kalerkantho


যে পাপে সমাজ ধ্বংস

যুবায়ের আহমাদ   

১২ নভেম্বর, ২০১৭ ১৬:৫৫



যে পাপে সমাজ ধ্বংস

সাবিনা ও ইমরানের বিয়ে হয়েছে ৫ বছর। তাদের কোলজুড়ে এসেছে কন্যাসন্তান রূপা।

সাবিনা একটি বেসরকারি অফিসের সহকারী। স্বামী ইমরানও একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে চাকরি করেন। সুখী দাম্পত্য জীবন ছিল ইমরান-সাবিনার। গত দুমাস হলো তাদের সুখী দাম্পত্য জীবনের চিত্রটা পাল্টে গেছে। আগের মতো সাবিনা আর অফিস শেষেই সোজা বাড়ি ফেরে না। অনেকটা রাত করেই বাড়ি ফেরে। আজ অফিসের প্রচণ্ড কাজ, কাল বান্ধবীর জন্মদিন এমন অনেক অজুহাত দাড়ঁ করায় সাবিনা। ইমরানও তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে চাইনিজে যায় না। সুখের দিনগুলো হারিয়ে গেল দুঃখের অতল গহবরে।  

তাদের দাম্পত্য জীবনে চিড় ধরবে না কেন? দুমাস আগের সে দৃশ্যটা ইমরান তার মন থেকে দূর করতে পারছে না। সেদিন ইমরান অফিসের কাজে বাইরে গিয়েছিল। রমনা পার্কে সামনেই তার স্ত্রীকে অন্য একজনের গাড়ি থেকে নামতে দেখে। কদিন পরই সাবিনার ব্যাগ খুলতেই পায় চঞ্চল নামের এক বন্ধুর চিঠি। ইমরানও এখন ঘরে ফেরে অনিয়মে। সাবিনা-ইমরান কেউই কারো কৈফিয়তের ধার ধারে না। সাবিনা-চঞ্চলের পরকীয়ার আগুনে পুড়ে ছারখার হচ্ছে ইমরান-সাবিনার সংসার। এভাবেই সাবিনা-ইমরানদের বেহেশতি পরিবার পরিণত হয় দোজখে। অশান্তি নেমে আসে পুরো পরিবারে। ভেঙ্গে যায় পরিবার। সাবিনা চলে যায় অন্য এক বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে। নিস্পাপ শিশু রূপা বঞ্চিত হয় মায়ের আদর থেকে। সংবাদপত্রের পাতা খুলতেই চোখে পড়ে সাবিনার মতো পরকীয়ার খবর।  

ইদানিং ‘পরকীয়ার কারণে মৃত্যু’ বাক্যটি মিডিয়াতে বার বার উচ্চারিত হচ্ছে। পরকীয়ার অদৃশ্য ফাঁদে আটকে আত্মহনন করছে অনেক নারী-পুরুষ। বাড়ছে আত্মহত্মা। নিষ্পাপ শিশু সন্তানকে হারাতে হচ্ছে মায়ের আদর। পরকীয়ার পথে সন্তান বাঁধা হওয়ায় সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করছে। কখনো নিজ সন্তানকে টুকরো টুকরো করে ফ্রিজে বস্তাবন্দি করে রাখছে। এর বলি হয়ে কখনো প্রেমিকাকে নিহত হতে হচ্ছে প্রেমিকের হাতে। ৯ অক্টোবর বনশ্রীতে জান্নাতুল বুশরাকে হত্যা করে তার স্বামী।

১২ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে রাকিব হোসনকে খুন করে তার স্ত্রী ও ছোট ভাই। ২১ অক্টোবর চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ফারুককে হত্যা করে তার স্ত্রী জেসমিন আক্তার। ২ নভেম্বর রাজধানীর বাড্ডায় পরকীয়ার কারণে নিজ স্বামী ও কন্যাকে হত্যা করে আর্জিনা বেগম। কী নির্মম! পরকীয়াই স্নেহময়ী মা থেকে আর্জিনাকে রাক্ষসীতে পরিণত করছে। পরকীয়ার কারণে বাড়ছে নিজের স্বামী/স্ত্রীতে অসন্তুষ্টি, পারিবারিক অশান্তি। ভেঙ্গে যাচ্ছে সংসার। কথিত অভিজাত পরিবারগুলোতে পরকীয়ার কারণে পুরুষের চেয়ে মহিলারাই তাদের স্বামীকে তালাক দিচ্ছেন এমনটিই ঘটছে বেশি। ২৫ জুলাই, ২০১৭ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায় মোট তালাকের ঘটনার ৬৮ দশমিক ১৯ শতাংশই হচ্ছে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে। আর ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ হচ্ছে স্বামীদের পক্ষ থেকে। সে প্রতিবেদনেও পরকীয়াকে এর বড় একটি কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।  

