kalerkantho


অন্য কোনোখানে

মণিপুরিদের সরস্বতী উত্সবে

শিমুল খালেদ

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মণিপুরিদের সরস্বতী উত্সবে

চলছে নাচের অনুশীলন

বড়লেখা থেকে মৌলভীবাজারগামী বাস দক্ষিণভাগ পৌঁছার পর হুড়মুড় করে নেমে পড়ি। বন্ধু সৌরভ ওখানে অপেক্ষায় ছিল। হাতে সময় কম। তাই দ্রুত চায়ের কাপ খালি করেই রাস্তার পাশের টং দোকান থেকে বেরিয়ে পড়তে হলো। সৌরভ আগে থেকেই বাহন হিসেবে একটি রিকশা ঠিক করে রেখেছিল। ছোট ধামাইয়ের উদ্দেশে দক্ষিণভাগ ছাড়ার সময় সন্ধ্যার শেষ চিহ্নটুকুও প্রকৃতি থেকে বিদায় নিয়েছে। অন্ধকার জেঁকে বসতে শুরু করেছে। টিলার বাঁকে বাঁকে এঁকেবেঁকে চলে গেছে পিচঢালা পথ। সেই পথ শেষ হয়ে গেলে আমাদের রিকশা এবড়োখেবড়ো কাঁচা রাস্তায় এসে পড়ে। ছড়ানো-ছিটানো পাথর আর গর্তের ফাঁক-ফোকর ঠেলে ত্রিচক্রযানখানা এগিয়ে যাচ্ছে! আমাদের তো ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা! ওদিকে মণিপুরি বন্ধু জয়দা’র ফোনকলে বারবার বেজে উঠছিল সৌরভের মোবাইল। দাদার জিজ্ঞাসা, আমাদের পৌঁছতে আর কতক্ষণ? ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে আন্দাজে ঢিল মেরে দূরত্ব বলে যাচ্ছিলাম। পথে পথে কোথাও রিকশা টিলার মাথায় উঠে যাচ্ছিল, আবার পাথর-বালুর সঙ্গে টক্কর খেতে খেতে ডাউনহিল ধরে নামছিল। রাস্তার দুই পাশের বনানীর ঘন বুনোট যেন আঁধারকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। ওদিকে শীতও জেঁকে বসেছে বেশ। গায়ে ভারী কাপড়চোপড় থাকার পরও শরীরে কাঁপনি দিচ্ছে।

চড়াই-উতরাইয়ের পর সামনে পড়ল চা বাগান। ছোট ধামাই চা বাগান। বাগানের মধ্য দিয়ে টিলা কেটে বানানো সরু খালের মতো পথ সামনে গিয়ে দুই ভাগ হয়ে গেছে। সেই পথে পড়ল বাগান কর্তৃপক্ষের চেকপোস্ট। ডানের রাস্তাটা বড় ধামাইয়ের আর বাঁয়েরটি চলে গেছে ছোট ধামাইয়ের দিকে। ছোট ধামাইয়ের পথ ধরে কিছুদূর যাওয়ার পর কানে আসে মাইকের শব্দ। ততক্ষণে চা বাগান শেষ হয়ে এসেছে। বাকি পথটুকু পেরিয়ে যখন পৌঁছলাম, অনুষ্ঠান তখন শুরু হয় হয় করছে। জয়দাসহ অন্যদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়ের পর চেয়ার টেনে বসে পড়ি অনুষ্ঠান উপভোগ করতে। দর্শকদের অনেকেই চেয়ার না পেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরও সামনের দিকে মঞ্চের কাছাকাছি আমাদের জন্য চেয়ার ঠিক করে রেখেছিলেন জয়দা।

বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বর্ণাঢ্য জীবনধারা চোখে পড়বে, তার মধ্যে সিলেট অন্যতম। সিলেটের প্রধান দুটি নৃগোষ্ঠীর অন্যতম একটি মণিপুরি সম্প্রদায়। মণিপুরিদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধিশালী। প্রধান উত্সব রাসমেলা। এ ছাড়া চৈত্র উত্সব, বসন্তবরণ, সরস্বতী উত্সবসহ মণিপুরিরা সারা বছরই বিভিন্ন উত্সব-পার্বণে মেতে থাকে। এই উত্সবটি আয়োজন করা হয়েছে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে।


