kalerkantho


মুসলিম শাসনামলে কৃষি উন্নয়ন

মুশাহিদ দেওয়ান   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৮:১৩



মুসলিম শাসনামলে কৃষি উন্নয়ন

কৃষি উন্নয়নে মুসলিমদের ইতিহাস স্বর্ণোজ্জ্বল। যুগে যুগে মুসলিম খলিফারা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষির প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন।

সাহাবায়ে কেরাম চাষাবাদ করেছেন। নবীজি (সা.) কৃষিকর্মের প্রশংসা করেছেন। পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতে কৃষির প্রসঙ্গ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যে বীজ বপন করো, সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি? তোমরা তাকে উৎপন্ন করো, না আমি উৎপন্নকারী?’ (সুরা ওয়াকিয়া : ৬৩-৬৪) 

কৃষির জন্য পানি একটি অপরিহার্য উপাদান। পানি ছাড়া এই জমিনে কোনো কিছু উৎপন্ন করা সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। অতঃপর আমি এর দ্বারা সর্বপ্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি। অতঃপর আমি এ থেকে সবুজ পাতা উদগত করেছি, যা থেকে ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা উৎপন্ন করি। খেজুরের কাঁদি থেকে গুচ্ছ বের করি, যা নুয়ে থাকে এবং আঙুরের বাগান, জায়তুন ও আনার পরস্পর সাদৃশ্যযুক্ত এবং সাদৃশ্যবিহীন (উৎপন্ন করি)।

বিভিন্ন গাছের ফলের প্রতি লক্ষ করো, যখন সেগুলো ফলন্ত হয় ও তার পরিপক্বতার প্রতি লক্ষ করো। নিশ্চয়ই এগুলোর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য। ’ (সুরা আনআম : ৯৯) 

হাদিস শরিফেও জমি চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। ভূমি যেন পতিত অবস্থায় না থাকে, সে জন্য নবীজি (সা.) বলেন, ‘যার কোনো জমি আছে, সে যেন তা চাষাবাদ করে। অথবা অন্য ভাইকে দান করে দেয় (তবুও যেন অনাবাদি না থাকে)। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৪৯৩)

সালফে সালেহিন ও খলিফাদের কৃষির প্রতি গুরুত্ব

সালফে সালেহিন তথা সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িন কৃষি উন্নয়নের প্রতি খুব মনোযোগী ছিলেন। হজরত ওসমান (রা.)-কে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি বৃদ্ধ বয়সে বৃক্ষ রোপণ করছেন কেন? তিনি জবাব দেন, ‘সৎ কর্মরত অবস্থায় আমার মৃত্যু হওয়া ফাসাদরত অবস্থা থেকে উত্তম। ' একবার আবু দারদা (রা.) আখরোটগাছ রোপণ করছিলেন। তখন তাঁকে বলা হয়, আপনি বৃদ্ধ বয়সে এটা কেন লাগাচ্ছেন? অথচ এর ফল পেতে ২০ বছর (অর্থাৎ অনেক) সময় লাগবে। তিনি জবাব দেন, আজর তথা প্রতিদান ছাড়া আমার অন্য কোনো চাহিদা নেই। ’ (নুজহাতুল আনাম, পৃ. ১৮৫)

আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ধনী হওয়া সত্ত্বেও মাঠে কোদাল নিয়ে নিজ হাতে পানি সেচের ব্যবস্থা করে দিতেন। তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) সর্বপ্রথম মদিনার জমিতে গম চাষ করেন। এত বিশাল এলাকাজুড়ে চাষাবাদ করেন যে উৎপন্ন শস্য মদিনাবাসীর এক বছরের খোরাকি হয়ে যেত। ফলে সিরিয়া থেকে খাদ্যশস্য আমদানি নিষ্প্রয়োজন হয়ে পড়ে। (তারিখে দিমাশক : ২৫/১০২)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) চাষাবাদকে আত্মমর্যাদাময় কর্ম হিসেবে গণ্য করতেন। (আততারাতিব ইদরাকিয়্যাহ : ২/৫১)

অথচ পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আজকের নতুন প্রজন্ম কৃষিকে নিম্নমানের পেশা হিসেবে গণ্য করে। যে কর্মের ওপর ভিত্তি করে মানবসভ্যতা টিকে আছে, তাকে অবজ্ঞা করে। ফলে মুসলিম দেশগুলোর ভূমি চাষাবাদের জন্য সবচেয়ে বেশি উর্বর হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যপণ্যে আমাদের অমুসলিমদের কাছে হাত পাততে হয়। তাদের থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে। এই পরনির্ভরতা কবে শেষ হবে?

