kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

সরেজমিন

কয়েকজন রোহিঙ্গা গর্ভবতী নারীর করুণ জীবন

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার    

১৮ মে, ২০১৮ ০২:০৬



কয়েকজন রোহিঙ্গা গর্ভবতী নারীর করুণ জীবন

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে পা দিতেই পূর্বপরিচিত রোহিঙ্গা মাঝি (নেতা) আবদুল হাফিজ দৌড়ে এসে নিজের মোবাইল ফোনটি এগিয়ে দিলেন। মোবাইলের ফেসবুক দেখিয়ে তিনি বললেন, প্রতিদিন শিবিরে ৬০ জন করে রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিচ্ছে। এমন খবরটি রোহিঙ্গা মাঝি হাফিজকেও নাড়া দিয়েছে।

প্রায় দেড় যুগ আগে রাখাইনের মংডু থেকে সপরিবারে এপাড়ের কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেন আবদুল হাফিজ। বাংলাদেশের মাটিতে একটানা দেড় যুগ ধরে বসবাস করছেন হাফিজ। এ কারণে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা থেকে শুরু করে এ দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে অনেকটাই ওয়াকিবহাল তিনি। 

রোহিঙ্গাদের মাত্রাতিরিক্ত জন্মহার নিয়ে হাফিজ নিজেও উদ্বিগ্ন এ কারণে যে তিনি নিজেও ১৮ ভাই-বোনের একজন। হাফিজরা ১১ ভাই ও সাত বোন। সবাই রোহিঙ্গা শিবিরে। রোহিঙ্গা মাঝি হাফিজ বলেন, ‘দৈনিক ৬০টি শিশুর জন্ম হলে প্রতি মাসে এক হাজার ৮০০ জন। সেই হিসাবে বছরে ২১ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাড়ছে। এমন অবস্থায় আমাদের কী হাল হবে ভাবতে পারছি না।’ 

হাফিজের মতে, এতকাল রোহিঙ্গারা পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতিকে ধর্মবিরোধী কাজ মনে করত। বর্তমানে এনজিওর সচেতনতার কারণে অনেক রোহিঙ্গা পরিবার এ বিষয়ে তাদের মত পাল্টাচ্ছে। অনেকে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করছে।

দৈনিক ৬০টি করে রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম নেওয়ার খবরটি স্থানীয় লোকজনের চেয়ে গতকাল রোহিঙ্গা শিবিরেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল শিবির পরিদর্শনকালে এটি ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গেছে। সেই সঙ্গে রাখাইনে গেল বছর মগ সেনা ও রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজনের হাতে ধর্ষিতা নারীদের সন্তান প্রসব নিয়েও চলছে নানা আলোচনা।

‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ নামের রোহিঙ্গাদের সংগঠনের সভাপতি মাস্টার মুহিবুল্লাহ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি শুনেছি একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের বরাতে রোহিঙ্গা শিবিরে শিশুর জন্মসংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। সেই সঙ্গে রাখাইনে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীদের শিশু জন্ম নিয়েও কথা রয়েছে।’ 

মাস্টার মুহিবুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ভাগ্যিস ধর্ষিতা নারীরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে শিবিরে যথাযথ চিকিত্সা পেয়েছিল। এ কারণে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধর্ষিতা নারী হয় নিজের ইচ্ছায় নতুবা চিকিত্সকের পরামর্শে গর্ভপাত ঘটিয়েছে। অন্যথায় মিয়ানমারের রাখাইনে মগ সেনাদের হাতে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীরা শত শত অনাকাঙ্ক্ষিত শিশু জন্ম দিত। তিনি আরো জানান, এনজিও এবং অন্যান্য সূত্র মতে রাখাইনে ধর্ষণের শিকার হওয়া রোহিঙ্গা নারীর সংখ্যা এক হাজার ৮৩৪ জন।

গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকেই রোহিঙ্গারা দলে দলে পালিয়ে আসে। পালিয়ে আসার পর ৯ মাস পার হয়েছে। তাই ওই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভবতী নারীদের এখন সন্তান প্রসবের সময়। এ প্রসঙ্গে রোহিঙ্গা সংগঠনের সভাপতি মাস্টার মুহিবুল্লাহ জানান, তাঁর জানা মতে বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে কয়েক দিন আগে একজন ধর্ষিতা নারী একটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ শিশু প্রসব করেছেন। এ রকম আরো থাকতে পারে, তবে তিনি সুনির্দিষ্ট করে জানাতে পারেননি। 

গতকাল সন্ধ্যায় সরেজমিন পরিদর্শনকালে একজন রোহিঙ্গা রিকশাচালক কুতুপালং শিবিরের ডি-৫ ব্লকে এ প্রতিবেদকসহ রোহিঙ্গা মাঝি হাফিজকে নিয়ে যান। রোহিঙ্গা বস্তিতে যাওয়া মাত্রই ঘরের বাসিন্দা ছিদ্দিক মিয়া (২৫) দরজা খুলে ভেতরে যেতে অনুরোধ করলেন। ছিদ্দিক মিয়ার স্ত্রী নুরুচ্ছাফা বেগম (২০) এ সময় দোলনায় সদ্যোজাত শিশুকে দোলাচ্ছেন। স্বামী ছিদ্দিক মিয়া স্ত্রীকে বললেন, ‘তুমি লাজ-শরম ফেলে দিয়েই বল, কী রকম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলে বর্মায়।’


মন্তব্য