kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

নাফ নদ সাঁতরে ঢুকল ১১ রোহিঙ্গা

ভিডিওতে রাখাইনের ভয়াল ছবি

তোফায়েল আহমদ ও এস এম রানা, কক্সবাজার   

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০৫:১২



নাফ নদ সাঁতরে ঢুকল ১১ রোহিঙ্গা

নাফ নদ পাড়ি দেওয়াও সহজ নয়, নৌকা যদি মেলেও অনেক অর্থ লাগে! তাই ১১ রোহিঙ্গা আগেই জোগাড় করেছিল কনটেইনার। সঙ্গে করে বয়ে এনে কনটেইনারে করেই নাফে ভেসে পড়ে তারা।

 

গতকাল বুধবার সকাল ৭টা। মিয়ানমার প্রান্তে নাইক্ষ্যংদিয়া নামক বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ থেকে সাঁতার কাটতে নামে ওরা। লক্ষ্য টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ। টানা আড়াই ঘণ্টা সাঁতার কেটে ১১ রোহিঙ্গা নাফ নদ পাড়ি দিয়ে শাহপরীর দ্বীপ জেটি ঘাটে পৌঁছে যায়।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে আরো হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পথে রয়েছে। মোবাইল ফোনে ভিডিও কল দিয়ে সরাসরি দেখাও গেছে প্রাণভয়ে পালানোর চিত্র। ‘মিলিটারিরা নারীদের খুব জুলুম (ধর্ষণ) করছে। এই কারণে দেশ ছেড়ে যাচ্ছি। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

’ বলছিলেন একজন। এর পরই অন্য এক ব্যক্তির কণ্ঠে শোনা যায়, ‘হামিদকে ধরে নিয়ে গেছে। মুসলমান মেয়েদের জুলুম করছে। এ কারণেই আমরা চলে যাচ্ছি। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। ’ গতকাল বুধবার মোবাইল ফোনে মিয়ানমার থেকে পাঠানো একটি ভিডিও চিত্রে এসব দৃশ্য দেখা যায়।  

মঙ্গলবার ও গতকাল কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদক একাধিক ভিডিও কলে রাখাইনের একাধিক পাড়ার চিত্র দেখেছেন। এ ছাড়া রাখাইনের মংডু সুইজা দলিয়ার পাড়ার একজন রোহিঙ্গা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, তাদের পাড়ায়ও হাজারখানেক রোহিঙ্গা অপেক্ষায় রয়েছে এপারে পাড়ি দিতে। এ ছাড়া দুর্গম পাহাড়ের পথে পথে রোহিঙ্গারা অপেক্ষা করছে সংখ্যায় ভারী হওয়ার জন্য। একসঙ্গে আট-দশ হাজার হলেই দলবদ্ধভাবে এ পারে পাড়ি দিতে রওনা হবে রোহিঙ্গার দল।

ওরা ১১ জন : টেকনাফের কোস্ট গার্ড স্টেশন কমান্ডার লে. জাফর ইমাম সজীব জানান, ১১ জনের মধ্যে পাঁচজন আগে চলে এসে জেটিতে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। ছয়জন অনেক পেছনে পড়ে যায়। বয়সেও ছিল তারা কম। কোস্ট গার্ড টহলদল ছুটে গিয়ে নদের মাঝখান থেকে তাদের উদ্ধার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হলে বিজিবি যথারীতি বালুখালী শিবিরে আশ্রয়ের জন্য পাঠিয়ে দেয়।

নাফ নদে সাঁতার কেটে আসা ওরা ১১ তরুণ রাখাইন রাজ্যের বুচিদং এলাকার পুইমারি, কাইন্দাপাড়া, আজলীপাড়া, কাঞ্জমপাড়া, ইসমাঈলপাড়া, তিংদং ও হরমুরুপাড়ার বাসিন্দা। নাম ফয়েজুল ইসলাম, হামিদ হোসেন, কামাল হোসেন, মোহাম্মদ উল্লাহ, আনসার হোসেন, ইমাম হোসেন, মোহাম্মদ রিয়াদ, রমজান আলী, সৈয়দ হোসেন, মোহাম্মদ আরজ ও আবদুল মতলব। বয়স ১৫ থেকে ২৮ বছর।  

সাঁতরিয়ে আসা রোহিঙ্গা যুবক ইমাম হোসেন (২০) জানান, তাঁরা বুচিদং পুইমারি গ্রাম থেকে আট দিন হেঁটে নাফ নদ তীরের নাইক্ষ্যংদিয়া দ্বীপে এসে অপেক্ষায় থাকেন এ পারে পার হওয়ার জন্য। আসার পথে বেশ কয়েক স্থানে মিয়ানমারের সেনারা পেয়েছিল তাঁদের। সেনারা তাঁদের আসতে বারণ করেছিল। সেনারা বলেছিল—তাঁরা এলাকায় ফিরে গিয়ে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন। কিন্তু রোহিঙ্গারা সেনাদের কথায় ভরসা করতে পারেননি। সাঁতরিয়ে আসা বুচিদং কাইন্দাপাড়ার রোহিঙ্গা সৈয়দ হোসেন জানান, নাইক্ষ্যংদিয়া দ্বীপে এসে আর নৌকা পাওয়া যায় না।

টেকনাফ থানার ওসি মো. মাঈনুদ্দিন খান জানান, নাফ নদ তীরের এই দ্বীপ থেকেই গত রবিবার রাতে একটি ছোট নৌকায় ৫০-৬০ জনের রোহিঙ্গা চেপে বসে রওনা দিয়েছিল শাহপরীর দ্বীপে। নাফ নদের মোহনায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই হওয়ার কারণে সেটি ডুবে যায়। ওই নৌকাডুবিতে এ পর্যন্ত ৩০ জন রোহিঙ্গা যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়।  