মণিপুরি নৃত্যের বিশেষ ভঙ্গিমায়
স্থানীয় মণিপুরি সাংস্কৃতিক সংস্থার মাঠে আয়োজন করা হয়েছে অনুষ্ঠানটি। ব্যানারের নিচে জ্বলজ্বল করছে আয়োজক সংস্থার নাম—‘নাহারোল অপুন্না লুপ’ বা সংক্ষেপে ‘নাল’। সহযোগিতা করেছেন দুবাই ও কাতারে থাকা মণিপুরি প্রবাসীরা। ধারে-কাছে কারো হাতঘড়িতে ঘণ্টা বাজার শব্দ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থাপকের মাইক্রোফোন হাতে একজন মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। শুরুতেই পরিবেশিত হয় মণিপুরি সংগীত—‘অ ঈমা বোথা বাঙ্গিমা নাঙ্গতুঙ্গছি দাইছে ঈমা।’ শিল্পীর সুরেলা কণ্ঠ! গান চলাকালে দর্শক গ্যালারি শান্ত থাকলেও শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তুমুল করতালিতে ফেটে পড়ার অবস্থা। এরপর ছোট ছোট বালকদের আকর্ষণীয় নৃত্য পরিবেশনা ‘থামই মাসাক’ দর্শকের মনে সাড়া ফেলার মতো। বলা বাহুল্য, এবারও তুমুল করতালি। ক্যামেরাটা একটু দর্শকদের দিকে ঘুরিয়ে ছবি তোলার পজিশন ঠিক করছি মাত্র, হঠাত্ কান ফাটানো করতালি! ব্যাপার কী? মাথা ঘুরিয়ে মঞ্চের দিকে চেয়ে দেখি এক মণিপুরি তরুণী সাপুড়িয়ার সাজে মঞ্চে উঠে এসেছে। তার পরিবেশনার পর সাড়ে ৯টার দিকে জনপ্রিয় ওড়িশা গান ‘চল গরি লে যাব তোকে মোর গাঁয়’ গানের সঙ্গেও ছিল চমত্কার নৃত্যের পরিবেশনা। এরপর ‘নুংসি রুমিউ নুংসি আইঅং দাভা’ গানের সঙ্গে এক মণিপুরি ছোট্ট শিল্পীর একক নৃত্য  পরিবেশনা। ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি পোশাকে ‘কিছিছে নাংথাং নাংথাং সুরাং লাইয়াং মাবুছি’ গানের সঙ্গে দারুণ দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে কয়েকজন মণিপুরি তরুণী। এরপর পর্যায়ক্রমে কয়েকটি বাংলা গানের তালে তালে মণিপুরি নৃত্য পরিবেশিত হয়। রাত ঘনিয়ে আসার সময় পুরোপুরি মণিপুরি ভাষায় পরিবেশিত হয় কমেডি নাটক ‘অপারেশন সিক্সটি নাইন’। নাটকটির সংলাপ শুনে মণিপুরি দর্শকরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। আমরাও আর কী করি, পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে একটু-আধটু হেসে নিলাম। রাত আরো গভীর হয়ে এলে কয়েকটি দেশাত্মবোধক গানের পর অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

ভিড় হালকা হয়ে এলে মঞ্চের পাশে সুসজ্জিত সরস্বতী দেবীর প্রতিমা দেখতে যাই। হিন্দু ধর্মে বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর পূজা বা আরাধনাকে উপলক্ষ করে পালিত হওয়া একটি অন্যতম প্রধান উত্সব সরস্বতী পূজা। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে মাঘ মাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে ‘সরস্বতী পূজা’ হয়ে থাকে। তিথিটি শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। মণিপুরি নৃগোষ্ঠী প্রধানত হিন্দু ধর্মের অনুসারী। আর তাই সরস্বতী পূজা পালিত হয় তাদের অন্যতম উত্সব হিসেবে। দেবীর পাশেই ছোটখাটো মেলা বসেছে। মেলায় ছেলে-বুড়ো সবার উচ্ছল চলাফেরা দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখন শীতের রাতের দ্বিপ্রহর। মেলা দেখা শেষ হলে মণিপুরি সুহূদদের থেকে বিদায় নিয়ে রিকশাওয়ালার খোঁজ করি। বেচারা এতক্ষণে ঠাণ্ডায় বেশ জমে গেছে। তাকে নিয়ে গরম গরম আরেক কাপ চায়ে গলা ভিজিয়ে ফেরার পথ ধরি। ফিরতি পথে জনমানবহীন পাহাড়ি পথে রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ভেসে আসা রাতচরা পাখি নাইটজার্সের করাত চেরার মতো ভৌতিক ডাক যেন বুকে কাঁপন ধরায়। সেসব অতিক্রম করে যখন সৌরভের বাড়ি রতুলীতে ফিরলাম, রাত তখন সোয়া ২টা পেরিয়েছে।

কিভাবে যাবেন
বড়লেখা উপজেলায় আসার জন্য ঢাকা থেকে বিয়ানীবাজারগামী বাসে আসতে পারবেন। ছোট ধামাইয়ে যাওয়ার জন্য অটোরিকশা বা রিকশা পাবেন। রাতে থাকার জন্য বড়লেখায় আছে মাঝারি মানের কিছু হোটেল। বাড়তি হিসেবে চা বাগান তো আছেই। আর এবারের ‘সরস্বতী পূজা’ আজ।


মন্তব্য