kalerkantho


ইসলামী দৃষ্টিকোণে আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৬ জুলাই, ২০১৮ ১১:৩৭



ইসলামী দৃষ্টিকোণে আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি

চারদিকে যখন উন্নতির জোয়ার বইছে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানেও মানুষ পিছিয়ে নেই। রোগ যেমন বাড়ছে, প্রতিষেধকও তৈরি হচ্ছে সমানভাবে। বর্তমানে এমন কিছু চিকিৎসা ও ডাক্তারি পরীক্ষা আবিষ্কৃত হয়েছে, যার কোনোটি ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ, কোনোটি নাজায়েজ। নিম্নে এমন কিছু চিকিৎসা ও তার বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হলো—

প্লাস্টিক সার্জারি : সৌন্দর্যবর্ধন, ফ্যাশনদুরস্ত বা শারীরিক ত্রুটি নিরাময় করতে অনেকেই প্লাস্টিক সার্জারি করে থাকেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের সার্জারিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক. প্লাস্টিক সার্জারি (plastic surgery); দুই. কসমেটিক সার্জারি (cosmetic surgery)|

প্রয়োজনীয় শারীরিক ত্রুটি সারাতে যে সার্জারি করা হয়, তাকে প্লাস্টিক সার্জারি বলা হয়। ইসলাম এর অনুমোদন দিয়েছে। যেমন—পোড়া বা আঘাতজনিত ক্ষত সারিয়ে তোলা, ক্যান্সারে আক্রান্ত অঙ্গ বা টিউমার অপসারণের পর ক্ষতস্থানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা অথবা ঠোঁটকাটা, তালুকাটা, অতিরিক্ত আঙুল বা অন্যান্য জন্মগত ত্রুটি দূর করা। হাদিস শরিফ থেকে এ ধরনের অপারেশন বা সার্জারির অনুমতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একটি হাদিসে এসেছে, ‘কুলাব যুদ্ধে সাহাবি আরফাজা বিন আসয়াদ (রা.)-এর নাক কেটে যায়। তিনি রুপার একটি কৃত্রিম নাক বানিয়ে নেন। কিন্তু এতে দুর্গন্ধ দেখা দেয়। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশে একটি স্বর্ণের নাক বানিয়ে নেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪২২৬)

সুতরাং বোঝা গেল, প্রয়োজনীয় শারীরিক ত্রুটি সারাতে সার্জারি করা বৈধ। (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম : ৪/১৯৫)

সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং নিজেকে আরো আকর্ষণীয় করার জন্য যে সার্জারি করা হয়, তাকে কসমেটিক সার্জারি বলে। যেমন—নাক, চিবুক, ঠোঁট, চোখের পাতা, কান, স্তন—এসব অঙ্গের সার্জারি করে আকর্ষণীয় করে তোলা। ইসলাম এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে উত্তম অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : ত্বিন, আয়াত : ৪)

এর পরও নিজেকে অনাকর্ষণীয় মনে করে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন সাধিত করা হারাম। কোরআনে এটিকে শয়তানের কর্ম বলা হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ওই নারীর ওপর অভিশাপ দিয়েছেন, যে অন্য নারীর মাথায় কৃত্রিম চুল সংযোজন করে বা নিজ মাথায় চুল সংযোজন করায়; আর যে নিজের শরীরে উল্কি আঁকে বা অন্যকে আঁকিয়ে দিতে বলে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৩৭)

পোস্টমর্টেম : শরিয়তের দৃষ্টিতে মানুষ জীবিতাবস্থায় যেমন সম্মানিত, মৃত্যুর পরও তেমনি সম্মানিত। জীবিত মানুষকে কষ্ট দেওয়া যেমন অপরাধ ও গুনাহ, তেমনি মৃত্যুর পরও কাউকে কষ্ট দেওয়া অপরাধ ও গুনাহর কাজ। সুতরাং একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কারো লাশ কাটাছেঁড়া বা পোস্টমর্টেম করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। তবে বিশেষ প্রয়োজন যেমন মামলা-মোকদ্দমার ক্ষেত্রে পোস্টমর্টেম করার অবকাশ রয়েছে। বর্তমানে হত্যার কারণ ও হত্যাকারী জানা সত্ত্বেও পুলিশ পোস্টমর্টেমের নির্দেশ দেয়। ইসলামী শরিয়ত এর অনুমিত দেয় না। (ইমদাদুল ফাতাওয়া : ১/৭৪১)

মরণোত্তর দেহ দান : কেউ যদি মৃত্যুর সময় শরীরের কোনো অঙ্গ কাউকে দান করার অসিয়ত করে যায়, তাহলে এ অসিয়ত বিশুদ্ধ নয়। কেননা অসিয়ত শুদ্ধ হওয়ার শর্ত হলো, অসিয়তকারী যে বস্তুর অসিয়ত করছে, সে উক্ত বস্তুর মালিক হতে হবে। সেই সঙ্গে সে বস্তুটিও মালিকানা হওয়ার যোগ্য হতে হবে। আর মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পদ নয়। আর না সে নিজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মালিক। তাই অঙ্গ দান বা অঙ্গ বিক্রি করা শরিয়তে জায়েজ নেই। (শামি : ৭/২৪৫)

