kalerkantho


ট্রাস্ট দুর্নীতির দুই মামলা

খালেদার স্থায়ী জামিন হয়নি

আদালত প্রতিবদক   

৯ নভেম্বর, ২০১৭ ২০:৩১



খালেদার স্থায়ী জামিন হয়নি

ফাইল ছবি

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির দুই মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে স্থায়ী জামিন দেয় নি আদলত। পরবর্তী ধার্য তারিখ পর্যন্ত খালেদা জামিনে থাকবেন বলে আদেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে চ্যাপিরটেবল ট্রাস্ট মামলায় আদালতে হাজির হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে টানা তৃতীয়দিন বক্তব্য দিযেছেন। অসমাপ্ত বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য আগামি ১৬ নভেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।  

আজ বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার বকশিবাজারে কারা অধিদপ্ততরের প্যারেড মাঠে নির্মিত অস্থায়ী আদালতে ৫ নম্বর বিশেষ জজ ড. মো. আকতারুজ্জামান শুনানি শেষে পরবর্তী ধার্য তারিখ পর্যন্ত জামিন দেন।  

খালেদা জিয়া দুই মামলায় হাজিরা দিতে পৌনে ১২ টায় আদালতে আসেন। তবে তার হাজির হওয়ার প্রায় ঘণ্টাখানেক আগেই এজলাসে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।  

প্রথমে চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় শুনানির কার্যক্রম শুরু হয়। এদিন মামলার দুই সাক্ষী স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংকের কর্মকর্তা মকবুল হোসেন ও আমিরুল ইসলামকে জেরা করেন খালেদা জিয়ার পক্ষে তার আইনজীবী আমিনুল ইসলাম।

সাক্ষীদের জেরা শেষ হওয়ার সময় পর্যন্ত খালেদা আদালতে হাজির না হওয়ায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিরতি দেন বিচারক। এরও প্রায় আধঘন্টা পর খালেদা হাজির হলে ফের আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।

খালেদার পক্ষে শুনানির শুরুতে তার আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার দুই মামলায় খালেদার জামিন চান। আরেক আবেদনে জামিন স্থায়ী করার আবেদন করেন।

এর বিরোধিতা করে দুদকের বিশেষ পিপি মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আজকে অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটি আত্মপক্ষ শুনানির জন্য ধার্য রয়েছে। আগে সেটা শুরু করি। অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৫০ থেকে ৬০ পৃষ্টার বক্তব্য দিয়েছেন। এখনও শেষ হয়নি। আজও বক্তব্য দেবেন। তাই আগে এ মামলার শুনানি। ’

এ সময় খালেদার অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, সুপ্রিম কোর্টে পঞ্চাশ বছরের উর্ধ্বে প্র্যাকটিস করছি। এ সময়ে সেখানে দেখেছি কোন আবেদন থাকলে আগে সেটা নিষ্পত্তি করতে।

তিনি বলেন, বিষয়টা সামান্য কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি (বিচারক) বিশ্বাস করতে পারছেন না জামিন দিলে খালেদা জিয়া আসবেন কি না। আর কোনোদিন শুনিনি সাপ্তাহিক জামিনের বিষয়। তিনি আগে যেভাবে জামিনে ছিলেন সেভাবে রাখেন।

‘চিকিৎসার জন্য তিনি বিদেশ গিয়েছিলেন। ফিরে এসে নিয়মিত আদালতে আসেছেন। জামিনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন। ’ যখন আসতে বলবেন তখনই খালেদা আদালতে আসবেন এমন আশ্বস্ত করেন। মামলার বিচার নিস্পত্তি হওয়া পর্যন্ত খালেদার জামিন মঞ্জুর করার জন্য আদালতে আবেদন জানান। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ফের এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেন দুদকের বিশেষ পিপি।  

জামিন আবেদনের উপর উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক এ বিষয়ে পরে আদেশ দেবেন জানিয়ে খালেদা জিয়াকে আত্মপক্ষ সমর্থনের অসমাপ্ত বক্তব্য শুরু করতে বলেন।  