ভিডিও চিত্রে রাখাইন : একটি ভিডিওতে আয়াত উল্লাহ নামের একজন যুবক জানান, বুচিদংয়ে তাঁদের পাড়ায় দিনে দুই-তিনবার মিলিটারি গাড়ি নিয়ে আসে। কোনো বাড়িতে শিক্ষিত যুবক আছে বলে সন্দেহ হলেই তল্লাশি করে। যুবকদের মধ্যে কাউকে না পেলে নারীদের হুমকি দিয়ে যায়। আর তরুণী পেলেই তাদের লাম্পট্য বাসনা জেগে ওঠে। এ কারণে পাড়ার যুবক ও যুবতীরা পালিয়ে থেকে আত্মরক্ষা করছেন।

যুবকটি আরো বলেন, ‘যদি ধরা পড়ি, নির্ঘাত মৃত্যু, তাই পালিয়ে থাকি। দিনের বেলা তো পালিয়ে থাকা যায় সহজে। রাতে কষ্ট হয়। আশপাশের পাহাড় কিংবা খালের ধারে রাতভর শুয়ে থাকতে হয়। সাপেরও ভয় আছে। ’ এক দিন তাঁর পাশ দিয়ে মিলিটারির দল হেঁটে গেছে জানিয়ে এই যুবক বলেন, ‘হায়াত ছিল বলেই বেঁচে গেছি। ক্লান্ত শরীরে পাড়ার কাছের একটি ছোট নদীর ঢালে আমরা তিনজন শুয়ে ছিলাম। ওদিক দিয়ে মিলিটারি যাবে স্বপ্নেও ভাবিনি। ’

মেয়েদের প্রকাশ্যে ‘জুলুম’ (ধর্ষণ) করে সেনারা এমন দাবি করে আয়াত উল্লাহ বলেন, ‘মেয়েদের আতঙ্কে থাকতে হয় বেশি। মিলিটারির চোখে লেগে গেলে আর রক্ষা নেই। ’ তিনি জানান, বিত্তশালীদেরও টার্গেট করেছে মিলিটারি। এখনো যেসব পাড়া পোড়ানো হয়নি, সেখানে গিয়ে বিত্তশালীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছিল মিলিটারি। এত দিন ওই সব পাড়ায় আগুন দেওয়া হয়নি। তবে এখন দেওয়া হচ্ছে।  

গতকাল সন্ধ্যায় ভিডিও কল করে রাখাইনের বুচিদং এলাকার একটি পাড়ায় এই চিত্র সরাসরি দেখা যায়। ভিডিও ধারণকারী যুবক কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘গতকাল (মঙ্গলবার) রাতে সামনের পাড়ায় (দূরে একটি পাড়ার দিকে মোবাইল স্থির করে) আগুন দিয়েছিল। ২০-৩০টি ঘর পুড়েছে বলে শুনেছি। ভয়ে আমি সেখানে যাইনি। ’ 

আরেক ভিডিও কলে কথা হয় রোহিঙ্গা মৌলভি আবদুল হান্নানের সঙ্গে। পাড়াগুলো কিছুদিন আগেও লোকারণ্য ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন পাড়ায় তিন ভাগের এক ভাগ মানুষও নেই। সবাই পালিয়েছে। আমরা এখনো যেতে পারিনি। ’ ‘মসজিদে যাচ্ছি’ বলে বিদায় নিয়ে তিনি শেষ মন্তব্য করেন, ‘আমাদের জন্য দোয়া করবেন, যেন সহি-সালামতে মরতে পারি। ’ তাঁর কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায়, এখন মিলিটারি দিনে দুই-তিনবার তল্লাশির নামে হয়রানি করছে। মেয়েদের ‘জুলুম’ করছে।

গরু নিয়ে গোয়ালঘরের দিকে যাওয়ার সময় এক নারী (রোমানা) সালাম বিনিময়ের পর বলেন, ‘আঁরাও বাংলাদেশত যাইয়্যুম। এণ্ডে পাড়ায় পাড়ায় মিলিটারি আইয়্যেরে জুলুম গরেদ্দে। ’ আতঙ্কিত এই নারী আরো জানালেন, সেখানে তাঁরা ভালো নেই। ঘরে খাবার নেই। শিশুরা অসুস্থ। চিকিত্সা নেই। ওষুধ কিনতে পারছেন না। পুরুষরা বাজারে যেতে পারছে না।  

এ ছাড়া নাইক্ষ্যংদিয়া চরে অবস্থান নেওয়া এক ব্যক্তির ভিডিও ক্লিপ ধারণ করা হয় সোমবার দুপুরে। বাংলাদেশের শাহপরীর দ্বীপের ওপারে নাইক্ষ্যংদিয়া চরে অবস্থান করছিল এক দল রোহিঙ্গা। দলে রাখাইনের মইদং, কাদিরাপাড়াসহ আট-দশ পাড়ার লোকজন ছিল। নিজদের পাড়া থেকে তারা আট থেকে ১২ দিন আগে বের হয়েছিল। কিন্তু নাইক্ষ্যংদিয়া চরে অবস্থান নেওয়ার পর তাদের খাবার শেষ হয়ে যায়। এই কারণে চরের কাছের একটি পাড়ায় গিয়েছিল খাবার সংগ্রহ করতে। তখন মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) মারধর করে এবং হেঁটে বাংলাদেশে চলে আসার জন্য নির্দেশ দেয়।

ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, এক যুবক খাবার সংগ্রহ করতে পাড়ায় যাওয়া এবং সেখানে মারধরের শিকার হওয়ার বিষয়ে বর্ণনা দিচ্ছিলেন।  


মন্তব্য