টেস্টটিউব বেবি : নিজের স্বামী ছাড়া অন্যের বীর্যের মাধ্যমে টেস্টটিউব করা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। তবে যদি উভয়ে স্বামী-স্ত্রী হয়, বীর্যও স্বামীর হয়, বীর্য গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো হারাম পন্থা অবলম্বন করা না হয় এবং টেস্টটিউবের সব কার্যক্রম সম্পাদনে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির হস্তক্ষেপ না থাকে—অর্থাৎ সব কাজ স্বামী-স্ত্রীই সম্পন্ন করে নেয়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে শুধু এই সুরতে টেস্টটিউব বৈধ হতে পারে; বিকল্প কোনো পদ্ধতিই বৈধ নয়। (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া : ১/২২৬)

রক্তদান ও ক্রয়-বিক্রয় : মুফতি শফি (রহ.) লিখেছেন, ‘রক্ত মানবদেহের অংশবিশেষ। দেহ থেকে নির্গত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা নাপাক হয়ে যায়। নাপাক বস্তুর ব্যবহার নিষিদ্ধ বিধায় এবং সৃষ্টির সেরা জীব মানব অঙ্গের মর্যাদার কথা বিবেচনা করে স্বাভাবিক অবস্থায় রক্তদান নিষিদ্ধ। তবে যদি কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তার রোগীর ব্যাপারে বলেন যে এই মুহূর্তে তাকে রক্ত না দিলে তার মৃত্যু হবে কিংবা কোনো অঙ্গহানি বা মারাত্মক শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে; আর এর বিকল্প কোনো ওষুধও পাওয়া না যায়, তাহলেই তাকে স্বেচ্ছায় রক্ত দেওয়া যাবে, অন্যথায় রক্ত দেওয়া বা বিক্রি করা বৈধ নয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৩২৮)

মানব অঙ্গসংযোজন : অঙ্গসংযোজনের তিনটি পদ্ধতি আমাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। প্রথমত, জড় বস্তুর মাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে অঙ্গসংযোজন করা। যেমন—কৃত্রিম দাঁত, শ্রবণযন্ত্র, কৃত্রিম পা প্রতিস্থাপন ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসার জন্য মানবদেহে অন্যান্য প্রাণীর অঙ্গবিশেষ প্রতিস্থাপন করা। ইসলামী শরিয়ত মতে, উপরোক্ত দুটি পদ্ধতিই বৈধ। তবে তৃতীয় পদ্ধতি—অর্থাৎ মানবদেহে একে অন্যের অঙ্গ সংযোজন বা দান করা অবৈধ। (ফাতাওয়ায়ে হক্কানি : ২/৬৫৫)

জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি : অবস্থা ও পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ কখনো জায়েজ আবার কখনো নাজায়েজ। মৌলিকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের তিনটি পদ্ধতি রয়েছে। এক. জন্মনিয়ন্ত্রণের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যার দ্বারা নারী বা পুরুষ প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। দুই. অস্থায়ীভাবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যার ফলে স্বামী-স্ত্রীর কেউ প্রজনন ক্ষমতাহীন হয়ে যায় না। যেমন—কনডম ব্যবহার করা, পিল সেবন করা ইত্যাদি। তিন. গর্ভধারণের পর গর্ভপাত ঘটানো। প্রথম পদ্ধতিটি গ্রহণ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। কেননা এতে আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। তবে এ ক্ষেত্রেও কখনো কোনো অভিজ্ঞ দ্বিনদার ডাক্তারের বক্তব্য মতে গর্ভধারণের কারণে মায়ের প্রাণনাশের আশঙ্কা হলে স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করা বৈধ। আর দ্বিতীয় পদ্ধতি শুধু নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে বৈধ হবে। ১. দুই বাচ্চার জন্মের মাঝে কিছু সময় বিরতি দেওয়া, যাতে প্রথম সন্তানের লালন-পালন, পরিচর্যা ঠিকমতো হয়। ২. কোনো কারণে মহিলার বাচ্চা লালন-পালনের সামর্থ্য না থাকলে। ৩. মহিলা অসুস্থ ও দুর্বল হওয়ার কারণে গর্ভধারণ বিপজ্জনক হলে। তবে ভালোভাবে মনে রাখা দরকার যে এসব ক্ষেত্রে বৈধতা শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজনে। রাষ্ট্রীয় ও সম্মিলিতভাবে মানুষের কাছে প্রচারণা করা এবং এতে উদ্বুদ্ধ করা কোনোভাবেই বৈধ নয়। আর তৃতীয় পদ্ধতিও নাজায়েজ। তবে যদি মহিলা অত্যধিক দুর্বল হয়, যার কারণে গর্ভধারণ তার জন্য আশঙ্কাজনক হয় আর গর্ভধারণের মেয়াদ চার মাসের কম হয়। তাহলে গর্ভপাত বৈধ হবে। আর মেয়াদ চার মাসের অধিক হলে বৈধ নয়। (মুসলিম শরিফ : ২/৩১৯, জাদিদ ফিকহি মাসায়েল : ১/৮৭৬)

ওষুধ খেয়ে ঋতুস্রাব বন্ধ রাখা : ওষুধ খেয়ে ঋতুস্রাব বন্ধ রাখা জায়েজ। আর ঋতুস্রাব বন্ধ রাখার পর স্বামী-স্ত্রীর সহবাসে কোনো অসুবিধা নেই। তবে এভাবে ঋতুস্রাব বন্ধ রাখলে শরীরের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই ওষুধ না খাওয়াই উত্তম। (ফাতাওয়া রহিমিয়া : ৬/৪০৪)

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলুম ভাগ্নীবাড়ি মাদরাসা, সাভার, ঢাকা। 



মন্তব্য