logo
আপডেট : ২৩ নভেম্বর, ২০১৭ ১৪:৫৬
যা বললেন আদোনিস, বেন ওকরি ও অন্যরা
অদিতি ফাল্গুনী

যা বললেন আদোনিস, বেন ওকরি ও অন্যরা

আদোনিস কবি (সিরিয়া)

গত ১৬ থেকে ১৮ নভেম্বর প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো ‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৭’। বাংলা ও ইংরেজিতে অজস্র গুরুত্ববহ সেশন বা অধিবেশনের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ বা পাদপ্রদীপের আলো কেড়ে নিয়েছেন বেশ কিছু দশক ধরে প্যারিসে বসবাসকারী আরবি ভাষার কবি আদোনিস  ও লন্ডনে বসবাসরত বুকারজয়ী নাইজেরীয় কথাশিল্পী বেন ওকরি। কালের কণ্ঠে লিট ফেস্ট নিয়ে এই আয়োজনে উপরোক্ত দুই তারকা কবি ও লেখকের বক্তব্যের সারাংশ ছাড়াও আরো কিছু অধিবেশনের সারাংশ পাঠকদের জন্য এখানে উপস্থাপন করা হলো :

আদোনিস : মুক্তচিন্তা, সুফিবাদ ও পরাবাস্তববাদ

ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিন শুরুতে দুপুর সোয়া ১২টায় সিরিয়ার এই কবির অধিবেশন হওয়ার কথা থাকলেও অধিবেশন পিছিয়েছিল দুপুর সোয়া ২টায়। বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে কবি ও অনুবাদক কায়সার হকের সঞ্চালনা এবং ফরাসি ভাষার শিক্ষক কাজি আশরাফ উদ্দিনের ফরাসি থেকে ইংরেজি অনুবাদে আদোনিসের কথোপকথন শোনার সুযোগ হয় ঢাকাবাসীর।

আলী আহমেদ সাঈদ থেকে আদোনিস হয়ে ওঠার গল্প বলেন আদোনিস নিজেই। জন্ম সিরিয়ার এক গ্রামে। শৈশবের পড়াশোনা কুত্তাব বা মক্তবে। ‘কফিহাউসের সেই আড্ডা’র অমলের মতোই শুরুতে আদোনিসেরও ‘একটা কবিতা তার হলো না কোথাও ছাপা/পেল না তো প্রতিভার দাম তার’ হাল হয়েছিল। এরপর আদোনিস নামে কলমি নাম গ্রহণের পর কবিতা ছাপা হতে শুরু করে।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি সিরিয়ান সোশ্যাল ন্যাশনালিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। পরে সে জন্য তাঁকে জেলেও যেতে হয়। তাই কবিতার মুক্ত অনুশীলনের জন্য পাড়ি জমান লেবাননে। সেখান থেকেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই। তবে নিজের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে অবশ্য মনে করেন ‘দ্য সংস অব মিহিয়ার অব দামাস্কাস’কে।

‘কোরআনের মতো মহা ন্যারেটিভকে মধ্যমেধা দিয়ে বিশ্লেষণ করতে গেলে যে সমস্যা হয়, তা-ই হয়েছে,’ বলেন আদোনিস। তবে আদোনিস ও তাঁর লেখক বন্ধুরা মিলে মাজালস্নাত শির নামে একটি প্রকল্পের আওতায় কোরআনসহ মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ববহ সব প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বই ও সাহিত্যিক কাজের নতুন পাঠ ও বিশ্লেষণ করছেন বলে জানান। এই কাজ করতে গিয়ে উগ্রবাদীদের কাছ থেকে নানা হুমকি পেতে হয়েছে বলেও তিনি জানান। তিনি আরো বলেন যে অনেক ধ্রুপদি আরব কবিই কট্টর মুসলিম ছিলেন না; যেমন বহু ইউরোপীয় বা বিশেষত ফরাসি কবি কোনো দিনই কট্টর ক্যাথলিক ছিলেন না।

