logo
আপডেট : ১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ২৩:৫৮
শতবর্ষ উদ্‌যাপন
পুরানো সেই দিনের কথা ...

পুরানো সেই দিনের কথা ...

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের ঐতিহ্যবাহী রায়বাহাদুর শ্রীনাথ ইনস্টিটিউশনের শতবর্ষ পূর্তির অনুষ্ঠানে গতকাল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে প্রাক্তন শিক্ষার্থীর মিলনমেলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়।/ও সেই চোখে দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।/আয় আর একটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়।/মোরা সুখের দুখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়।/...হায় মাঝে হল ছাড়াছাড়ি, গেলেম কে কোথায়—/আবার দেখা যদি হল, সখা, প্রাণের মাঝে আয়।’

শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ ‘রায়বাহাদুর শ্রীনাথ ইনস্টিটিউশন’ অঙ্গনজুড়ে গতকাল শুক্রবার যেন হৃদয়ে হৃদয়ে নীরবে বেজেছে কবিগুরুর গানের কথাগুলো। বিদ্যাপীঠের শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত মিলনমেলায় প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন সেই পুরনো দিনের স্মৃতিতে। খুঁজে ফিরেছেন এখানে শিক্ষাজীবনের দিনগুলোর স্মৃতিকথা।

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার শেখরনগর ইউনিয়নের ‘রায় বাহাদুর শ্রীনাথ ইনস্টিটিউশন’ গর্বময় পথচলায় একে একে পেরিয়ে এসেছে ১০০টি বছর। সে উপলক্ষেই গতকাল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় উদ্যাপন উৎসবের। এই উৎসব ঘিরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বসেছিল নবীন-প্রবীণের মিলনমেলা।

উৎসবে শামিল হওয়া প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখন দেশ-বিদেশে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু গতকাল তাঁরা যেন ফিরে যান সেই উচ্ছল তারুণ্যভরা দিনগুলোতে। পুরনো সব বন্ধু আর সহপাঠীকে পরস্পর জড়িয়ে ধরে হয়েছেন আত্মহারা। হাতে হাত আর বুকে বুক মিলিয়ে করেছেন কুশলবিনিময়। অনেকে আবার প্রিয় সহপাঠীকে পেয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মোবাইল ক্যামেরায় নিজেদের বন্দি করেন নতুন করে। কেউ কেউ খুঁজেছেন বিদ্যালয় ভবনসংলগ্ন পশ্চিম পাশের সেই বড় গাবগাছটি। কেননা ওই গাছের ছায়াতলে সহপাঠীদের নিয়ে আড্ডা দেওয়ার সব স্মৃতিকথা ভিড় করে আছে যে মনের গভীরে।

শতবর্ষ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে শামিল হতে গতকাল দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসেন এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পেরে তাঁরা সবাই ছিলেন উচ্ছ্বসিত।

উৎসবে যোগ দিতে এসেছিলেন সুদূর ওমানের সুলতান কাবুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র প্রফেসর ড. এস এম মুজিবুর রহমান। প্রতিষ্ঠানটির ১৯৬৫ ব্যাচের এই ছাত্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘৫৫ বছর পর আজ অনেক পুরনো সহপাঠীর সঙ্গে দেখা হলো। খুব ভালো লাগছে।’

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী এই বিদ্যালয়ের ৮৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী। উৎসবে যোগ দিয়ে তিনি বললেন, ‘এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমি বেশি আনন্দিত, উদ্বেলিত। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছি। কিন্তু এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার জড়িয়ে থাকার স্মৃতি ভোলার নয়। আজ অনেক পুরনো মুখ, পুরনো স্মৃতি খুঁজে পেয়েছি। এমন পাওয়া আর কোথাও মিলবে না। আমার সঙ্গে স্ত্রী-সন্তানরাও এসেছে। ওরাও এই স্মৃতি মনে ধারণ করবে অনেক দিন।’

প্রতিষ্ঠানের ৭৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. নাসিরুল আলম পলাশ এই উৎসব আয়োজকদের অন্যতম একজন। তিনি বললেন, ‘আমাদের সময়ে নৌকায় করে চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে এসে শিক্ষাগ্রহণ করতাম। সেই সময়েও বিদ্যালয়ে পাকা ভবন ছিল। সেই ভবন আজও আছে। তবে পরিবর্তন এসেছে প্রাক্তন ছাত্রদের মাঝে। তারা আজ অনেক ভালো আছে। ভালো সব প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে, হয়েছে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।’

দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আল মুসলিম গ্রুপের চেয়ারম্যান সরকারের সিআইপি খ্যাত শেখ মো. আব্দুল্লাহ এই বিদ্যালয়েরই প্রাক্তন ছাত্র। তিনি বিদ্যালয় ভবনসংলগ্ন গাবগাছের সঙ্গে তাঁর জড়িয়ে থাকা স্মৃতির কথা বারবার স্মরণ করছিলেন। এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তাঁর ছোট ভাই এস এম আমজাদ হোসেন বলেন, ‘হারানো জিনিস যেন নতুন করে পেয়েছি। এটি অনেক মূল্যবান। এত দিন পর ফিরে পেয়ে বেশ আনন্দ লাগছে।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে এসেছিলেন সরকারের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সচিব আকতারী মমতাজ। তিনি বলেন, শত বছরের পুরনো এই বিদ্যাপীঠ মনে করিয়ে দেয় সেই সময় থেকেই এটি এই এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে অগ্রসর ভূমিকায় ছিল। মানুষের উন্নত সুযোগের জন্যই রায় বাহাদুর শ্রীনাথ এ প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন। তিনি এই বিদ্যালয়ের ছাত্রী না হলেও পাশের শ্রীনগর উপজেলায় তাঁর দাদাবাড়ি। আর নানাবাড়ি এ উপজেলায়ই।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও গ্র্যাজুয়েট কলেজ উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক মো. হাহিয়াত হোসেন এই বিদ্যাপীঠের ৭৭ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। তিনি বললেন, ‘বিদ্যালয়ে ভর্তি ও বিদায়ের সময়টিকে আজ খুব মনে পড়ে।’ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. খন্দকার সাব্বির আহমেদ। তাঁর বাবা পুলিশের সাবেক আইজি এ আর খন্দকার ছিলেন এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। তাঁর দাদাও ছিলেন এই বিদ্যালয়ের একসময়ের প্রধান শিক্ষক। তাই আমন্ত্রণ পেয়েই বাপ-দাদার স্মৃতিজড়িত সেই বিদ্যালয়ের শতবর্ষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চলে এসেছেন।

জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বক্তব্যদানকালে বিদ্যালয়টির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, বিদ্যালয়টি শুধু শিক্ষায় নয়, খেলাধুলায়ও বেশ ভালো।

সিরাজদিখান উপজেলা চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শত বছরের পুরনো এই বিদ্যাপীঠের অনেক ঐতিহ্য রয়েছে। বিদ্যালয়টি পড়ালেখায় সব সময়ই ভালো। এমন একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পেরে আমি ধন্য।’

এ ছাড়া এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হতে পেরে গর্ব ও আনন্দ প্রকাশ করেন ৬৯ ব্যাচের ছাত্র ও জেলা পরিষদ সদস্য ইকবাল হোসেন, ৭৭ ব্যাচের আনোয়ার হোসেন বেলু, আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ৮১ ব্যাচের মো. কামরুজ্জামান, ৮৫ ব্যাচের মো. ইউসুফ. ২০১২ ব্যাচের জয়া পাল, ২০১৬ ব্যাচের সাদিয়া সুলতানাসহ অনেকে। বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে নবম শ্রেণির কেয়া আক্তার ও মীম আক্তার, দশম শ্রেণির মাহিমা আক্তারসহ অনেকেই এমন অনুষ্ঠানের অংশীদার হতে পেরে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিশ্বনাথ তালুকদার বলেন, ‘আমি ধন্য, গর্বিত। কারণ এই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে এই প্রতিষ্ঠানেরই আজ প্রধান শিক্ষক আমি। প্রতিষ্ঠানের অতীত ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘১৯১৮ সালের ১ জানুয়ারি এই বিদ্যালয় পাঠদান শুরু করেছিল কলকাতা ইউনিভার্সিটির অনুমোদনক্রমে। ১৪ বছর নিরলস পথচলার পর বিদ্যালয়টি কলকাতা ইউনিভার্সিটির স্থায়ী অনুমোদন লাভ করে। প্রাচীন ও উর্বর এই জনপদে সমাজসেবক ও দানবীর রায় বাহাদুর শ্রীনাথ রায় চৌধুরী বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন।’

বিদ্যালয়টির কো-চেয়ারম্যান ও শতবর্ষ উদ্যাপন কমিটির অন্যতম আয়োজক আনোয়ার হোসেন বেলু জানান, সকাল ১১টায় বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে অতিথিরা দুই দিনব্যাপী ‘গৌরবোজ্জ্বল শত বর্ষপূর্তি ও মিলনমেলা’ শীর্ষক শতবর্ষ উদ্যাপন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। এর অংশ হিসেবে গতকাল সন্ধ্যায় আয়োজিত মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেশের খ্যাতিমান শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। আজ শনিবার সমাপনী দিনে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. আক্তারুজ্জামানের।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com