kalerkantho


মহানবী (সা.)-এর জীবনে যুদ্ধবিগ্রহ

ড. মুহাম্মদ আবদুল হাননান   

২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৫:৩৪



মহানবী (সা.)-এর জীবনে যুদ্ধবিগ্রহ

মহান আল্লাহর দ্বীন ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে নবী (সা.)-কে বেশ কিছু ছোট-বড় যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু এসব যুদ্ধ প্রচলিত যুদ্ধ-সংঘর্ষ থেকে আলাদা।

কারণ মুহাম্মদ (সা.)-এর যুদ্ধগুলো প্রচলিত সামরিক অভিযান ছিল না, সাম্রাজ্য বিস্তার বা ধন-সম্পদ উপার্জনও লক্ষ্য ছিল না। বেশির ভাগ যুদ্ধই ছিল মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর প্রধান কাজ ছিল প্রতিরোধমূলক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বাহিনীকে আগে আক্রমণ করতে নিষেধ করতেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় ২৭টি বড় ধরনের যুদ্ধ (গাজওয়া), ৬০টি ছোটখাটো দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ (সারিয়া) সরাসরি পরিচালনা করেছেন। (ইসলামী বিশ্বকোষ, পূর্বোক্ত) মুফতি শাফি (রহ.) লিখেছেন, বড় যুদ্ধ গাজওয়া ২৩টি এবং ছোটখাটো যুদ্ধ (সারিয়া) ৪৩টি। (মুফতি শাফি : সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৮৫)

এসব যুদ্ধে মুসলিম-অমুসলিম মিলে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ১৮। এত ছোট-বড় যুদ্ধে নিহতের এই সংখ্যা সমকালের ইতিহাসেও নগণ্য। এর বিপরীত দিকটিও দেখতে হবে, আর তা হলো, এসব নিহতের বিনিময়ে বেঁচে গেছে লাখো মানুষ।

বর্বর আরবরা সভ্য হয়েছিল এসব যুদ্ধের বিনিময়ে। শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল সমাজে। ইসলামের আগমনে নারীরা বেঁচে গিয়েছিল নিষ্ঠুর পুরুষতন্ত্র থেকে।

একজন শহীদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটেছিল দৈনিক দুই হাজার ৭৪০ বর্গমাইল। (গুলজার আহমদ : The battle of Prophet of Allah, Karachi, 1975, P. 28)

মুহাম্মদ (সা.) যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর হাতে একজন অমুসলিমও নিহত হয়নি। তরবারি ব্যবহারের চেয়ে ক্ষমাই তাঁর যুদ্ধনীতির মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। যারা যুদ্ধে নেই, শিশু, বৃদ্ধ, নারী, তাদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনী যেন কোনো অস্ত্র না ধরে, সে সম্পর্কে তাঁর নির্দেশ প্রতিনিয়তই ছিল। সম্পদ, তা শত্রুদেরই হোক না কেন, নষ্ট না করতে তাঁর আদেশ সব সময়ই কাজ করত। মৃত শত্রুদের বিকলাঙ্গ করা তাঁর নীতিবিরুদ্ধ কাজ ছিল। এর পাশাপাশি কাফেররা মুসলিমদের পেট চিরে কলিজা পর্যন্ত চিবিয়ে খেয়েছে। যুদ্ধবন্দিদের প্রতি সব সময়ই মানবিক ব্যবহার তাঁর সমরনীতির অত্যাবশ্যকীয় অংশ ছিল। শত্রুপক্ষের কাছ থেকে সন্ধি বা শান্তির প্রস্তাব পেলে যুদ্ধ থেকে একেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। শান্তিচুক্তি কখনো ভঙ্গ করেননি।

যুদ্ধের উদ্দেশ্য গনিমতের মাল সংগ্রহ নয় এবং বাহুবলেই বিজয় সম্ভব নয়, যদি না আল্লাহ তাআলার মর্জি না থাকে, অনুসারীদের এমন নীতি ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতেন সব সময়। তাঁর যুদ্ধ বা জেহাদ ছিল এবাদতেরই অংশ। (ইসলামী বিশ্বকোষ, পূর্বোক্ত)

অনেক সামরিক পরিকল্পনা ও সন্ধিচুক্তি এসব যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সম্পাদিত হয়েছে, যা বর্তমানেও দেশে দেশে যুদ্ধ ও শান্তির ক্ষেত্রে নমুনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মুহাম্মদ (সা.)-এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচয় এর মধ্য দিয়ে বিস্ময়করভাবে ফুটে উঠেছে, যা আধুনিক সমরনেতা ও রাষ্ট্রনেতার কাছেও আজ অভাবিত ব্যুত্পত্তিময় বলে চিহ্নিত হয়ে আসছে।


মন্তব্য