আদোনিস সুফিবাদকে তুলনা করেন পরাবাস্তববাদের সঙ্গে। সুফিবাদের রহস্য বা অতীন্দ্রিয়বাদ যেন পরাবাস্তববাদী ঐতিহ্যের সমতুল্য। আদোনিস আরো বলেন যে পশ্চিমের শৈল্পিক আধিপত্যের এক সৃষ্টি হলো পরাবাস্তববাদ।

পৃথিবীকে ফুল এবং কবিতাকে সেই ফুলের সুগন্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেন আদোনিস। আজকের আরববিশ্বে কোনো বড় কবি নেই বলে তিনি দুঃখ করেন; যেমনটি ছিল প্রাচীন বা মধ্যযুগে। নিজেকে তিনি আজও সমাজতন্ত্রী বলে মনে করেন, যেহেতু সমাজতন্ত্র মানুষের সমতার কথা বলে। আমেরিকান বস্তুবাদকে তিনি অপছন্দ করেন এবং আল-কায়েদা বা দায়েশকে পশ্চিমের ক্ষতিকর সৃষ্টি বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, রাজনীতি ও বিশ্বাস আলাদা হতে হবে।

আদোনিস আরো বলেন, ‘আরববিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো সেখানে ধর্ম আর রাজনীতিকে অভিন্ন করে রাখা হয়েছে। ফলে একটির দুর্বৃত্তায়নে দুটিই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ দেশ ও ধর্ম আলাদা সত্তা হিসেবে টিকে থাকা উচিত। আর রাষ্ট্রের যে সমাজকাঠামো, তার ভিত্তি হওয়া উচিত মানবাধিকার, স্বাধীনতার চেতনা ও নারীর স্বাধীনতা।’

আজকের প্রজন্ম কেমন পড়াশোনা করছে—এই প্রশ্নে আদোনিস অবশ্য বলেন যে আজকের প্রজন্ম আগের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বিচিত্রতর নানা বিষয়ে পড়ছে।

কী বললেন বেন ওকরি?
বেন ওকরি কথাসাহিত্যিক (নাইজেরিয়া)
১৭ নভেম্বর শুক্রবার দুপুর সোয়া ৩টা থেকে সোয়া ৪টা পর্যন্ত সেশনে গোয়ানিজ লেখক জেরি পিন্টোর সঙ্গে নিজ জীবনের সেরা কাজ ‘দ্য ফ্যামিশড রোড’ নিয়ে কথা বলেন তিনি।

‘নাইজেরিয়া বা আফ্রিকায় জীবন এত কঠিন আর শিশুরা জন্মেই এত দ্রুত মারা যায় বা শিশুমৃত্যুর হার এত বেশি যে বোধ করি সেখান থেকেই আবিকু বা স্পিরিট চাইল্ডের বিষয়টি আমাদের লোকবিশ্বাসে এত দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। একটি শিশু জন্মালেই সবাই ভয় পেতে থাকে, না জানি কবে মারা যায়! বুঝি শিশুটিকে আবার ওই অন্য ভুবনে চলে যেতে হবে, যেখান থেকে সে এসেছে।’

বেন বলেন, প্রত্যেক নাইজেরীয়র থাকে একটি বিশেষ পাথর, যা সে অন্য ভুবন থেকে নিয়ে এসেছে বলে মনে করা হয়। সেই পাথর তাকে রক্ষা করে বা করবে বলে মনে করা হয়। যেমন—কেউ ব্যবহার করে ‘মুনস্টোন’, কেউ বা অন্য কোনো পাথর। এই সব লোকবিশ্বাসই ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভাব, অবিশ্বাস্য সামাজিক-রাজনৈতিক কারণ থেকে উদ্ভূত—জাদু বা নানা তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে মানুষ ভুলে থাকতে চায় কঠোর বাস্তবতা। সে টিকে থাকার কৌশল উদ্ভাবন করে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে।

