়েছে সে? হতেও পারে। কিন্তু নীতু তার প্রেমে বেয়াড়া, ফিল্ম সিটির দেয়াল টপকে সে জাভেদের কাছে যায়, রাত্রি যাপন করে। নীতু সিগারেটের মতোই জাভেদের সঙ্গে জীবন শেয়ার করতে চেয়েছে। কিন্তু সাবেরীর দৃষ্টিতে নীতু ছোটবেলা থেকেই সব সময় সাবেরীকে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছে, জাভেদের কাছেও মেয়ের সমান আদর চেয়েছে, তা সম্ভব নয় জেনে বউ হয়ে সাবেরীকে হারিয়ে দিয়েছে। নীতু তাই শেষ পর্যন্ত কাহিনিতে দ্বন্দ্ব বা ক্লাইমেক্স তৈরির উপাদান হিসেবেই    থেকে গেছে।
ফাহমিদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চলচ্চিত্র গবেষক [এনটিভি অনলাইন, ৩১ অক্টোবর]

*    বাংলা ছায়াছবির অল্প কিছু দেখার অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করতে পারি না আর কোনো দৃশ্য নির্মাতা/কাহিনি বলিয়ে এত টুকরো টুকরো করে কোনো কিছু বলতে এসেছেন আমাদের। এটা সফল-বিফল বলার লোক আমি নই। কিন্তু এই ফ্যাগমেন্টেড দৃশ্য/গল্প নির্মাতা তরফে নৈর্লিপ্তির মুড আনবার মুখ্য পদ্ধতি বলে আমার মনে হয়েছে। ছবির বাজার ভাবলে অতিসাহসী এক পদক্ষেপ, নজিরবিহীন প্রায় তো বটেই।

*    এটা প্রায় না বলতে চাওয়া কথার মতো একটা ছবি। নিস্পৃহ, নির্লিপ্ত, এমনকি অনীহ ভঙ্গিতে গল্প করার মতো। টুকরো টুকরো কথা, টুকরো টুকরো ছবি, যেন কোনো স্টেটমেন্ট নেই নির্মাতার। এই যে নির্মাতার যেন কোনো স্টেটমেন্ট/বলার মতো গল্প/প্রচার করার মতো ‘বার্তা’ বা ‘দর্শন’ নেই, সেটা একটা প্রবণতা হিসেবে খুব সচরাচর ঘটে না। ছবির শৈলী/ক্রাফট/দৃশ্যমালা/সংলাপ সেই ‘না চাওয়াকে’ যেন রচনা করেছে। নির্লিপ্তির শৈলী। সে জন্য ছবিটি নতুন কিসিমের।
মানস চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক [ফেসবুক, ৩১ অক্টোবর]

*    বাংলা সিনেমা ক্যামেরা দিয়ে গল্প বানাতে শিখে গেছে। সিনেমার ভাষা বোধ হয় এটাকেই বলে। প্রমাণ চান, দেখেন তো, আধাআধি পর্যন্ত ‘ডুব’ সিনেমাকে ছাপা হরফে লিখতে পারেন কি না? লিখতে যে পারছেন না বা পারলেও যে ক্লিশে হয়ে যাচ্ছে, এর কারণ এই না যে ‘ডুব’ নন-লিনিয়ার। নন-লিনিয়ার বা সরলরৈখিক নয়, এমন কাহিনি উপন্যাসে এন্তার আছে। সিনেমায়ও। তাদের লেখা যায়। সেগুলো নিশ্চয়ই ভালো ছবিও হয়। ভালো ছবি তো নানা রকম। কিন্তু সিনেভাষা আছে, অক্ষর নয়, বরং ক্যামেরা কথা বলে, দৃশ্যমানতার নিজস্ব ব্যাকরণ পাওয়া যায়, এ রকম সিনেমা বাংলাদেশে কই? কিছু কিছু চেষ্টা নানা ছবিতে আছে, কিন্তু এর একটি পূর্ণাঙ্গ এবং ম্যাচিউরড মেনিফেস্টো পাওয়া গেল ‘ডুব’ ছবিতে। বাংলাদেশের সিনেমায় এই প্রথম।
সুমন রহমান, কবি ও অধ্যাপক [প্রথম আলো, ১ নভেম্বর]