বেলা ১২টা ৭ মিনিটে খালেদা তার বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। টানা প্রায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিট বক্তব্য দেন। এ সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ মামলার রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে, বিচারকগণ স্বাধীনভাবে বিবেকশাসিত হয়ে আইনসম্মতভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করতে সক্ষম কি না? আমাদের দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে বিচারের নামে অধিকার হরণের নমুনা দেখেছি। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানকেও দুর্নীতির অভিযোগে কারাভোগ করতে হয়েছে। মরহুম মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, অলি আহাদের মতো জাতীয় নেতাদেরও কারাভোগ করতে হয়েছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে উপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কবিতা রচনা করায় রাষ্ট্রদ্রোহী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।  

এ ছাড়া মাহত্মা গান্ধী, মাওলানা শওকত আলী, সুভাষ চন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাশ ও জহরলাল নেহরুর মতো নেতাদেরকেও আদালতের রায়ে কারাভোগ করতে হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো মানুষদেরও বিচারিক সাজা দেওয়া হয়। তথাকথিতও সেইসব রায়ের পেছনে যুক্তি, অজুহাত ও আইন দেখানো হয়। হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও সক্রেটিসের মতো মহামানবদেরও বিচারের নামে সাজা দেওয়া হয়। এসব বিচারকে কি বিশ্ববাসী ন্যায়বিচার বলে মনে নিয়েছে?’

খালেদা জিয়া আরো বলেন, ‘ইতিহাস এসব রায়ে কী দেখেছে? অপরাধী হিসেবে তাদেরকে সাজা দেওয়া হয়। কিন্তু ইতিহাস তাদের দিয়েছে গৌরব, মহিমা। ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয়, আবার কেউ নেয় না। যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়, মানুষ তাদের সম্মানিত করে। আর যারা শিক্ষা নেয় না, তাদের ঠাঁই হয় ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। তারা মানুষের ধিক্কারে পরিণত হন। ’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আলোচ্য এ মামলাটি ইতিহাসের এক মূল্যবান উদাহরণ হবে। আমি আশা করি, এর জন্য আপনি নির্ভর করবেন সুবিবেচনা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সাহস ও সততার ওপর। তাহলে অনাগত দিন বলে দেবে আপনি সঠিক সিদ্বান্তটি নিতে পেরেছিলেন।

এরপর খালেদা আর বলতে পারবেন না বলে আদালতকে জানান। এরপর বিচারক কার্যক্রম মুলতবি রাখেন। দুই মামলায় আগামি ১৬ নভেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করেন। একই সঙ্গে তিনি খালেদা জিয়ার স্থায়ী জামিনের আবেদন নাকচ করে বিচারক এজলাস ছেড়ে নেমে যান। বেলা ১টা ৪০ মিনিটে খালেদা বাসার উদ্দেশ্যে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন।

এদিকে খালেদা জিয়ার সাথে সাথে দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দরা আদালতে আসেন। একে একে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসিচিব রহুল কবির রিজভীসহ নজরুল ইসলাম খান, শিমুল বিশ্বাস, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, আবদুল আউয়াল মিন্টু, বরকত উল্লাহ বুলু, আমান উল্লাহ আমান, আফরোজা আব্বাস, খায়রুল কবির খোকন, শায়রুল কবীর খান আদালতে উপস্থিত হন।

খালেদার আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নুল আবেদীন, এজে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, আবদুর রেজ্জাক খান, সানাউল্লাহ মিয়া, নরুজ্জামান তপনসহ শতাধিক আইনজীবী।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাঃ 

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০১০ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপ-পরিচালক হারুন আর রশিদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

এ মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাঃ 

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক হারুন-অর-রশিদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী (পলাতক), হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

প্রসঙ্গত, গত ১৫ জুলাই চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। সেখানে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছিলেন। বড় ছেলে ও দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগে থেকেই লন্ডনে অবস্থান করছেন। তিন মাস লন্ডনে অবস্থানের পর দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন।


মন্তব্য