kalerkantho


ঈদের কেনাকাটায় সাবধান

মেহেদিতে এসিড কালি, মানহীন রঙে লিপস্টিক

শওকত আলী   

১৫ জুন, ২০১৮ ১৯:৫৩



মেহেদিতে এসিড কালি, মানহীন রঙে লিপস্টিক

প্রতীকী ছবি

রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটের নিচতলায় রাস্তার পাশে সারি সারি দোকান। ওই দোকানগুলোর একটা অংশে কিছু ইমিটেশনের গয়না, অন্য অংশে রয়েছে নানা কসমেটিকসের পসরা। নারীরা তাদের ঈদের জামা-জুতা কেনার পর্ব শেষ করে এবার এসব দোকানে ঢু মারছে সাজগোজের পণ্যের খোঁজে। দোকানিরাও মেহেদি-লিপস্টিকের মতো পণ্যগুলো সাজিয়ে রেখেছে হাতের নাগালের মধ্যেই। তবে এসব দোকানে মিলছে ভেজাল মেহেদি এবং বিভিন্ন বিদেশি ব্র্যান্ডের নকল লিপস্টিক। মেহেদিতে ব্যবহার করা হচ্ছে এসিড ও অজানা কেমিক্যাল। কেউ কেউ মেশাচ্ছে ছাপার কালি। আর লিপস্টিকে দেওয়া হচ্ছে মানহীন রং। ঈদ ঘিরে শুধু গাউছিয়াতেই নয়, রাজধানীজুড়েই মিলছে এ ধরনের ভেজাল পণ্য। এসব পণ্য ব্যবহারে ত্বকের পাশাপাশি শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ওই দোকানগুলোতে আলমাস, কাভেরিসহ বিভিন্ন নামের ভারতীয়, পাকিস্তানি ও চায়নার মেহেদি বিক্রি করতে দেখা যায়। প্যাকেটের গায়ে কিছু উর্দু লেখা। তবে মেয়াদের বালাই নেই। মেহেদি তৈরিতে কী কী উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে—তাও লেখা নেই। ৩৫-৫০ গ্রাম ওজনের এসব মেহেদির টিউব বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। রামপুরার একটি সুপারশপে গিয়ে পাওয়া গেল বেশকিছু দেশি ব্র্যান্ডের মেহেদি টিউব। এর মধ্যে একটি হলো মমতাজ মেহেদি। ২৫ গ্রাম ওজনের মেহেদির খুচরা দাম লেখা হয়েছে ৪৮ টাকা। উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মেহেদি, স্টেবিলাইজার গাম, পিগমেন্ট, পানি, গ্লিসারিন, প্রিজারভেটিভ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কথা। তবে উপাদানগুলোর মধ্যে মেহেদির পরিমাণ রয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ।

এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, ‘ইদানীং মেহেদিতে এসিড ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক অজানা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো ব্যবহার করলে তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগ হতে পারে। অনেকের তো হাতে লাগানোর সঙ্গে সঙ্গেই ফোসকা পড়ে যাচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেকোনো গাছের পাতা গুঁড়ো করে পিকরিক এসিড বা পিকরাইড এসিডের সঙ্গে রংযুক্ত করলেই মেহেদি তৈরি হয়ে যায়। এ জন্য ব্যবহারকারীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। যাদের অ্যালার্জির সমস্যা আছে, তাদের ব্যবহার না করাই ভালো। এরপরও ব্যবহারের আগে অবশ্যই স্কিনে একটু লাগিয়ে দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক লুৎফুল কবির বলেন, ‘নিম্নমানের মেহেদিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ছাপার কালি। কম দামে পাওয়া যায় বলে এটা ব্যবহার করা হয়। এটি শরীরে রোগ তৈরির বড় উপাদান।’

সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে একটি ভেজাল কারখানা থেকে ১০ লাখ টাকা মূল্যের বিভিন্ন ভারতীয় ও পাকিস্তানি ব্র্যান্ডের নকল মেহেদি জব্দ করেন। রাজধানীর বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও বাজার অভিযানের সঙ্গে যুক্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নানা নামে ভেজাল মেহেদি, নকল লিপস্টিকগুলোর মূল বাজার হলো চকবাজার। এখান থেকেই সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক কম দামে এখান থেকে পণ্য বিক্রি হয় বলে জানায় তারা।

রাজধানীর বিভিন্ন সুপারশপ, বিভিন্ন মার্কেটের বিপণিবিতান ও পাড়া-মহল্লার বেশির ভাগ কসমেটিকসের দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, নানা বিদেশি ব্র্যান্ডের লিপস্টিক মিলছে সব দোকানেই। যার বেশির ভাগই নকল পণ্য। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, বড় বড় শপিং মলে কিছু ভালো পণ্যও পাওয়া যায়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল বলেন, ‘চকবাজারে এসব পণ্য বিক্রির অভিযোগ অনেক পুরনো। এখান থেকেই মূলত বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।’

গবেষকরা বলছেন, লিপস্টিকের উপাদানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো ৬৫ শতাংশ ক্যাস্টর অয়েল, ১৫ শতাংশ মৌমাছির মোম, ১০ শতাংশ অন্যান্য মোম, ৫ শতাংশ ল্যানোলিন (চর্বি জাতীয় পদার্থ), ৫ শতাংশ সুগন্ধি এবং অন্যান্য পদার্থ। এসবের মধ্যে সিসা, মারকারি, ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু রয়েছে। যারা নিয়মিত ব্যবহার করে তারা প্রতিদিন ২৪.৬ মিলিগ্রাম করে লিপস্টিক খেয়ে ফেলে।



মন্তব্য