kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

চট্টগ্রাম নগরীর কলেজগুলোতে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ০৬:৩৭



চট্টগ্রাম নগরীর কলেজগুলোতে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ

ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম মহানগরীতে সরকারি-বেসরকারি ১৮টি কলেজের ছাত্ররাজনীতি এখন ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। এসব কলেজে অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনের দৃশ্যমান কোনো কর্মকাণ্ড নেই।

এদিকে এসব কলেজের মধ্যে মাত্র চারটিতে ছাত্রলীগের নিয়মিত কমিটি আছে বলে জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট ছাত্রলীগ। ১৪টিতে দীর্ঘদিন ধরে কমিটি হচ্ছে না। সেগুলোতে আবার ছাত্রলীগের একাধিক পক্ষ সক্রিয়। সংঘাতের আশঙ্কায় নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেই বলে সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন।  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ছাত্রলীগ নেতা জানান, সরকার ক্ষমতায় থাকলেও নগরীর প্রধান চারটিসহ বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের নিয়মিত কমিটি নেই। নতুন নেতৃত্ব আসছে না। পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।  

ছাত্রলীগের একক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও নগরীর কলেজগুলোতে নিয়মিত কমিটি না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০০৪ সালের এপ্রিলে মহানগর কমিটি পূর্ণাঙ্গ হওয়ার পর কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে চট্টগ্রাম নগরীর সাংগঠনিক কলেজগুলোর কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। আমরা বিভিন্ন সময় কলেজ কমিটি করার উদ্যোগ নিলেও সবার সহযোগিতা না পাওয়ায় কমিটি করা সম্ভব হয়নি।

তবে সব কলেজে সংগঠনের কার্যক্রম চলছে। ’ 

চারটি কলেজে কমিটি থাকার বিষয়ে নুরুল আজিম রনি বলেন, ‘যে চারটি কলেজে কমিটি আছে বলছেন সে কমিটিগুলো মহানগর কমিটির অনুমোদিত নয়। বর্তমানে নগরীর কোনো কলেজে ছাত্রলীগের বৈধ কমিটি নেই। ’রনি বলেন, ‘আমরা এখন ওয়ার্ড কমিটি করছি। এই কার্যক্রম শেষ হলে কলেজগুলোতে নতুন কমিটি করা হবে। ’

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক ও চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত বলেন, বেশির ভাগ কলেজে ছাত্রলীগের নিয়মিত কমিটি না থাকায় বিরোধ বাড়ছে নিজেদের মধ্যে। বিলুপ্ত করার পরও নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ না নেওয়ায় সাংগঠনিকভাবে ব্যর্থ নগর কমিটি।  

ইয়াছিন আরাফাত বলেন, বেশির ভাগ কলেজে যাঁরা এখন ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁদের অনেকের ছাত্রত্ব নেই শুধু তা নয়, অনেকে বিয়েও করেছেন। ছাত্রলীগকে সংগঠিত করতে না পারলে আওয়ামী লীগেরও ক্ষতি হবে। কারণ কলেজগুলোকে শৃঙ্খলায় আনতে না পারার কারণে কয়েক দিন পর পর নিজেরা নিজেরা মারামারি করছে, এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটির সভাপতি লুত্ফুল এহসান শাহ বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতির বৈরী পরিবেশের কারণে আমাদের কলেজে নতুন কমিটি না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ১৯৯০ সালের পর থেকে এই কলেজের ছাত্ররাজনীতির একক নিয়ন্ত্রণ ছাত্রলীগের। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আমরা কমিটি করতে পারছি না। আমাদের কমিটি কেন্দ্র থেকে বিলুপ্ত করলেও নতুন কমিটি না হওয়ায় আমরা কার্যক্রম চালাচ্ছি। ’

চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগ নেতা মাহমুদুল করিম বলেন, ‘৩৪ বছর পর চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ১৯৮১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তবারক হোসেনকে (তত্কালীন সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রসংসদের এজিএস) জবাই করে হত্যার পর কলেজ দুটি শিবির দখল করে নেয়। ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে এ দুটি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ খুবই শক্তিশালী হলেও কেন কমিটি দেওয়া হচ্ছে না তা নগর ও কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা জানেন। কমিটি না হওয়ায় আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা আছে। ’

সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ইমতিয়াজ বাবলা বলেন, ‘আমরা মনে করি, আমাদের তিন নেতা (নগর আওয়ামী লীগ) একসঙ্গে বসতে পারলেই নতুন কমিটি মুহূর্তের মধ্যে হয়ে যাবে। ’ এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান তারেক বলেন, ‘আমরা নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও নতুন কমিটি না হওয়ায় আমরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। তবে আমরা নেতৃত্ব থাকাকালীন এই পর্যন্ত কলেজে কোনো বিশৃঙ্খলা হতে দিইনি। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর সরকারি সিটি কলেজ, এমইএস কলেজ, সরকারি কমার্স কলেজ, ইসলামিয়া কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ, মোস্তফা হাকিম কলেজ, বঙ্গবন্ধু ল টেম্পল কলেজ, চট্টগ্রাম আইন কলেজ, সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, হাজেরা-তজু ডিগ্রি কলেজ, আশেকানে আউলিয়া কলেজ, এনএমজে ডিগ্রি কলেজ, বাকলিয়া সরকারি কলেজ, শ্যামলী আইডিয়াল অ্যান্ড পলিটেকনিক্যাল কলেজ ও পাহাড়তলী কলেজ এখন ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, আইন কলেজ ও বাকলিয়া সরকারি কলেজে ছাত্রলীগের নিয়মিত কমিটি রয়েছে।

সংগঠনের নগর ও কলেজ কমিটির নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, নগরীর ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় সরকারি সিটি কলেজ ও এমইএস কলেজ থেকে। ওই দুই কলেজ থেকে দীর্ঘদিন ধরে মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আসছেন। এ ছাড়া সরকারি কমার্স কলেজ, ইসলামিয়া কলেজও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। এই চারটি কলেজে কয়েক যুগ ধরে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ছাত্ররাজনীতি।  

এদিকে ওই চারটি কলেজ ছাড়া অন্য কলেজগুলো যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে বেশির ভাগই তাদের ছাত্রসংগঠনের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে দীর্ঘ প্রায় তিন যুগ ধরে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ ছাত্রশিবিরের দখলে থাকলেও ওই দুটি কলেজও ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণে নেয়। নগরীর বৃহত্ সরকারি ওই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে এলেও আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে দূরত্ব থাকায় কমিটি হচ্ছে না। এ ছাড়া অন্য ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছাত্রলীগের একাধিক পক্ষ থাকায় সেখানেও কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেই।


মন্তব্য