*    ছবিটা ভালো লেগেছে কি লাগেনি, কী কী ত্রুটি আছে, সেটা বের করাই সমালোচকের কাজ। ব্যক্তি ফারুকীকে আক্রমণ করার তো মানে হয় না। ছবিতে যা দেখব সেটাই সত্য, এর বাইরে কিছু নেই।

*    তসলিমা নাসরিনের রিভিউ আমি পড়েছি। আমি উনাকে পছন্দ করি, উনার লেখা পড়ি। উনি ছবির চরিত্রকে বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছেন, এটা ঠিক না।
মাহমুদা চৌধুরী, সমালোচক [এটিএন নিউজ, ২ নভেম্বর]

*    আপনি তো এক টিকিটে দুজনকে নিয়ে হলে ঢুকতে পারেন না। প্রচুর দর্শক এই কাজটা করেছেন। নিজের টিকিট কেটেছেন, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের টিকিট তো কাটেননি। যদি হুমায়ূন আহমেদকে বাইরে রেখে ছবিটা দেখতেন তাহলে আরো ভালো লাগত, মজা পেতেন। আমি হুমায়ূন আহমেদকে হলের বাইরে রেখে ঢুকতে পেরেছিলাম, যে কারণে দারুণ মজা পেয়েছি।

*    ছবিটা এত স্লো, তবু আমার কোনো সমস্যা হয়নি। কারণ প্রতিটা মুহূর্তে ছবিটা আমাকে ভাবাতে পেরেছে। এই ছবির ফ্রেমে যত গল্প বলা হয়েছে, ফ্রেমের বাইরের গল্প তার চেয়ে বেশি বলা হয়েছে।
গাউসুল আলম শাওন, চিত্রনাট্যকার [এটিএন নিউজ, ২ নভেম্বর]

*    হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় বিয়ে আইনত সিদ্ধ, ধর্মমতেও সিদ্ধ, এমনকি লিবারেল দুনিয়ার ভ্যালুজেও সিদ্ধ। কিন্তু আমাদের মিডল ক্লাস এই বিয়েকে মেনে নিতে পারল না কেন? কালচারালি আমাদের মনোজগতের ভেতরে আধুনিকতা কী রূপ নিয়ে বাস করে, সেইটা জানা-বোঝার জন্য হুমায়ূন আহমেদের এই কেস ইউনিক। ফারুকী আধুনিক হয়ে আমাদের মিডল ক্লাসের গড়ে ওঠার এই গ্যাপটা দেখিয়েছেন; তার সঙ্গে সিনেমার দারুণ ভাষায় দেখিয়েছেন এই মিডল ক্লাস ভ্যালুজ কী পরিমাণে শক্তিশালী হয়ে তার অপছন্দের প্র্যাকটিসের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হতে পারে। এইটা সিনেমার দ্বিতীয় মুনিশয়ানা।
পিনাকী ভট্টাচার্য্য, ব্লগার, লেখক [ফেসবুক, ২ অক্টোবর]

*    ফারুকী কোনো ডকুমেন্টারি বা প্রোপাগান্ডা করেন নাই, তিনি যা এখন ঘটে বা ঘটছে সেটাই দেখাতে চেয়েছেন। নিঃসঙ্গতা তাঁর ছবির পরতে পরতে। কে ভালো কে মন্দ সেটা নয়, বরং একজন মানুষের জীবন কিভাবে অন্যের বিচারবুদ্ধির বাটখারায় সারাক্ষণ পরিমাপের মধ্যে থাকে সেটা এই ছবি দেখলে বোঝা যায়।

*    আগের ফারুকীর সঙ্গে এই ফারুকীর কোনো মিল নাই। এই ছবিটা ধীরগতির, কারণ বিষাদের গতি এর চেয়ে বেশি হয় না।

*    ফারুকী দর্শকের মেধা ও কল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ছবিতে তিনি পুরো গল্পটা বলেন নাই। দর্শককে ভাবতে বলেছেন। দর্শক নিজে হলে বসে নিজের মেধা ও বিবেচনা, শিল্পবোধ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে ছবিটিকে নির্মাণ করেন। ছবি শেষ করে ছবিটি নিয়ে ভাবেন। মেধাবী দর্শকের সাথে এই গল্পের একটা যোগাযোগ বা সম্পর্ক, অংশগ্রহণের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।
আব্দুন নূর তুষার, উপস্থাপক, চিকিত্সক ও বিতার্কিক [ফেসবুক, ৩ নভেম্বর]

