kalerkantho


মিতব্যয়ী হতে নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ

যুবায়ের আহমাদ   

৩০ অক্টোবর, ২০১৭ ১৯:৫৬



মিতব্যয়ী হতে নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ

ইকবাল সাহেব সরকারি চাকরি করেন। শহরের তাদের একটি বাড়ি আছে।

তার গ্রামের বাড়িতে যে বড় ভাই থাকেন তিনি অসুস্থ। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে পারছেন না। ইকবাল সাহেবের ঘরে দামি দামি ফার্নিচারের অভাব নেই। কিছুদিন আগে তারা লক্ষাধিক টাকায় একটি সোফা সেট কিনেছেন। কিন্তু প্রতিবেশীর বাসায় এ মাসে নতুন সোফা কেনা হয়েছে। সেটা ইকবাল সাহেবের সোফার চেয়ে একটু বেশি সুন্দর। ইকবাল সাহেবের স্ত্রী কোনো কাজে পাশের বাসায় গিয়েছিলেন। ফিরে এসেই প্রতিবেশীর সোফার মতো আরেকটি সোফা সেটা কিনে দিতে ইকবাল সাহেবকে চাপ প্রয়োগ করতে লাগলেন। অব্যাহত চাপের ফলে ইকবাল সাহেব তার বাসায় প্রতিবেশীর বাসার সোফার মতো আরেকটি সোফ সেট কিনতে বাধ্য হন। অথচ তারা চাইলে আভিজাত্যের প্রতিযোগিতার এ খরচটি বাদ দিয়ে সে অর্থে অসুস্থ ভাইয়ের চিকিৎসা করতে পারতেন। আমাদের চারপাশে ইকবাল সাহেবের মতো ঘটনা অনেক ঘটে থাকে।

মানুষকে মিতব্যয়িতায় উৎসাহিত করতে ৩১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় বিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস। মিতব্যয় মানে হলো ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংযম বা আয বুঝে ব্যয়। ‘ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন’ও মিতব্যয়িতার অর্থ। ইসলাম অপব্যয় এবং কৃপণতার ব্যাপারে সতর্ক করে মিতব্যয়িতার নির্দেশ দিয়েছে বারবার। কৃপণতা ও অপব্যয় কোনোটিই জায়েজ নেই ইসলামে। ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যমপন্থার জীবন দর্শন ইসলাম সব সময়ই তার অনুসারীদেরকে মিতব্যয়ী হতে নির্দেশ দিয়েছে। মধ্যমপন্থা শুধু ব্যয়ের ক্ষেত্রেই নয় বরং কথাবার্তা, হাটা চলার ক্ষেত্রেও মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। এরশাদ হয়েছে, ‘পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কণ্ঠস্বর নিচু করো’ (সুরা লুকমান: ১৯)। প্রয়োজনীয় খরচ করতে, খাবার খেতে নিষেধ নেই কিন্তু অপ্রয়োজনে খরচ করা পবিত্র কোরআনুল কারিমে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা আহার এবং পান কর, আর অপচয় করো না; তিনি (আল্লাহ) অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না’ (সুরা আরাফ: ৩২)। অপব্যয়কারীকে পবিত্র কোরআনুল কারিমে শয়তানের ভাই বলে অভিহিত করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে। ‘নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৭)।

প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের বাচবিচার না করে খরচের অভ্যাস হলে তার প্রভাব পড়ে উপার্জনের নীতিতে। হালাল উপার্জনের সঙ্গে খরচের ভারসাম্য না থাকলে আয়েশী জিনিসের জন্য ঋণ করতে বাধ্য হতে হয়। যেমন আজকাল অভাবে নয়; বরং প্রাচুর্য ও আভিজাত্যের প্রতিযোগিতায় নতুন নতুন গয়না, গাড়ি, বাড়ি, আসবাবপত্র কেনার জন্য হাতে টাকা না থাকলেও অনেক সময় ঋণ করা হয়। পকেটে টাকা না থাকলেও সুন্দর কোনো জিনিস পেলে তা ঘরে আনার লোভ সামলাতে পারেন না অনেকে। যশ-খ্যাতি অর্জনের জন্য যে ঋণ করা হলো তা পরিশোধের জন্য বেশি উপার্জন অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফলে সে ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত আয় করার জন্য উপার্জনে হালাল-হারামের সীমারেখা করতে বাধ্য হয় সে লোকটি। সেজন্যই ইসলাম সব সময় অপ্রয়োজনীয় খরচের ক্ষেত্রে সাবধান হতে বলেছে। নবী করিম (সা.) উপবাস থাকলেও দুনিয়াবি কারণে ঋণ করেননি। একান্ত প্রয়োজনে ঋণগ্রহণকে ইসলাম বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু বিলাসিতার জন্য ঋণ করা কিছুতেই ইসলাম সম্মত নয়।

হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কারো ঘরে একটি বিছানা তার জন্য, অপরটি তার স্ত্রীর জন্য, তৃতীয়টি মেহমানদের জন্য এবং চতুর্থটি শয়তানের জন্য। (মুসলিম)। যেহেতু বিলাসিতার কোনো শেষ নেই তাই ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির জীবনযাত্রার প্রতি তাকালে কেউই নিজের আয় দিয়ে তার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে না। তার আয় অভাব ও চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত মনে হবে। পৃথিবীর সমুদয় সম্পদের দ্বিগুণও তার অভাব পূরণ করতে পারবে না। ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা চাহিদাই তার জীবনের হতাশা ও উদ্বিগ্নতার কারণ হবে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দুনিয়াতে এমনভাবে জীবনযাপন কর যেন তুমি বিদেশি অথবা পথিক। ’(বুখাারি)।

পবিত্র কোরআনুল কারিমে অপচয় ত্যাগের কঠোর নির্দেশ জারি করে এরশাদ হয়েছে, রাসুলে কারিম (সা.)ও অপব্যয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন। একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত সা‘দকে (রা.) অজুতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যয় করতে দেখে বললেন, ‘হে সা‘দ! অপচয় করছ কেন? হযরত সা‘দ (রা.) বললেন, ওজুতে কী অপচয় হয়? নবীজি (সা.) বললেন, হ্যাঁ। প্রবাহমান নদীতে বসেও যদি তুমি অতিরিক্ত পানি ব্যবহার কর তা অপচয়’ (ইবনে মাজা)। অপচয় এবং কৃপণতা কোনোটিই অনুমোদিত নয় ইসলামে। যারা অপচয় এবং কৃপণতার পথ পরিহার করে মিতব্যয়িতার পথ অবলম্বন করবে আল্লাহ তাদেরকে নিজের বান্দা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘(রহমানের বান্দা তো তারাই) যারা অপব্যয়ও করে না আবার কৃপণতাও করে না। তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী’ (সুরা ফুরকান: ৬৭)।

প্রাচুর্যের সময় খরচের উৎসবে মেতে না উঠে পরবর্তীতে যেন হাত পাতার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি না হতে হয় এ বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। পবিত্র কোরআনুল কারিমে এরশাদ হয়েছে, তুমি একেবারে ব্যয়-কুণ্ঠ হইয়ো না এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হইয়ো না, তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও নি:স্ব হয়ে বসে থাকবে’ (বনি ইসরাইল: ২৯)। অপব্যয় না করে সন্তানদের জন্য কিছু সঞ্চয়ও করাও ইসলামের শিক্ষা। সন্তানদেরকে কারো মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়া নবীজি (সা.) কখনো পছন্দ করেননি। রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, ‘তুমি তোমার উত্তরনাধিকারীদেরকে মানুষের করুণার মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদেরকে সচ্ছল রেখে যাবে এটাই উত্তম’ (বুখারি: ১/৪৩৫; মুসলিম ৩/১২৫১)।

অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার। ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, সাদা- কালো, ছোট-বড়, সবাই এসবের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করলেও সামাজিক ও আর্থিক ভিন্নতার কারণে অনেকে এসবের সংস্থান করতে পারে না। কারো ভোগের পেয়ালা উপচে পড়ে আবার কারো হাড়ি শূন্যই থেকে যায়। কারো জৌলুস প্রদর্শনে কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিনোদনে খরচ করছে লাখ লাখ টাকা আর তার পাশের একজন গরিব মানুষ হয়তো টাকার অভাবে ওষুধও কিনতে পারছে না। উপচেপড়া অতিরিক্ত সম্পদটুকুর অপব্যয় না করে গরিবের শূন্য হাড়িতে ঢেলে দিলে একদিকে যেমন অপব্যয়ের গুনাহ থেকে বেঁচে যেত অন্যদিকে শূন্য হাড়িগুলো প্রাণ ফিরে পেত। এরশাদ হয়েছে, ‘আত্মীয়-স্বজনরকে তার হক দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৬-২৭)। আয়াতদ্বয়ে প্রথমে আত্মীয়-স্বজন ও অভাবী লোকদের হক প্রদান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তারপর অপব্যয় করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, কিছু সম্পদ সঞ্চয় করে বাকিটুকু আত্মীয়-স্বজন ও অভাবীদেরকে অতিরিক্ত সম্পদ দান করে দিলে অপব্যয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক


মন্তব্য