kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

চট্টগ্রামে যুবদল নেতা হারুন খুন

নেপথ্যে ট্রাকস্ট্যান্ড দখল আর 'লিমন বাহিনী'!

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০১:২৩



নেপথ্যে ট্রাকস্ট্যান্ড দখল আর 'লিমন বাহিনী'!

চট্টগ্রামে রেলওয়ের টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে সিআরবি (রেলভবন) জোড়া খুনের মামলার আসামি বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম লিমনের নাম আবার আলোচনায় এসেছে। গত রবিবার নগরের শুভপুর বাসস্ট্যান্ডে যুবদল নেতা হারুন হত্যাকাণ্ডে লিমনের অনুসারীদের কয়েকজন জড়িত থাকতে পারে বলে পুলিশ সন্দেহ করছে, যারা সিআরবি এলাকার ঘটনায়ও ছিল।


পুলিশ বলছে, হারুন হত্যার ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার করা মামলার এজাহারে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের কয়েকজন ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতা সাইফুল ইসলাম লিমনের অনুসারী। লিমন সিআরবির জোড়া খুনের আসামি। তিনি ছাড়াও যুবলীগের আরেক শীর্ষ ক্যাডার ও তাঁর অনুসারীদের সন্দেহ করছে পুলিশ।

হারুন হত্যার ঘটনায় তাঁর ভাই হুমায়ুন চৌধুরী বাদী হয়ে সদরঘাট থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। তবে মামলার এজাহারে আসামি কলামে সরাসরি কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। অভিযোগের বর্ণনা অংশে ১০ জনের নাম রয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বাদীর ভাই মো. হারুন রশিদ চৌধুরী (৩৩) পরিবহন ব্যবসায়ী। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম এস টি ট্রেডিং। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হারুন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পণ্য পরিবহনের গাড়ি সরবরাহ (ব্রোকার কমিশন) করে থাকেন।

এ কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি মহলের রোষানলে পড়েন। ওই মহলটি দীর্ঘদিন ধরে ট্রাকস্ট্যান্ডের অবৈধ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। এর প্রতিবাদ করেছিলেন হারুন। এ কারণে তাদের সঙ্গে হারুনের বিরোধ তৈরি হয়, যার জের ধরে তাদের যোগসাজশে গত রবিবার বিকেলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হারুনের ওপর হামলা চালানো হয়। তাঁকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে, ছুরিকাঘাত করে এবং গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বাদী মামলার এজাহারের বর্ণনা অংশে হারুনের সঙ্গে ১০ জনের বিরোধ থাকার কথা বলেছেন। এ ১০ জন হলেন মোহাম্মদ আলমগীর (৩০), মোহাম্মদ কায়সার (২৫), নূরুন্নবী (৩৪), হূদয় (২৮), মোশাররফ হোসেন লিটন (২৮), মো. শরীফ (৩৫), মো. জসিম (২৯), তানভীর হোসেন (৩৩), তেৌকির হোসেন (৩০) ও হাজি মো. সালাউদ্দিন দুলাল (৪০)।

বাদীর দেওয়া এ তথ্য বিশে্লষণ করতে গিয়ে পুলিশ শুরুতেই একটি ভিডিও ফুটেজ পেয়েছে। এই ভিডিও ফুটেজটি প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন ধারণ করেছে। এতে আলমগীর, শরীফ ও জসিমসহ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রাপ্ত ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, একদল যুবক চিত্কার করে হারুনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা বেধড়ক হারুনকে পেটায়। তখন তাঁর পাশে একটি মোটরসাইকেল পড়ে ছিল। হারুনকে মাটিতে পড়া অবস্থায় দেখা গেছে। মারধর শেষে হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর অন্য এক যুবক এসে তাঁকে ধরে বসানোর চষ্টো করে। এ সময় হারুনের শরীর রক্তাক্ত দেখা গেছে।
অন্য একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে, গুরুতর আহত হারুনকে অটোরিকশায় তুলে হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

ভিডিও ক্লিপের সূত্র ধরে আসামিদের নাম পাওয়ার তথ্য জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এখন এসব তথ্য যাচাই-বাছাই ও আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।

ঘটনার বিষয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'হারুন হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং ট্রাকস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। '

ভিডিও ফুটেজে হামলাকারীদের দেখা যাওয়া এবং কিছু নাম পাওয়ার বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা মোস্তাইন বলেন, 'তদন্তাধীন বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। এখন পুলিশের প্রধান কাজ হচ্ছে আসামি গ্রেপ্তার করা। '

এদিকে হামলাকারীদের বিষয়ে তথ্যানুসন্ধানের শুরুতেই চট্টগ্রাম নগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), থানা পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের কর্মকর্তারা জানতে পারছেন, মামলায় যাদের নাম উলে্লখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে অন্তত ছয়জন ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতা সাইফুল ইসলাম লিমনের অনুসারী। ২০১৩ সালের ২৪ জুন রেলওয়ের টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে সিআরবি এলাকায় যুবলীগ ক্যাডার হেলাল আকবর বাবর ও ছাত্রলীগ ক্যাডার সাইফুল ইসলাম লিমন পক্ষের সংঘর্ষে এক শিশু ও এক যুবলীগকর্মী নিহত হয়। এ ঘটনার পর লিমনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ওই দিনের সংঘর্ষের সময়ও লিমনের পক্ষে ছিল এমন কয়েকজন হারুন হত্যার ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাদের মধ্যে ফরিদও ঘটনাস্থলে ছিলেন। ফরিদ হলেন লিমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

পুলিশ কর্মকর্তারা এমন তথ্য জানলেও বাদীর উল্লেখ করা নামগুলোতে ফরিদ নেই। কিন্তু ভিডিও ফুটেজে পাঞ্জাবি পরা ব্যক্তিকেই ফরিদ বলে শনাক্ত করছেন স্থানীয় লোকজন।

ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফরিদ, লিটন, আলমগীর ও নূরুন্নবীর বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফুল ইসলাম লিমন গতরাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ফরিদসহ যেসব নামের কথা আপনি বলছেন, সেই নামের কাউকে আমি চিনি না। এসব আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার। '


মন্তব্য