*    সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখুন, অন্যের চিবিয়ে দেওয়া খাবার নয়, বরং নিজে খেয়ে স্বাদ নিন। তিতা হলেও নিজের স্বাদ নিজে বুঝুন। অন্যের চিবিয়ে দেওয়া খাবার স্বাদহীন হতে বাধ্য।
বন্যা মির্জা, অভিনেত্রী [ফেসবুক, ৩ নভেম্বর]

ফারুকীর আত্মপক্ষ সমর্থন

*    পৃথিবীতে এমন কোনো গান নাই, যেটা সকল মানুষের ভালো লাগবে। সিনেমার কথাই যদি বলি, শাকিব খানের ছবির কথাই যদি বলি, সেটাও কি সব শ্রেণির দর্শক দেখেন? কোনো ছবির ক্ষেত্রেই এটা সম্ভব না। ফিল্মমেকাররা এখানে অসহায়। একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শক টার্গেট করে ছবি বানানোটাও মুশকিল। ছোটবেলায় কবিতা পড়েছিলাম, ‘অ্যারো অ্যান্ড দ্য সং’। লাইনগুলো মনে নেই, বিষয়বস্তু অনেকটা এমন, ‘একটা তীর আমি ছুড়ে দেই কবে কোথায় সেটা কোন ওক গাছে বিদ্ধ হবে, যে তীর ছোড়ে সে জানেও না।’ সিনেমা অনেকটা এ রকমই। আমি তীর ছুড়েছি, কোন দর্শক বিদ্ধ হবেন আর কে বিদ্ধ হবেন না আমি জানি না। যাঁরা বিদ্ধ হন না, তাঁদের কাছে আমরা অসহায়, এখানে প্রতিক্রিয়া জানানোরও কিছু নাই।

*    ‘ব্যাচেলর’ থেকে ‘ডুব’—আমার সব ছবির ক্ষেত্রেই ওপিনিয়ন ওয়াজ ডিভাইডেড। আমি এটাকে স্বাস্থ্যকর মনে করি। সমালোচনা হবে, পক্ষে-বিপক্ষে কথা হবে—এটা স্বাভাবিক।

*    বায়োপিক নয় ‘ডুব’। কারণ বায়োপিকে দর্শক সত্য প্রত্যাশা করে। আমার ছবির গল্পে যা ঘটেছে তা সত্যিই ঘটেছে কি না তার নিশ্চয়তা তো আমি দিতে পারব না। আর গল্পটা হুমায়ূন আহমেদের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত কি না, সেটা দর্শক ছবিটা দেখলেই বুঝতে পারবেন। দর্শকের কাছে যদি মনে হয় অনুপ্রাণিত তাহলে তা-ই, অনুপ্রাণিত মনে না হলেও তা-ই। আমার হাতে যদি ক্ষমতা থাকত, তাহলে আমি চাইতাম না হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে এই ছবির গল্পের মিল আছে কি না তা নিয়ে আলোচনা হোক।

*    সাধারণত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সমালোচকরা আমার ছবির খুব একটা প্রশংসা করেন না। পারতপক্ষে আমাকে আলোচনায়ও আনতে চাইতেন না। কিন্তু ‘ডুব’ এই দেশের বেশির ভাগ সমালোচকের প্রশংসা পেয়েছে। অনেকের রিভিউ পড়েই আমি আনন্দিত হয়েছি। আবার সাধারণ দর্শকও তাঁর মন্তব্য রাখবেন। ফেসবুকে অনেকেই তাঁদের ভালো লাগা মন্দ লাগা জানিয়েছেন, তিনি ক্রিটিক কি ক্রিটিক নন সেটা বিবেচ্য বিষয় না। ফেসবুকের এই যুগে এটাই রিয়ালিটি। এটা অস্বাভাবিক কিছু না।