কৃষি উন্নয়নে খলিফা-আমিরদের অবদান

হিজরি প্রথম শতকে ইসলামী সাম্রাজ্য অর্ধজাহানে বিস্তৃত হয়। এর পর থেকে সুদীর্ঘকাল ধরে উমাইয়া, আব্বাসিয়া, উসমানিয়া খলিফারা পৃথিবী শাসন করেছেন। এসব খেলাফতের আমির-উমরা সর্বদা কৃষি উন্নয়নের প্রতি সুনজর দিয়েছেন। তাঁরা খাল-বিল খনন, সাঁকো ও বাঁধ নির্মাণ, মাজরা তথা পানি নিষ্কাশনের পথ পরিষ্কারকরণ, ভূগর্ভ থেকে সহজে পানি উত্তোলনের মেশিন স্থাপনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শুধু বসরা নগরীতেই এক লাখ ছোট-বড় নালা ছিল। যেগুলো দিয়ে সহজে পানি প্রবাহিত হতো। অনেক নালা খননকারীর নামে নামকরণ করা হতো। খলিফা হারুন অর রশীদের স্ত্রী কর্তৃক খননকৃত ‘নহরে জুবাইদা’ ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।

এসব কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়। কৃষক-বণিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হজরত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা.) ‘নহরে সাদ’ খননের প্রস্তুতি নেন। এ জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। খননকার্য কিছুদূর এগোনোর পর বিশাল এক পাহাড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তখন খননকার্য বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আস সাকাফি (তাঁর যুগে) আবার খননকার্য শুরু করেন। তিনি এবার তত্ত্ববধায়কদের নির্দেশ দেন যে তোমরা দেখো, খননকর্মীদের দৈনিক খাবারের মূল্য কত? যদি খাদ্যের ওজন একজন শ্রমিকের খননকৃত পাথরের ওজনের সমপরিমাণও হয়, তবুও তোমরা খননকার্য বন্ধ করবে না। (সেই পরিমাণ মূল্য আমি দেব) পরবর্তী সময়ে বিশাল অর্থ ব্যয় করে নহরটি খনন করা হয়। (মুজামুল বুলদান : ৫/৩২১)

সে আমলে প্রাকৃতিক নালার পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে কৃত্রিম নালা ছিল। যেগুলোর মাধ্যমে কৃষকরা সহজে ক্ষেত সিঞ্চন করতে পারতেন। মধ্যযুগে খলিফাদের এসব কর্ম আধুনিক পানি বিশেষজ্ঞদের বিস্মিত করেছে।  

কৃষকদের সম্মান প্রদান

খলিফারা কৃষকদের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য অনুদান দিতেন। কৃষি উৎপাদন করতে গিয়ে যেন অর্থ সংকটে না পড়তে হয়, এ জন্য কর মওকুফ করে দিতেন। অনেক স্থানে শস্য ঘরে তোলার পর কর আদায় করা হতো। হজরত ওমর (রা.) বলতেন, তোমরা কৃষকদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। (অর্থাৎ তাদের প্রতি জুলুম কোরো না। ) হজরত আলী (রা.) কর্মচারীদের প্রতি নির্দেশনা প্রেরণ করেন যে তোমরা এক দিরহাম করের জন্য কৃষককে প্রহার কোরো না। খলিফা জিয়াদ বিন আবিহ কর্মচারীদের বলেন, তোমরা কৃষকদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। কেননা তারা যত দিন মোটা-তাজা থাকবে, তোমরাও তত দিন মোটা-তাজা থাকতে পারবে। (অর্থাৎ সুখে থাকবে। ) (তাসহিলুন নজর, পৃ. ১৫৯) 

অনেক খলিফা যুদ্ধের সময় মুসলিম সেনাপতি ও সৈন্যদের কঠোরভাবে নিষেধ করতেন, তারা যেন কোনো ফসলি জমি নষ্ট না করে। ক্ষেত-খামারে অগ্নিসংযোগ না করে। একজন কৃষক যে ধর্মেরই হোক না কেন, তাকে যেন আক্রমণ না করা হয়।  

পূর্বসূরিদের কৃষিকর্মে এত মনোযোগিতার ফলে আমরা দেখতে পাই যে তাদের প্রতিদিনের খাবার নিজেরাই উৎপাদন করতেন। মুসলিম বিশ্বের খাদ্যচাহিদা নিজেদের ভূমিতেই যথেষ্ট ছিল। জনৈক ইতিহাসবিদ বলেন, ‘তদানীন্তন মুসলিম বিশ্ব বাইরে থেকে খাদ্যসামগ্রী আমদানি করেছিল। এই তথ্য আমি কোথাও খুঁজে পাইনি। ’ (আহমদ আমিন, জহলুল ইসলাম : ২/২৪৬)

এ ছাড়া তৎকালীন মুসলিম পণ্ডিতরা চাষাবাদ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। মানুষের আগ্রহের কারণে এটি একটি স্বতন্ত্র বিদ্যায় পরিণত হয়, যা ‘ইলমুয যিরাআহ’ (কৃষিবিদ্যা) নামে পরিচিতি লাভ করে। মাটির প্রকারভেদ, শস্যবীজ উৎপাদন পদ্ধতি, ভ‚গর্ভ থেকে পানি উৎসারণপদ্ধতি, বিভিন্ন শস্য, শাকসবজি ও ভেষজ ফলের পরিচয়সহ চাষাবাদের নিয়ম-কানুন নিয়ে প্রচুর গ্রন্থ রচিত হয়। উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগের গ্রন্থভাণ্ডার এর সাক্ষী। সুতরাং এই দাবি অতিরঞ্জন নয় যে বর্তমান যুগে পশ্চিমারা আধুনিক কৃষিবিদ্যা মধ্যযুগের মুসলিম পণ্ডিতদের লিখিত বই থেকেই ধার করে নতুন আকৃতিতে প্রকাশ করেছে।  

তাই চাষাবাদকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষত মুসলিম বিশ্বের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়।

লেখক : উচ্চশিক্ষার্থী, আরবি সাহিত্য, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব


মন্তব্য