kalerkantho


বাণিজ্যযুদ্ধ শান্তভাবেই মোকাবেলা করতে চায় চীন

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৫ মার্চ, ২০১৮ ১৬:১২



বাণিজ্যযুদ্ধ শান্তভাবেই মোকাবেলা করতে চায় চীন

ছবি প্রতীকী

চীনের ছয় হাজার কোটি ডলারের পণ্যের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণায় বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতার আভাস দেখা গেলেও পরিস্থিতি শান্তভাবেই মোকাবেলা করতে চায় চীন। দেশটির গণমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছে, গতকাল শনিবার ফোনে আলাপের পর বাণিজ্যিক ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় একমত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা। তাঁরা আলোচনায়ই আগ্রহী।

চীনের রাষ্ট্রীয় এই সংবাদ সংস্থা আরো জানায়, টেলিফোন আলাপে অর্থনীতিবিষয়ক চীনের ভাইস প্রিমিয়ার লি হি যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব সেক্রেটারি স্টেভেন মুচিনকে বলেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় পেইচিং প্রস্তুত। তবে আশা করে, দুই পক্ষই যৌক্তিকভাবে বিষয়টি দেখবে এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করবে। তিনি অভিযোগ করেন, চীনের মেধাস্বত্ব অনুশীলন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে তদন্ত করেছে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির লঙ্ঘন।

এর আগে গত শুক্রবার চীন যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়ে চীন উদ্বিগ্ন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় তাদের ৩০০ কোটি ডলার পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপের হুমকি দেয় দেশটি। একই দিনে আরেক প্রতিক্রিয়ায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ব্রাসেলসে ইইউ সামিটে বলেছেন, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে শুল্ক আরোপের বিপরীতে দুর্বলতা ছাড়াই যথাযথ উত্তর দেবে ইউরোপ।

মূলত বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরির আভাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথম দেন চলতি মাসের শুরুতে। গত ৮ মার্চ নতুন এক আদেশে তিনি ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর যথাক্রমে ২৫ ও ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), চীনসহ বেশ কিছু দেশই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানায় তারা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনা পণ্যে শুল্ক আরোপের মূলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ঘাটতি। গত অর্থবছরে তাদের রপ্তানি ঘাটতি ছিল সাড়ে ৩৭ হাজার কোটি ডলার। ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার এই ঘাটতি দ্রুত সময়ের মধ্যে ১০ হাজার কোটি ডলারে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। বাণিজ্যিক অংশীদারদের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘অন্য অনেক দেশই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ন্যায্য বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। এর একটি কারণ অকপটেই বলা যায়, আমরা এটা করতে পেরেছি। আমরা স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামে শুল্ক আরোপ করতে পেরেছি।’

এই যুদ্ধে কে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন প্রশ্নে আমেরিকান কর্মকর্তারা বলছেন, চীন পাল্টা পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে চীনের লোকসানের অঙ্কটাই বড় হবে। কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে গোনা কয়েকটি সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে চীনের অনেক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব কথার চালাচালি ভয়াবহ বাণিজ্য যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, এতে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকস সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ট্রাম্পের ঘোষণায় অন্য দেশগুলোও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে; যা একটি বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করবে এবং বৈশ্বিক পুনরুদ্ধার ক্ষতিগ্রস্ত করবে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ট্রাম্পের পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে নিম্নমুখিতার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাপলের সিইও টিম কুক সবাইকে শান্ত হয়ে খোলাখুলি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে জ্ঞাত যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেখানে দুই পক্ষ সমানভাবে লাভবান নয়। এ বিষয়ে দুই দেশের সরকার আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করাই হবে যুক্তিযুক্ত।’

বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) মহাপরিচালক রবার্তো আজেভেদো দুই পক্ষকেই শান্ত থেকে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব বিশ্ব অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যা এমনিতেই পুনরুদ্ধারে রয়েছে। তিনি বলেন, যা করতে হবে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার আইনের মধ্যেই করতে হবে। এর বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে বাণিজ্য যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াবে, যাতে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না। বাণিজ্য ব্যাহত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে আমি আবারও জরুরি আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছি।’

সিএনএন মানির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি ওয়াশিংটন-পেইচিং বাণিজ্য যুদ্ধ হয় তবে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু বড় কম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাপল, বোয়িং ও ইনটেলসহ আরো কিছু কম্পানি; যারা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝে পড়ে যাবে। তবে এ প্রসঙ্গে র‌্যাবোব্যাংক গ্রুপের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থবাজার গবেষণা প্রধান মিখায়েল এভ্রি মনে করেন, তাতে চীনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, যদি তারা বোয়িং বয়কট করে তবে এয়ারবাস একচেটিয়া ব্যবসা করবে, এতে পণ্যের দাম বাড়বে। যদি তারা অ্যাপল বয়কট করে তবে চীনে অ্যাপলের কারখানায় কর্মরত চীনারা চাকরি হারাবে। রয়টার্স, এএফপি, সিএনএন মানি।


মন্তব্য