তবে একই সঙ্গে জীবন খুব সুন্দর ও রহস্যময়। সব লেখকেরই উচিত সেই রহস্য ও জাদুকে উদ্ভাবন করা।

তরুণ লেখকদের তিনি উপদেশ দেন, ‘গল্পটা কী হবে তার চেয়ে জরুরি গল্পটা বলার কৌশল কী হবে সেটা জানা। নতুন কৌশল তৈরি করা।’

হাসতে হাসতে বলেন, প্রথম উপন্যাস লিখেছিলেন মাত্র ১২ বছর বয়সে এবং সেটা চীন নিয়ে।

“এটা একটা বাজে কথা যে যা জানো শুধু তা নিয়েই লেখো। আমি বলি উল্টো। যা জানো না তা নিয়েই লেখো। কাফকা কোনো দিন আমেরিকা না গিয়েই ‘আমেরিকা’ নামের উপন্যাস লিখেছিলেন।”

সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ও নিপীড়িত রোহিঙ্গা নারীদের নিয়ে কবি ও কথাশিল্পী বেন ওকরি কোনো কবিতা লিখবেন কি না—এক নারী শ্রোতার এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে প্রশ্নকারিনীর সামনে মঞ্চে হেঁটে গিয়ে বলেন, ‘কবিরা অনেক সময় নানা নিপীড়নের ঘটনায় সঙ্গে সঙ্গে লিখতে পারে না। তারা এত সংবেদী যে কান্না তাদের গলার স্বর কিছু সময়ের জন্য হলেও রুদ্ধ করে দেয়। তবে আপনাকে বলি, এই যে এত সংবেদী মন আপনার, এ তো কবির মন। এই যে কান্না আপনার ভেতর থেকে উঠে আসছে, হতে পারে আপনিই এ বিষয়ে কবিতা লেখার জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি।’

সঞ্চালক জেরি পিন্টো একসময় ঠাট্টা করে বলেন, “তোমার উপন্যাস ‘দ্য ফ্যামিশড রোড’-এর নায়ক অ্যাজারোকে প্রায়ই তো আত্মা ভুবনের আত্মারা এসে মাঝে মাঝে এই মরজগত্ থেকে পারলে নিয়ে যায়। মানে তোমাকেই হয়তো নিয়ে গেছে শৈশবে। তা এমন তুমি কতবার গেছ এবং ফিরে এসেছ? কতবার জন্মান্তর হয়েছে তোমার?”

ওকরি হাসলেন। তারপর একটু সিরিয়াস হয়ে গিয়ে বললেন, ‘আমার তো বারবার জন্মান্তর হয়। একজন লেখক বা কবি যখনই একটি বড় কাজ শেষ করেন তখন তো তাঁর এক ধরনের মৃত্যু হয়। তারপর আবার জন্ম নেন তিনি।’

কোহিনুর হীরার যত গল্প : উইলিয়াম ডালরিম্পল
বাণিজ্য প্রসারের নামে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক দেশগুলো যেসব দেশকে উপনিবেশ বানিয়েছিল, সেখানকার ধনসম্পদ তারা নিয়ে গিয়েছিল নিজেদের দেশে। ১৮৫১ সালে লন্ডনের গ্রেট এক্সিবিশনে ব্রিটিশদের নিয়ে যাওয়া সেসব সম্পদের অনেকগুলো প্রদর্শিত হয়। তার মধ্যে একটি ছিল ভারতের কোহিনুর হীরা। তিন দিনব্যাপী ঢাকা লিট ফেস্টের শেষ দিন কোহিনুরের কিংবদন্তি শোনালেন স্কটিশ ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডালরিম্পল।

