kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

চট্টগ্রামে ২ জঙ্গি গ্রেপ্তার

নব্য জেএমবিতে পরিচয় গোপন রাখতে 'কোড'

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০২:৪৬



নব্য জেএমবিতে পরিচয় গোপন রাখতে 'কোড'

নব্য জেএমবির জঙ্গিরা পরিচয় গোপন করতে এখন নিজস্ব বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন বা কোড ব্যবহার করছে। গাণিতিক তিনটি সংখ্যায় এই কোড তৈরি করে জঙ্গিদের দিচ্ছেন দলের আমির নিজেই। এই কোড নম্বর আমির ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই একজন জঙ্গি অন্য জঙ্গি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারছে না। পাশাপাশি দুজন জঙ্গি থাকলেও কার কোড কত, সেটা পর্যন্ত গোপন রাখছে জঙ্গিরা।

চট্টগ্রামের সদরঘাট থানা এলাকার একটি আস্তানা থেকে গ্রেপ্তারকৃত দুই জঙ্গি আশফাকুর রহমান ও রকিবুল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশের গোয়েন্দারা এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দুই জঙ্গি নিজেদের কোড জানিয়েছে। এ ছাড়া জঙ্গিদের ব্যবহূত অ্যাপস থেকেও এই কোডের বিষয়ে সত্যতা পেয়েছে পুলিশ।

জঙ্গিদের বিশেষ কোড ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আফতাব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'রিমান্ডে জঙ্গিরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না।'
প্রসঙ্গত, গত সোমবার রাতে নগরের সদরঘাট থানার পোর্ট সিটি হাউজিং সোসাইটির একটি ভবনের পাঁচতলার বাসায় অভিযান চালিয়ে ১০টি হাতে তৈরি গ্রেনেডসহ দুই জঙ্গিকে গ্রপ্তোর করে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। তারা নিজেদের নব্য জেএমবির (জামা'আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) সদস্য বলে স্বীকার করেছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত একটি ম্যাপের তথ্যানুযায়ী, তারা সদরঘাট থানায় হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এ ঘটনায় করা মামলায় দুই জঙ্গি সাত দিনের রিমান্ডে আছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গি আশফাকুর রহমান গোয়েন্দাদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছে, তাদের আমির হলেন ডন। তারা এই ডনকে আগে কখনোই দেখেনি। ডনই তাকে একটি কোড নম্বর দিয়েছে। এই কোড নম্বর দিয়েই সে নিজের জঙ্গি পরিচয় নিশ্চিত করে। এর বাইরে যে নামগুলো তারা ব্যবহার করে, সেগুলো ছদ্মনাম। কোড নম্বরকেই জঙ্গিরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জঙ্গিদের পরিচিতির ক্ষেত্রে।

আশফাকুর রহমান আরো জানিয়েছে, ঢাকায় ব্লগার রাজিব হত্যাকাণ্ডের পরই সে জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। প্রথম প্রথম শায়ক জসিম উদ্দিন রাহমানির ওয়াজ শুনত সে। ইউটিউবে ওয়াজ শোনার সময়ই জঙ্গিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ঘটে। এরপর জঙ্গিরা তাকে আরো কিছু ওয়াজ দেয়। এগুলো সে শোনে। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে সে ঘর ছাড়ে।

আশফাক জানিয়েছে, ব্লগার রাজিব হত্যাকাণ্ডের পর জসিম উদ্দিন রাহমানির ওয়াজ, বক্তব্য ইত্যাদি সে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট বা শেয়ার করত। একপর্যায়ে তার সঙ্গে ফেসবুকে আবু তুর্কি নামের একজনের পরিচয় হয়। আবু তুর্কি নিজেকে ভারতীয় বলে দাবি করে এবং অবস্থানও ভারতে বলে জানায়। এই আবু তুর্কিই পরবর্তী সময়ে ফেসবুকের মাধ্যমে আশফাককে জানায়, তার সঙ্গে ডন নামের একজন যোগাযোগ করবে। শেষে ডন পরিচয় দিয়ে একজন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। ডনের সঙ্গে যোগাযোগের পর থেকেই সে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে যায়। এই ডনই তাকে বিশেষ অ্যাপস ও কোড নম্বর দিয়েছে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আশফাক জানিয়েছে, জঙ্গিদের কোড নম্বরগুলো আমির নিজেই দেয়। আমিরই জানে এসব কোডের মানুষটির নাম-পরিচয়। অন্য কেউ জানতে পারে না। প্রশ্নও করা যায় না। এ কারণে ডনের পরিচয় যেমন আশফাক জানে না, তেমনি অন্য জঙ্গিদের বিষয়েও তেমন কোনো তথ্য নেই তার কাছে।

পুলিশ সূত্র বলছে, আশফাক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে যে অক্টোবরে ঘর ছাড়ার পর প্রথমে সে এক মাস ঢাকায় ছিল, পরে চট্টগ্রামে চলে আসে। চট্টগ্রামে আসার পর মেজবাহ ও মনছুর ওরফে জীবন তাদের ব্যয়ভার বহন করে। এ দুজনের কাছ থেকেই সে ও রকিবুল হাসান প্রয়োজনীয় বোমা পেয়েছিল বলে জানিয়েছে আশফাক। সে আরো জানিয়েছে, তাদের সদরঘাট থানায় হামলার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এই লক্ষ্যেই তারা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে এর আগে সে কোথাও নাশকতামূলক কাজ করেনি বলে দাবি করেছে আশফাক।

চট্টগ্রামে জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করেন-এমন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, জঙ্গিরা সাধারণত ছদ্মনাম ব্যবহার করে। একজন জঙ্গির একাধিক ছদ্মনাম থাকে। কিন্তু বিশেষ কোড ব্যবহার করে, এটা আগে শোনা যায়নি। আশফাকের মুখেই প্রথম শোনা গেল, জঙ্গিরা কোড ব্যবহার করছে। আশফাক ও রকিবুলের দুটি কোড নম্বর বিষয়ে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হলেও নিরাপত্তার স্বার্থে কোড নম্বর দুটি প্রকাশ করতে তাঁরা রাজি হননি।


মন্তব্য