kalerkantho


পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগে পিঠটান

রফিকুল ইসলাম    

৫ জুন, ২০১৮ ১২:৩১



পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগে পিঠটান

২০১৭ সালে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে গতি পেলেও চলতি বছরে পিঠটান নিয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। আর শেয়ার বিক্রিতে মূলধন তুলে নেওয়ায় বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ কমছে। মন্দাবস্থায় বাজারে ঢুকে বাজেট ঘোষণার আগে বিদেশিদের শেয়ার বিক্রি বেড়েছে। ডলারের দাম ও ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধিতে বাজার প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কায় শেয়ার বিক্রি বেড়েছে বলে মন্তব্য পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের।

তাঁদের মতে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি পেলেও টাকার দাম অপরিবর্তিতই রয়েছে। কাজেই বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করে এখন আগের দামে ডলার কিনতে পারছে না। ডলারের দাম আরো বাড়লে লোকসান ও ব্য্যাংকে সুদের হার বাড়ায় অনেকে সঞ্চয়ে ফিরলে বাজার প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কা করছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। পুঁজিবাজার স্থিতিশীল ও ডলারের দাম কমলে বিদেশিরা আবারও পুঁজিবাজারে আসবে বলেও মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক শাকিল রিজভী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যাংকে সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় সঞ্চয়ে সুদের হার বৃদ্ধি পাবে। আর এটি বাড়লে পুঁজিবাজারও প্রভাবিত হবে এমন শঙ্কা থেকেই বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করছে। শেয়ার বিক্রি করলেও তারা একদম বেরিয়ে যাচ্ছে না। স্থিতিশীল হলে তারা আবারও বাজারে আসবে।’

ব্যাংকে সুদের হার বৃদ্ধি, আগামী বাজেট ও বিদেশিদের শেয়ার বিক্রিতে পুঁজিবাজারের অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কমানোয় তারল্যপ্রবাহ কমার সংকট সিআরআর কমালেও কাটেনি। উচ্চ হারে আমানত সংগ্রহ করছে ব্যাংক। এদিকে নিজেদের কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে পুঁজিবাজার বিমুখ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কম্পানির লভ্যাংশে প্রত্যাশার প্রতিফলন না পাওয়ায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করছে। আর সব পক্ষের শেয়ার বিক্রিতে অস্থির হয়ে উঠেছে পুঁজিবাজার।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্র জানিয়েছে, গত মে মাসে ২১ কার্যদিবসের মধ্যে ১৮ দিনই পতন ঘটেছে। আর তিন কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখিতায় সূচক বাড়ে ১১৭ পয়েন্ট আর সূচক কমেছে ৫১২ পয়েন্ট। অর্থাৎ মে মাসে ডিএসই থেকে সূচক কমে গেছে ৩৯৫ পয়েন্ট। আর বাজার মূলধন কমে প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি জুন মাসের প্রথম কার্যদিবস গতকাল রবিবারও পুঁজিবাজারে পতন অব্যাহত রয়েছে। সূচক কমার সঙ্গে বাজার মূলধন ও লেনদেনও হ্রাস পেয়েছে। তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১০ সালে ধসের পর দীর্ঘ ছয় বছর অর্থাৎ ২০১৬ সাল পর্যন্ত মন্দাবস্থার মধ্যেই চলেছে পুঁজিবাজার। আইন-কানুনের সংস্কারের পর ডিসেম্বর থেকে গতিশীল হয় বাজার। শেয়ারের দাম তলানিতে থাকায় বিদেশিরা শেয়ার কেনা বাড়ালে পুরনো বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হয়। বাজারের এই গতিশীলতার ধাক্কা ২০১৭ সালের জুন মাসের আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ২০১৭-২০১৮ বাজেট ঘোষণার পর বাজারে কিছুটা ঢিমেতাল থাকলেও অন্যান্য বছরের তুলনায় ভালো অবস্থার মধ্যেই বছর শেষ হয়।

জানা যায়, অক্টোবর থেকে পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির পরিমাণ বেশি। এতে শেয়ার হাতবদলের পরিমাণও কমেছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের মে থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনাবেচা বা সক্রিয়তায় পুঁজিবাজার গতিশীল হয়। ২০১৭ সালের মে-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। ‘কম’ দামে কেনায় শেয়ার অক্টোবর থেকে বিক্রি করে মুনাফা তুললে নিট বিনিয়োগ কমে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে শেয়ার কেনা বাড়ে। চলতি বছরের পাঁচ মাসের মধ্যে তিন মাসেই নিট বিনিয়োগ কমেছে। অর্থাৎ দেশের পুঁজিবাজার থেকে বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করে মূলধন তুলে নিচ্ছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারের ক্রমাগত নিম্নমুখিতায় কয়েকটি কারণের মধ্যে বিদেশিদের শেয়ার বিক্রি অন্যতম কারণ। পুঁজিবাজারে বিদেশিদের বিনিয়োগ দেশীয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়িয়ে তোলে। আর তাদের (বিদেশি) শেয়ার বিক্রি বাড়লে দেশের বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করতে থাকে।

ডিএসইর তথ্যানুযায়ী, জুন মাসে বিদেশিদের ১০৭২ কোটি টাকার শেয়ার হাতবদলে নিট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৩৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ জুনে বিদেশিরা শেয়ার বিক্রির চেয়ে কিনেছিল বেশি। জুলাই মাসে নিট বিনিয়োগ ছিল ২০০ কোটি, আগস্টে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, সেপ্টেম্বরে নিট বিনিয়োগ ছিল ১৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

২০১৮ সালের গত ৫ মাসের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি ও মার্চে পুঁজিবাজারে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর ফেব্রুয়ারি, এপ্রিল ও মে মাসে শেয়ার বিক্রি বেশি থাকায় নিট বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে কমে ৯৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা, আর এপ্রিলে ২৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা কমেছে।

সর্বশেষ গত মে মাসে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ কমেছে প্রায় তিন শ কোটি টাকা। মে মাসে বিদেশিদের মোট লেনদেন হয় ৯৬৬ কোটি টাকা। যার মধ্যে শেয়ার কিনেছে ৩৪১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আর শেয়ার বিক্রি করেছে ৬২৪ কোটি ১৭ লাখ টাকার। সেই হিসাবে এই মাসে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ কমেছে ২৮২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

শাকিল রিজভী বলেন, ‘ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধির পাশাপাশি ডলারের মূল্যবৃদ্ধিও বিদেশিদের শেয়ার বিক্রিতে অন্যতম কারণ। ডলারের দাম কমলে, বর্তমান টাকায় বেশি শেয়ার কিনতে পারে। আর ডলারের দাম বেড়ে গেলে টাকার পরিমাণও কমে যায়।

বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির বিষয়ে ব্যাংকের সুদের হার ও ডলারের দামের বিষয়টি খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ডলারের দাম বাড়লেও টাকার মান তো শক্ত থাকে না। সেটি মাথায় রেখে ডলারের সঙ্গে টাকা হিসাব-নিকাশ করেই শেয়ার বিক্রি করছে। নিজ নিজ দেশে সুদের হার বাড়লেও বিদেশিরা অন্য দেশ থেকে মূলধন তুলে নিয়ে যায়। এতে দেশের পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’

ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে ডলারের দাম বেড়েছে। আর ডলারের দাম বাড়লে টাকার সঙ্গে হিসাব-নিকাশ কঠিন হয়ে যায়। ডলারের দাম আরো বাড়তে পারে এমন শঙ্কা থেকেই বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। আর এই বিক্রির চাপে বাজারের পতন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বাজেটের পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 


মন্তব্য