নারী, শিল্প ও রাজনীতি

টিলডা সুইনটন অস্কারজয়ী ব্রিটিশ অভিনেত্রী
ব্রিটিশ অভিনেত্রী ও সাহিত্যিক এসথার ফ্রয়েড, ভারতীয় অভিনেত্রী নন্দনা সেন, অস্ট্রেলিয়ার লেখক বিগোয়া চোয়ল এবং বাংলাদেশি লেখক সাদাফ সায্ সিদ্দিকী ‘নারী শিল্প ও রাজনীতি’ নিয়ে এক আলাপে বসেন। সঞ্চালনায় ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক বি রাওলাট। নারী শিল্পী ও সাহিত্যিক হিসেবে অসহিষ্ণুতা ও সন্ত্রাসের পরিস্থিতিগুলো কিভাবে সামনে হাজির হয়, নিজ নিজ দেশের প্রেক্ষাপটে তা তুলে ধরেন বক্তারা।

বক্তারা বলেন যে নারীকে শুধুই ‘যৌন বস্তু’ হিসেবে না দেখে দেখা উচিত ‘মানুষ’ হিসেবে। মৌলবাদ ও উগ্রবাদের আঙ্গিকে ঘৃণা আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বলে ‘মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ মুখপাত্রের ঘোষণায় বলা হয়েছে। যেকোনো শৈল্পিক কাজের তা বিরোধী। পৃথিবীব্যপী মূলধারার রাজনীতিতে সাংস্কৃতিক, গণযোগাযোগ ও রাজনৈতিক পরিসরে মৌলবাদের ভুক্তি নারী, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী তথা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও মতের ভিন্নতার প্রতি হুমকি হয়ে উঠেছে।

বলশেভিক বিপ্লব ও বেলফোর চুক্তির ১০০ বছর

আজ থেকে ১০০ বছর আগে পৃথিবীর বুকে সংঘটিত হয়েছিল বলশেভিক বিপ্লব। রুশ বিপ্লবের ৭০ বছরের মাথায় সোভিয়েত ইউনিয়নসহ গোটা পূর্ব ইউরোপীয় ব্লকের পতন ঘটে। চীনে আজ যে সমাজতন্ত্র প্রচলিত, তা ঠিক সমাজতন্ত্র নয়। কিউবা বা উত্তর কোরিয়া কত দিন থাকবে? অন্যদিকে ১৯১৮ সালেই গৃহীত হয়েছিল ‘বেলফোর ঘোষণা’। শতকের পর শতক ধরে নিপীড়িত ইহুদিদের জন্য একটি নিজস্ব আবাসভূম খোঁজার কাজে আবার উদ্বাস্তু হতে হয় অসংখ্য ফিলিস্তিনিকে। বিশ্বের এই গুরুত্ববহ দুই রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেন বি রাওলাটের সঞ্চালনায় ডমিনিক জিগলার, কে নাবিল আহমেদ (সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ), লয়েড প্যারিসহ দেশের একাধিক বিদেশি সাংবাদিক ও লেখক।

কথায় পাঠে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা

ডটারস অব জোড়াসাঁকো বইটি নিয়ে আলোচনা করেন বইটির লেখক অরুণা চক্রবর্তী। ঠাকুরবাড়ির নারীদের নিয়ে বলতে গিয়ে বললেন রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবনের ব্যর্থতার কথা। অরুণা বলেন, রবীন্দ্রনাথ কবি হিসেবে যতটা সফল, বাবা হিসেবে ততটাই ব্যর্থ। তবে মেয়েদের জন্য তাঁর ভালোবাসার কমতি ছিল না।

প্রামাণ্যচিত্রে জন বার্জারের জীবন

অস্কারজয়ী ব্রিটিশ অভিনেত্রী টিলডা সুইনটন পরিচালিত ছবি ‘দ্য সিজনস ইন কান্সি : ফোর পোর্ট্রেটস অব জন বার্জার’। বুকারজয়ী ব্রিটিশ সাহিত্যিক ও শিল্প সমালোচক জন বার্জারের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রটি। প্রদর্শনের আগে জন বার্জার সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু কথা বলেন টিলডা। পাঠ করেন বার্জারের লেখা ও ভাষণ থেকে কিছু অংশ।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com