logo
আপডেট : ১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০৭
অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতায় দাবি জোরালো তুষারের

অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতায় দাবি জোরালো তুষারের

ওয়ানডে অভিষেক তাঁর প্রায় উনত্রিশ বছর বয়সে। আর টেস্ট অভিষেক ত্রিশ পেরোনোর পর। ৭৯ টেস্টে ৬২৩৫ রান করেছেন ১৯ সেঞ্চুরি ও ২৯টি হাফ সেঞ্চুরির মালায়; ৫১.৫২ গড়ে। ওয়ানডের সাফল্যও চোখ ধাঁধানো। ১৮৫ ম্যাচে তিন সেঞ্চুরি, ৩৯ হাফ সেঞ্চুরিতে ৪৮.১৫ গড়ে করেন ৫৪৪২ রান। কত কত ম্যাচ যে জিতিয়েছেন অস্ট্রেলিয়াকে! ব্যাটসম্যানের নাম মাইক হাসি।

এই ব্যাটসম্যান এই উপমহাদেশের। যেখানে ত্রিশ পেরোনোর পর ‘গেল গেল’ রব ওঠে, সেই অঞ্চলের। এই ব্যাটসম্যানের অভিষেক ২৬ বছর বয়সেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পায়ের নিচে শক্ত মাটি খুঁজে পাননি। পেলেন দ্বিতীয় দফা জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তনের পর। ৩৩ থেকে ৪৩—এই দশ বছর কী সেবাই না দিয়েছেন পাকিস্তানকে! ৭৫ টেস্টে ১০ সেঞ্চুরি, ৩৯ হাফ সেঞ্চুরিতে ৪৬.৬২ গড়ে ৫২২২ রান। ১৬২ ওয়ানডেতে ৫১২২ রান; সেঞ্চুরি না পেলেও ৪২ হাফ সেঞ্চুরি রয়েছে তাঁর; গড় ৪৩.৩০। ব্যাটসম্যানের নাম মিসবাহ-উল-হক।

এই দীর্ঘ ভূমিকার উপলক্ষ বাংলাদেশ জাতীয় দল থেকে ব্রাত্য হয়ে যাওয়া কয়েক ক্রিকেটারের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। তুষার ইমরান, শাহরিয়ার নাফীস ও নাঈম ইসলামরা ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের ফল্গুধারা ছোটাচ্ছেন কয়েক মৌসুম ধরেই। ধারাবাহিকভাবে। জাতীয় দলের সম্ভাবনার দরজার কড়া নাড়তে পারছেন না তবু। যে দেশের ক্রিকেট মডেল সবার অনুসরণযোগ্য সেই অস্ট্রেলিয়া বলুন কিংবা কোনো কাঠামোর মধ্যে না থাকা পাকিস্তানের ক্রিকেট মডেল—সর্বত্রই যখন এমন ক্রিকেটারদের সুযোগ দিয়ে সাফল্য পেয়েছে, তাহলে বাংলাদেশে নয় কেন!

জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তনের চূড়াটি অনেক ওপরে সত্যি। কিন্তু ওখানে ওঠার সিঁড়িতে পা দেওয়ার দাবিটা অন্তত করতেই পারেন ওই ক্রিকেটাররা।

তুষারের ব্যাপারটি দেখুন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ১০ হাজার রানের মাইলফলকে পৌঁছেছেন। সেঞ্চুরি সংখ্যায়ও সবাইকে ছাপিয়ে; ২৮ শতরানে। দিন দুয়েক আগে প্রথম শ্রেণির ম্যাচের দুই ইনিংসেই করেছেন সেঞ্চুরি। এমনটা হয়তো ক্যারিয়ারে প্রথমবার, কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘ পরিসরের খেলায় তুষারের ধারাবাহিকতা অবিশ্বাস্য। ৩৪ পেরোনো বয়সে যা প্রায় অকল্পনীয়। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে প্রতিনিয়তই যে রং ছড়াচ্ছেন তুষার!

চলতি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিসিএল) চার ম্যাচের ছয় ইনিংসে করেছেন ৫৫৮ রান। এই ছয় ইনিংসের মধ্যে চারটিই সেঞ্চুরি, একটি ফিফটি। গড় ১১১.৬০। গতবারের বিসিএলে দক্ষিণাঞ্চলের হয়ে ছয় ম্যাচের ৯ ইনিংসে ৯১.৩৭ গড়ে তুষার করেছিলেন ৭৩১ রান। দুটি সেঞ্চুরি করেছেন, সে দুটিকেই রূপান্তর ডাবল সেঞ্চুরিতে। সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তুষারই, যেমনটা এবারও। আর ২০১৬-র বিসিএলে ছিলেন তালিকার ৯ নম্বরে। ছয় ম্যাচের ১০ ইনিংসে ৫৩.২৫ গড়ে ৪২৬ রান করে। কোনো সেঞ্চুরি করতে পারেননি, তবে হাফ সেঞ্চুরি ছিল চারটি।

ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অন্য টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ জাতীয় লিগ (এনসিএল)। সেখানেও গত দুই আসরে আলো ছড়িয়েছে তুষারের ব্যাট। সর্বশেষ এনসিএলে রান সংগ্রাহকের তালিকায় ছয় নম্বরে ছিলেন ছয় ম্যাচের ৮ ইনিংসে ৩৭৭ রান করে। একটি সেঞ্চুরি; চারটি হাফ সেঞ্চুরিতে গড় ৫৩.৮৫। এর আগেরবার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে অবস্থান চারে। ৬ ম্যাচের ৭ ইনিংসে তিন সেঞ্চুরি ও এক ফিফটিতে ৫১৮ রান করে। গড় ৮৬.৩৩।

এবার এই পাঁচটি আসরকে এক সুতোয় গেঁথে দেখুন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বশেষ পাঁচ টুর্নামেন্টে তুষার মোট ম্যাচ খেলেছেন ২৮টি। ইনিংস ৪০টি। তাতে মোট রান ২৬১০। ১০ সেঞ্চুরি ও ১২ হাফ সেঞ্চুরিতে। এই পাঁচ টুর্নামেন্টে তুষারের প্রায় ‘ব্রাডম্যানীয় গড়’—৭৬.৭৬!

বয়স ৩৪ পেরিয়ে গেছে। এই বয়সে এসে এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্স! আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক মনে হলেও তুষার ব্যাপারটিকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন, ‘আসলে ২০-২২ বছর বয়সে হাতে অনেক শটস হাতে ব্যাটসম্যানের। কিন্তু ব্যাটিংটা পরিণত হয় ৩০-এর পর। তাই হয়তো এখন এভাবে রান করতে পারছি।’ পাঁচ টেস্ট ও ৪১ ওয়ানডের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সর্বশেষটি খেলেছেন সেই ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে— ২০০৭ সালের শেষ দিনটিতে। আবার বাংলাদেশের জার্সি গায়ে চড়ানোর স্বপ্ন কি দেখেন না? তুষারের কণ্ঠে এবার খেলে যায় বিষাদ ও আশাবাদের যুগলবন্দি, ‘আমি স্বপ্ন দেখলে লাভ নেই, কারণ দল নির্বাচন আমার হাতে নেই। আমি শুধু রানই করতে পারি; সেটি করছি। বুঝি যে, জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া এ মুহূর্তে কঠিন। টেস্টে আমার পজিশনে মুশফিক-মাহমুদ উল্লাহরা খেলেন। কিন্তু ওদের তো হঠাৎ ইনজুরি হতে পারে! আমি তাই হিসাবের মধ্যে আছি জানলে ভালো লাগবে।’

সত্যিটা হলো, এত দিন হিসাবের মধ্যে ছিলেন না তুষার। কিন্তু এত ধারাবাহিক হওয়ার পর উপেক্ষার উপায়ও তো থাকে না! জাতীয় দলে ঢোকার সিঁড়ি হিসেবে পারফরমারদের ‘এ’ দলে সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানালেন প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন, “তুষার খুব ভালো খেলছে, যদিও পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে কিছুটা দুর্বলতা আছে। তবে এ পর্যায়ে এসে এত রান করাও সহজ নয়। সামনে যেহেতু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ‘এ’ দলের সিরিজ আছে, সেখানে ওকে সুযোগ দেব বলে ভাবছি।”

অমন সুযোগের অপেক্ষায় আছেন তুষারও, “যখন জাতীয় দলে খেলেছি, তখনো তো কমবার বাদ পড়িনি। প্রতিবার ‘এ’ দলে খেলে ফিরেছি আবার। এবার আবার সেই পরীক্ষা দিতে চাই। ফিটনেসে অন্য অনেকের সঙ্গে হয়তো পারব না, তবে রানে তা পুষিয়ে দেব বলে আশাবাদী।” এ ক্ষেত্রে তাঁর বাজি অভিজ্ঞতাতেই, ‘জাতীয় দলে ফিরলে জানব যে আমার পেছনে ১০ হাজার রান আছে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এত রান পেছনে থাকায় মাইক হাসি, মিসবাহরা সফল হয়েছিলেন। দূর থেকে তাঁদের অনুপ্রেরণা নিয়ে এগোচ্ছি আমি।’

সত্যি যদি ওই কিংবদন্তিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারেন তুষার, তাহলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন এক দিগন্তই হয়তো খুলে যাবে। ‘ত্রিশেই বুড়িয়ে যাওয়ার’ অপবাদ পেছন ফেলবে বাংলাদেশ। সেই শিখর জয় করতে পারুন কিংবা না পারুন, ওই সিঁড়িতে পা দেবার সুযোগটা অন্তত প্রাপ্য তুষার ইমরানের।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com