kalerkantho


রোজার দার্শনিক তত্ত্ব

মুফতি শাহেদ রহমানি    

১০ জুন, ২০১৮ ১২:০৫



রোজার দার্শনিক তত্ত্ব

রোজা নিছকই উপবাস থাকা, পানাহার ও কামাচার বর্জনের নাম নয়। এর বিশেষ তাৎপর্য ও দর্শন রয়েছে। রয়েছে এর দৈহিক, আত্মিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপকারিতা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাকওয়া অর্জনকেই রোজার প্রধান উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগের লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

মুসলিম মনীষীরা রোজার আরো কিছু উপকারিতার কথা লিখেছেন। হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) লিখেছেন, ‘বিশুদ্ধ যুক্তি অনুসারে মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও আবেগের ওপর বিবেকের সর্বদা প্রভাব বিস্তার করা উচিত। কিন্তু মানবীয় দুর্বলতার কারণে অনেক সময় বিবেকের ওপর মানুষের আবেগ প্রাধান্য লাভ করে। তাই আত্মশুদ্ধি ও আত্মজাগৃতির জন্য ইসলাম রোজাকে মৌলিক ইবাদতগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছে। রোজা রাখার দ্বারা মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও আবেগের ওপর বিবেক পরিপূর্ণভাবে বিজয়ী হয়। এতে তাকওয়ার গুণাবলি অর্জিত হয়। রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষের নিজের অক্ষমতা ও অপারগতা এবং আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও কুদরতের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। রোজার মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়, দূরদর্শনের ধারণা প্রবল হয়। আসবাব ও উপকরণের হাকিকত খুলে যায়। পাশবিকতা ও পশুত্ব অবদমিত হয়। ফেরেশতাদের নৈকট্য লাভ হয়। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়ের সুযোগ হয়। অন্তরে মানবিকতা ও সহমর্মিতার বন্যা বয়ে যায়। রোজা দেহ-আত্মার সুস্থতার কারণ। রোজা মানুষের জন্য এক রুহানি খাদ্য, যা পরকালে মানুষের জন্য খাদ্যের কাজ দেবে। সর্বোপরি রোজা আল্লাহর ভালোবাসার অন্যতম নিদর্শন।’ (আহকামে ইসলাম আকল কি নজর মে, পৃ. ১৪৩-১৪৫, সংক্ষেপিত।)

দুটি বিপরীত বস্তু দেহ-মনের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি। দেহ মাটির তৈরি। আর রুহ বা আত্মা আল্লাহর হুকুম বা নূরের তৈরি। মাটি নিম্নগামী। আর রুহ ঊর্ধ্বগামী। মাটির বৈশিষ্ট্য যখন মানুষের মধ্যে প্রবল হয়, তখন সে মনুষ্যত্বটুকুও হারিয়ে ফেলে। বরং চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে আত্মার শক্তি যখন তার মধ্যে প্রবল হয়, তখন সে মারেফতে এলাহি অর্জনে সক্ষম হয়। এমনকি উৎকর্ষের বিচারে ফেরেশতাকুলকেও ছাড়িয়ে যায়। মানুষ পশু নয়, নয়তো ফেরেশতাও। পশুসুলভ গুণ ও ফেরেশতাসুলভ গুণের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি। এ দুয়ের দ্বন্দ্বও চিরন্তন। মুসলিম দার্শনিক শাহ ওয়ালি উল্লাহ (রহ.)-এর মতে, ‘যখন প্রবল পশুসুলভ গুণ ফেরেশতাসুলভ গুণ প্রকাশের পথে বাধা দেয়, তখন তাকে গুরুত্ব দিয়ে অবদমিত করা জরুরি। আর পশুসুলভ গুণের প্রাবল্য, উন্নতি ও ক্রমবৃদ্ধি ঘটে পানাহার ও জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে। তাই পশুত্ব অবদমনে এই উপকরণগুলোর সংকোচনের বিকল্প নেই।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, খ. ২, পৃ. ৪৮)

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম আল-জাওজি (রহ.) বলেন, ‘মানুষের আত্মিক ও দৈহিক শক্তি সংরক্ষণে রোজা অত্যন্ত কার্যকর। একদিকে তা মানুষকে পাশবিক চাহিদার প্রাবল্য থেকে মুক্ত করে তার দৈহিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করে। অন্যদিকে তা নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে আত্মিক সুস্থতা বিধান করে। সিয়াম সাধনার মাধ্যমেই মানুষ আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে। চিরন্তন জীবনের অনন্ত সফলতার স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করে।’

ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর মতে, ‘আখলাকে ইলাহি তথা আল্লাহর গুণে মানুষকে গুণান্বিত করে তোলাই রোজার উদ্দেশ্য। রোজা মানুষকে পানাহার ও জৈবিক চাহিদা বর্জন করে ফেরেশতাদের অনুকরণের মাধ্যমে যত দূর সম্ভব নিজেকে প্রবৃত্তির গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়।’ (এহইয়াউল উলুম, খণ্ড ১, পৃ. ২১২) আল্লাহ তাআলা আমাদের যথাযথভাবে রোজা রাখার তাওফিক দান করুন।

লেখক : সিইও, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা 


মন্তব্য