*    নীতু চরিত্রটিকে নেগেটিভ বলছেন অনেকে। বিশেষ করে নারীবাদীদের কেউ কেউ এমনটা বলছেন। অনেক অভিযোগ, ও দেয়াল টপকে প্রেম করতে যায়, ও লোভী। আমি জানি না, কোথায় লোভী মনে হচ্ছে! ও ছোটবেলা থেকেই জাভেদ হাসানের ছবিতে অভিনয় করতে চায়, এখানে লোভের কী আছে! আমাকে যদি বলা হয় স্টিভেন স্পিলবার্গের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আর এখানকার ছোট একটা প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করতে, আমি অবশ্যই স্পিলবার্গের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চাইব। দেয়াল টপকানো প্রসঙ্গে বলি, আমার সঙ্গে যদি কেউ পরকীয়া করতে আসেন তিনি কি আমার ড্রয়িংরুমে বসে প্রেম করবেন? তিশা নাশতা এনে দেবে আর আমরা বসে বসে প্রেম করব, এটা হয় নাকি! যেহেতু আমি একটা সম্পর্কের বেড়ার মধ্যে আছি, যিনি পরকীয়া করতে আসবেন তাঁকে বেড়াটা ডিঙিয়েই আসতে হবে। বেড়া ডিঙিয়ে আসছে বলেই মেয়েটা খারাপ, আমি তো এই জাজমেন্টে যাচ্ছি না। বরং আপনি এটা কেন দেখছেন না, জাভেদ হাসান তো দরজাটা খুলে দিচ্ছেন। ইতস্তত বোধ করছেন এগোতে, সিগারেটের মাধ্যমে একটা ব্রিজ তৈরির চেষ্টা, একবার তুমি টানো একবার আমি টানি, এভাবেই দুজনের স্পর্শ হচ্ছে।

*    অনেকেই বলছেন, ছবিতে জাভেদ হাসানকে সাবেরী বলছে নীতুকে নিয়ে, ‘ও সারা জীবন আমার সঙ্গে কম্পিট করেছে। ও একজন অ্যাটেনশন সিকার। অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য আজকে তোমাকে বিয়ে করেছে।’ এটা তো সাবেরীর ভাষ্য। সাবেরীর আন্ডারস্ট্যান্ডিং অব দ্য সিচুয়েশন। ফিল্মমেকার হিসেবে আমাকে বায়াসড বলা যাবে, যদি নিতুর আন্ডারস্ট্যান্ডিং অব দ্য সিচুয়েশন না দেখাই। এই দৃশ্যের পরই নিতু রান্নাঘর থেকে বলছে, ‘আমার জীবনের দুঃখ হচ্ছে, আমি এমন একজন মানুষের সঙ্গে ঘর করে যাব আজীবন, যে মানুষটা এমন এক মেয়ের জন্য কাঁদবে, যে মেয়েটা সারা জীবন আমাকে ঘৃণা করে যাবে।’ তার একটু পরে জাভেদকে নীতু বলে, ‘ডু আই রিয়ালি ডিজার্ব ইট!’ এটা নীতুর আন্ডারস্ট্যান্ডিং অব দ্য সিচুয়েশন। ফিল্মমেকার হিসেবে আমার কাজ প্রতিটা চরিত্রের অবস্থান তুলে ধরা।

*    কোনো চরিত্র কম দেখানো বা বেশি দেখানো প্রসঙ্গে বলি, গল্প যিনি তৈরি করেন তাঁর একটা অভীষ্ট লক্ষ্য থাকে। আমার গল্পের মূল লেয়ার বাবা-মেয়ের সম্পর্ক। তার নিচের লেয়ারে আছে প্রথম স্ত্রীর স্বামীকে হারিয়ে ফেলা এবং তার নিচের লেয়ারে দুই বান্ধবীর প্রতিযোগিতা। অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে আমাকে যা করতে হতো তা-ই করেছি।

*    অনেকে বলছেন, সাবেরী ও মায়ার সঙ্গে জাভেদের যতটা ঘনিষ্ঠতা দেখানো হয়েছে, নীতুকে নিয়ে সেভাবে ইমোশনাল কোনো সিন দেখানো হয়নি। আমার কাছে মনে হয়, নীতু ইজ নট লুজার, শি ইজ দ্য উইনার। জাভেদকে নীতু পেয়েছে জীবনে, সাবেরী ও মায়া হারিয়েছে জাভেদকে। আমার গল্পটা হচ্ছে, সাবেরী ও মায়ার জাভেদকে হারিয়ে ফেলা অথবা সাবেরী ও মায়াকে জাভেদের হারিয়ে ফেলার গল্প। এবং মৃত্যুর মাধ্যমে তারা কিভাবে একজন আরেকজনকে ফিরে পায়, সেই গল্প।
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী [এটিএন নিউজে প্রচার, ২ নভেম্বর]

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com