kalerkantho


ঐতিহাসিক বদর দিবসের ভাবনা

মুফতি শাহেদ রহমানি    

৩ জুন, ২০১৮ ১১:৫৬



ঐতিহাসিক বদর দিবসের ভাবনা

আজ ১৭ রমজান, ঐতিহাসিক বদর দিবস। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মার্চ, হিজরি দ্বিতীয় বর্ষের ১৭ রমজানে ৩১৩ জন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মহানবী (সা.) মদিনা শরিফের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বদর নামক স্থানে কাফিরদের সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মিলিত হন। এ যুদ্ধকে ‘বদর যুদ্ধ’ নামে অভিহিত করা হয়। ইসলাম ও মুসলিমদের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বুকে ধারণ করে আছে এই রমজান মাস। সেগুলো বিশেষভাবে মুসলমানদের ত্যাগ, বিজয় ও সফলতার ইতিহাসসমৃদ্ধ। ড. ওহাবা জুহাইলি (রহ.) তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু’র মধ্যে মাহে রমজানের বৈপ্লবিক দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যুগে যুগে মুসলমানরা কিভাবে রমজান উদযাপন করেছেন। মুসলমানরা শান্তভাবে সিয়াম সাধনা করে। বিতর্ক ও বিবেকহীন কাজকর্ম পরিহার করে তারা রোজা রাখে। কিন্তু কেউ অন্যায় করলে তাকে প্রশ্রয় দেয় না। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে না। এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। মক্কার অদূরে বদর নামক স্থানে এ মাসেই সংঘটিত হয়েছিল ঈমান ও কুফরের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে তথা দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান এ প্রান্তরেই সংঘটিত হয়েছিল মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র মুসলমানের মোকাবেলায় শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয় কাফির বাহিনীর সহস্রাধিক সশস্ত্র সৈন্যকে। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সরাসরি তিন থেকে পাঁচ হাজার ফেরেশতা দিয়ে মুসলমানদের সাহায্য করা হয়। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে মহাবিপ্লব সাধিত হয়েছে। তাই পবিত্র কোরআনে এ যুদ্ধকে ‘ইয়াওমুল ফোরকান’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বদর যুদ্ধে আবু জাহেল, উতবা, শায়বাসহ মোট ৭০ জন কাফির নিহত হয়। আরো ৭০ জন কাফির মুজাহিদদের হাতে বন্দি হয়। অন্যদিকে ১৪ জন মুসলিম মুজাহিদ বীরবিক্রমে লড়াই করে শাহাদাতের গৌরব অর্জন করেন। বন্দিদের সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর ক্ষমাসুলভ আচরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে পরবর্তী সময়ে অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া আরো বহু ঘটনা আছে, যেগুলো রমজানের বৈপ্লবিক দিক স্পষ্ট করে তোলে। যেমন—অষ্টম হিজরির ২০ বা ২১ রমজান জুমাবার রাসুল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম মক্কা বিজয় করেন। অষ্টম হিজরির ২৫ রমজান মহানবী (সা.) হজরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একদল সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন নাখলা নামক জায়গার একটি বৃহদাকার মূর্তি অপসারণের জন্য, কাফিররা এর পূজা করত—যার নাম ছিল উজ্জা। হজরত খালেদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) নিজ হাতে ওই মূর্তি অপসারণ করেন। এরপর তিনি বলেন, আর কখনো এখানে উজ্জার উপাসনা হবে না। (আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ : ৪/৩১৬)

নবম হিজরির রমজান মাসে তায়েফের সাকিফ গোত্র স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং তারা নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের উপাস্য ‘লাত’ নামক মূর্তি অপসারণ করে। (আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ : ৫/৩১৬)

এক বর্ণনা অনুযায়ী কাদেসিয়া যুদ্ধ ১৫ হিজরি সালের রমজান মাসে সংঘটিত হয়। সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলমান ও রুস্তম ফাররাখজাদের নেতৃত্বে পারসিকদের মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। (আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ : ৯/৬১৩)

এ যুদ্ধে মুসলিম সৈন্য ছিল সর্বসাকল্যে ৩৬ হাজার বা তার চেয়ে কিছু বেশি। আর কাফিরদের সৈন্য ছিল দুই লাখ। চার দিন ও তিন রাত প্রচণ্ড যুদ্ধ চলার পর কাদেসিয়া যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। মাত্র ৩৬ হাজার মুসলিম সৈন্য দুই লাখ সুসজ্জিত পারসিক বাহিনীকে পরাজিত করে। এ যুদ্ধের ফলে ওই অঞ্চল ইরাকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং সেখানে ইসলামের প্রচার-প্রসারের সব বাধা দূরীভূত হয়।

৯২ হিজরি সালের ২৮ রমজান সিপাহসালার তারেক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী রডারিকের সৈন্যকে পরাজিত করে স্পেন জয় করে। স্পেন জয় ইউরোপে ইসলাম প্রচারে সবিশেষ ভূমিকা রাখে। এসব ইতিহাস মুসলমানদের কিছুতেই ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

লেখক : সিইও, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা। 


মন্তব্য