এখন আর নারী ‘স্বাধীনতা’র নামে মহা আনন্দে ‘পরকীয়াতে লজ্জার কিছু নেই’-এমন বক্তব্য প্রদানকারীদের সংযত হতেই হবে। কারণ এ পরকীয়াই আজ সমাজ ধ্বংসের কারণ। সমাজের চালিকাশক্তি পরিবার ভাঙ্গার বড় কারণ হলেও থেমে নেই পরকীয়া। ক্রমেই ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যধিতে পরিণত হচ্ছে। সহজলভ্য মুঠোফোন, অনলাইন চ্যাটিং, রাজধানীর পার্ক বা উদ্যানগুলোর নিরাপত্তা, ভারতীয় চ্যানেলের অবাধ অনুপ্রুবেশ যেন পরকীয়াকে একধাপ এগিয়ে দিয়েছে। এর পরও কি আমরা এর লাগাম টেনে ধরতে উদাসীনতা প্রদর্শন করব? কী এর সমাধান? কীভারে বের হয়ে আসা যাবে পরকীয়া কিংবা অশ্লিলতার অভিষাপ থেকে? যেহেতু এহেন ভয়ঙ্কর প্রবণতা মানুষকে স্বামী-স্ত্রী সন্তান এমনকি দেশ ত্যাগের মতো সীমালঙ্ঘনেও উৎসাহ দেয় তাই ইসলাম একে কঠোর হস্তে দমন করতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গোটা সমাজের অশান্তির কারণ হওয়ায় বিবাহিত পুরুষ কিংবা নারী যদি ব্যভিচার তথা পরকীয়ায় লিপ্ত হয় তাহলে ইসলাম মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করেছে। যেহেতু এর ক্ষতি ভয়ঙ্কর, মারাতœক ও তীব্র তাই ইসলাম এর জন্য কঠোর শাস্তি ঘোষণা করেছে।

বর্তমানে পরকীয়ার অধিকাংশ ঘটনার সূত্রপাত হচ্ছে ফোনালাপ কিংবা অনলাইন চ্যাটিং থেকে। অথচ ইসলামের নির্দেশনা মেনে মহিলাদের পুরুষের সঙ্গে, পুরুষদের মহিলাদের সঙ্গে ফোনালাপের ক্ষেত্রে সংযত হলে এ সমস্যাটি মহামারির আকার ধারণ করত না। মহিলাদের কথার আওয়াজকেও সতরের অন্তর্ভূক্ত করে অপ্রয়োজনে পরপুরুষের সাথে কথা বলতে নিষেধ করেছে। একান্ত প্রয়োজনে কথা বলতে হলেও সুরা আহজাবের ৩২ নং আয়াতে পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলতেও নিষেধ করা হয়েছে। শুধু মহিলাদেরকেই নয় বরং সুরা নুরের ৩০ নং আয়াতে প্রথমে আল্লাহ তায়ালা পুরুষদেরকে তাদের দৃষ্টি সংযত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। আবার ৩১ নং আয়াতে মহিলাদেরকে তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখার পাশাপাশি তাদের গোপন শোভা অনাবৃত করতে নিষেধ করেছে। অপাত্রে সৌন্দর্য প্রদর্শনকে হারাম করে সবটুকু সৌন্দর্য স্বামীর জন্য নিবেদনে উৎসাহ প্রদান করেছে। কারণ স্বামী তার স্ত্রীর সৌন্দর্যে মোহিত হলে সংসারের শান্তিই বাড়বে। পক্ষান্তরে স্ত্রীর সৌন্দর্য দিয়ে অন্যকে মোহিত করার পথকে অবারিত করে দিলে তা কেবল বিপদই ডেকে আনবে।

পুরুষ-মহিলা সবাইকে চরিত্র সংরক্ষণের নির্দেষ দিয়েছে ইসলাম। বোখারি। সুরা বনি ইসলাঈলের ৩২ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না’। কাছেও যেও না মানে কী? যে জিনিস মানুষকে ব্যভিচারের নিকটবর্তী করে দেয় তার কাছে যেতেই নিষেধ করেছে। যেসব কাজ করলে মানুষ ব্যভিচারে ধাবিত হয় সেসব কাজ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। পরকিয়ার সূত্রপাত যদি ফোনালপে হয় তাহলে সুরা বনি ইসরাইলে ৩২ নং আয়াত এই ফোনালাপকেও হারাম করেছে। যে ব্যক্তি দুনিয়ার সামান্য অবৈধ ‘ভালোলাগা’কে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের চরিত্রকে পরকীয়াসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজ থেকে হেফাজত করবে নবীজি (সা.) তার জন্য জান্নাতে জামিনদার হওয়ার ঘোষণা করেছেন। হজরত সাহল ইবনে সা‘দ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে আমি তার বেহেশতের জামিনদার হবো। (বুখারি ও মুসলিম)।

কখনো দেখা যায় দেবরের সাথে জমে ওঠে পরকীয়া। ইসলাম দেবরের সাথে দেখা-সাক্ষাত করার লাগামকেও টেনে ধরেছে। হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সাবধান! তোমরা নির্জনে নারীদের কাছেও যেও না’ এক আনসার সাহাবী বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ দেবর সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কী? নবীজী (সা.) বললেন দেবর তো মৃত্যুর সমতুল্য। (বোখারি, মুসলিম)। হাদিসের ব্যখ্যায় হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ফতহুল বারিতে লিখেছেন, এখানে মৃত্যুর সমতুল্য এর অর্থ হলো হারাম।

পরকীয়ার মহামারী থেকে সমাজকে রক্ষা করতে ইসলামের দিকেই ফিরে যেতে হবে আমাদেরকে। শান্তির জন্যই আল্লাহর ভয় অন্তরে এনে নিজের অনৈতিকতা থেকে নিজেকে হাজার মাইল দূরে রাখতে হবে। পার্ক, ফাইভস্টার হোটেল, নাইট ক্লাব কিম্বা বিনোদন কেন্দ্রগুলোর লাগাম টেনে ধরতে হবে। সর্বত্র শালীন পোষাক পরিধানে বাধ্য করতে হবে। সামাজিক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে বিদেশী চ্যানেল ও বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এখনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ‘আধুনিকতা’র নামে এখনের এ ব্যাপারে উদাসীনতা প্রদর্শন করলে হয়তো আরে কঠিন মূল্য দিতে হবে এ সমাজকে।

লেখক :  লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক


মন্তব্য