kalerkantho

শবেকদরের সন্ধান

মুফতি শাহেদ রহমানি    

১২ জুন, ২০১৮ ১১:৩৬



শবেকদরের সন্ধান

আজকের দিন শেষে যে রাত আসছে, তা ২৭ রমজানের রাত। এটি ‘শবেকদর’ বা ‘লাইলাতুল কদর’ হিসেবে পরিচিত। তাই এ রাতকে বিশ্বের মুসলমানরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে। লাইলাতুল কদরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এই গৌরবময় রজনীতে মানুষের সারা বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। এ রাতে মানবজাতির মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল-কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।

 ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ (সুরা : কদর, আয়াত : ১-৩)

এটি শ্রেষ্ঠতম রাত। এ রাতের ইবাদতে রয়েছে সবিশেষ গুরুত্ব। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদত করে, তার আগের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ৭৬০; বুখারি, হাদিস : ২০১৪)

রমজানের ২৭তম রজনী কি শবেকদর?

শবেকদর সম্পর্কে সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও বিতর্কমুক্ত অভিমত হলো, শবেকদর শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে কারো জন্য ইবাদত করা সম্ভব হলে ২৭তম রাতে কিছুতেই উদাসীন থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে ওই দিন মাগরিব ও এশার নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে আদায় করলে শবেকদরের ফজিলত পাওয়া যাবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়ে, সে যেন সারা রাত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৬৫৬)

এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ বলে থাকেন, ২৭তম রজনীকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া অবৈধ কিংবা বিদআত! অথচ এর সপক্ষে হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামদের আমল রয়েছে। উবাই ইবনে কাব (রা.) একবার ২৭তম রমজানে বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি তা সম্পর্কে অবগত আছি। (আর তা হলো ২৭তম রাত) কেননা রাসুল (সা.) এ রাতে আমাদের নামাজে দাঁড়াতে আদেশ করতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৭৬২)

অনুরূপ ধারণা পোষণ করতেন মুয়াবিয়া (রা.), ইবনে আব্বাস (রা.), হজরত হাসান (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)। (কুরতুবি)

তা ছাড়া সুরা কদরে শব্দ রয়েছে ৩০টি। সেখানে রয়েছে ‘হিয়া’ শব্দ, যা দ্বারা লাইলাতুল কদর বোঝানো হয়েছে। ওই শব্দটি রয়েছে ২৭ নম্বরে। তাই ২৭তম রাতে শবেকদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে তাফসিরে কবিরে এসেছে, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘প্রিয় গণনা আল্লাহর কাছে বিজোড়। আর বিজোড়ের মধ্যে প্রিয় হলো সাত। তাই তিনি আসমান সাতটি বানিয়েছেন, জমিন সাতটি বানিয়েছেন, আর সপ্তাহে সাত দিন দিয়েছেন। জাহান্নামের স্তর সাতটি। তাওয়াফের চক্কর সাতটি, সিজদায় সাত অংশ ব্যবহার করা হয়, তাই লাইলাতুল কদর ২৭ তারিখ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’ (তাফসিরে কবির, খণ্ড ৩২, পৃষ্ঠা ২৩০)

এসব কারণে অনুমান করা হয় যে ২৭তম রাতে শবেকদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

শবেকদরের আমল : দুই ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যকার ঝগড়াবিবাদ মিটিয়ে দেওয়া শবেকদরের অন্যতম ইবাদত। উবাদা ইবনে সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী করিম (সা.) আমাদের কদর রজনীর খবর দেওয়ার জন্য বের হয়েছেন। তখন দুজন মুসলিম পরস্পর ঝগড়া করে। তিনি বলেন, আমি বের হলাম তোমাদের কদর রজনীর খবর দেওয়ার জন্য। কিন্তু অমুক অমুক ঝগড়া করে, অতঃপর তা তুলে নেওয়া হয়েছে। এতে তোমাদের কল্যাণ থাকতে পারে। তাই তোমরা শেষের পঞ্চম, সপ্তম ও নবম তারিখে তালাশ করো।’ (বুখারি, হাদিস : ২০২৩)। তাই বিশেষভাবে এ রাতে বিবাদ মীমাংসা, হিংসা পরিহার ও ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হওয়া উচিত। পাশাপাশি এ রাতের জন্য বিশেষ একটি দোয়া আছে। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছি, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! যদি আমি শবেকদর পেয়ে যাই, তাহলে আল্লাহর কাছে কী দোয়া করব? রাসুল (সা.) বলেন, এই দোয়া পড়বে—‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুম তুহিব্বুল আফওয়া ফা‘ফু আন্নি।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাকারী এবং আপনি ক্ষমা পছন্দ করেন। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’

লেখক : সিইও, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা


মন্তব্য