kalerkantho


বাসি খাবারে রান্নার গ্যাস

বুয়েটের ৭৯টি দলের মধ্যে দুটি দল হাল্ট প্রাইজের রিজিওনাল ফাইনালিস্ট হয়েছে। এ দেশের সাধারণ মানুষের নানা সমস্যা সমাধানের জন্য করা এই আইডিয়াগুলো ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের সামাজিক সমস্যা সমাধানের বৈশ্বিক লড়াই ‘হাল্ট প্রাইজে’ উপস্থাপিত হবে। তাঁদের নিয়ে লিখেছেন ছাইফুল ইসলাম মাছুম

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাসি খাবারে রান্নার গ্যাস

বাঁ থেকে—জান্নাতুল ওসমান, সামিরা হোসেন, মুনতাহা ফারিন ও জয়ী চাকমা

তাঁরা চার বন্ধু। সবাই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন। জয়ী চাকমা, জান্নাতুল ওসমান, মুনতাহা ফারিন ও সামিরা হোসেনের এই দলের নাম ‘ক্লোভেরলিফ’। মানে হলো ‘চারটি পাতা’।

কিভাবে দলের শুরু হলো সেই গল্প শোনালেন জয়ী চাকমা, ‘অন্যরা নাম জমা দিচ্ছে দেখে আমরাও ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করে নাম জমা দিলাম। তবে প্রতিটি রাউন্ডে একের পর এক সাফল্য দেখে আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। ফলে চ্যাম্পিয়নের স্বপ্ন দেখতে লাগলাম আমরাও। পরে তো সেটিই সত্য হলো।’ কী সেই চমকে দেওয়া আইডিয়া?

বিস্তারিত বললেন দলনেতা সামিরা, ‘আসলে আমরা বাসি ও পচা খাবার নিয়ে একটি পরিকল্পনা করেছি। ইন্টারনেটের সূত্রে আমরা জেনেছি, সারা দুনিয়ায় প্রতিদিন ১.৩ বিলিয়ন খাবার ফেলে দেওয়া হয়। এই পচা-বাসি খাবারের শেষ পর্যন্ত জায়গা হয় ডাস্টবিনে। এই খাবারগুলো থেকেই আমরা গ্যাস বানাব। আমাদের সেই পদ্ধতির নাম হলো ‘ফার্মেন্টেশন’ গাঁজনপ্রক্রিয়া’। পাঁচজনের একটি পরিবারকে প্রতিদিনের রান্নার গ্যাস সরবরাহের জন্য আমরা ১২ হাজার লিটারের একটি ডাইজেস্টার বা বায়ুরোধী ধাতব ট্যাংক রাখব। সেটির মধ্যে প্রতিদিন ১০০ কেজি বাসি খাবার রাখতে হবে। সেটি ভাত, তরকারি থেকে শুরু করে মাছসহ যেকোনো কিছুই হতে পারে। এই খাবারগুলো টানা সাত দিন সেখানে থাকবে। এরপর প্রাকৃতিকভাবেই সেগুলো থেকে মিথেন গ্যাস তৈরি হতে শুরু করবে। সেই থেকে একটি পিভিসি ব্যাগে ভরে বাজারজাত করা শুরু হবে। অন্য ব্যাগগুলোর সঙ্গে পিভিসি ব্যাগের পার্থক্য হলো—এটি ফাটে না, ছিঁড়ে যায় না, টেকসই হয় এবং সহজে বহনযোগ্যও বটে। ১২০০ লিটার গ্যাসের একটি ব্যাগে এক সপ্তাহ অবলীলায় রান্না করা যাবে। আর পরে সেখানে আবার গ্যাস ভরে দেওয়া যাবে। এই ব্যাগগুলো আমরা নিজেরাই বানাব।’ জান্নাতুল জানালেন, ‘আমাদের দেশের মাত্র তিন শতাংশ মানুষ গ্যাসের সুবিধা পায়। তাদের জন্য এই প্রাকৃতিক গ্যাস খুবই কার্যকর হবে।’ এই চমকে দেওয়া আইডিয়ার সুবাদে তাঁরা এ বছরের ১৬ থেকে ১৮ মার্চ আরব আমিরাতের দুবাইয়ে হাল্ট প্রাইজের আঞ্চলিক পর্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। তাঁরা এ স্থানকেই তাঁদের প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচন করেছেন। 


সুপেয় হবে নোনা পানি

বাঁ থেকে—আসিফ এইচ তামিম, সাব্বির রুদ্র, সাবরিনা রশিদ ও মুবাশশির তাহমিদ
গ্রিক শব্দ ‘টেট্রা’র মানে হলো ‘চার’। সেই চারজন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র-ছাত্রী। সাবরিনা রশিদ পানিসম্পদ কৌশল, মুবাশশির তাহমিদ ও আসিফ এইচ তামিম নৌযান ও নৌযন্ত্রকৌশল এবং সাব্বির রুদ্র যন্ত্রকৌশলে পড়েন। তাঁদের আইডিয়াটিও অভিনব। সে গল্পই বললেন দলনেতা সাবরিনা, ‘প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট শক্তিকে ব্যবহার করে সামাজিক সমস্যা দূর করার পরিকল্পনাই এই প্রতিযোগিতায় আমাদের জমা দিতে বলা হয়েছিল। তখনই মাথায় এলো—উপকূলীয় এলাকাগুলোতে মোট দুই কোটি মানুষ লবণাক্ত পানির কারণে খাবারের পানির অভাবে ভুগছে। দূর-দূরান্ত থেকে তাঁদের পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এই কাজ মূলত মেয়েদেরই করতে হয়। সংসার সামলে এটি করতে গিয়ে তারা কষ্ট পায়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পানি সরবরাহ করা হলেও সেগুলো মানুষের চাহিদা খুব বেশি পূরণ করতে পারে না। তাদের জন্য আমরা লবণাক্ত পানি সুপেয় পানিতে রূপান্তর করার জন্য একটি বিশেষ ডিভাইস তৈরি করেছি। যেহেতু এখনো এটি বাজারজাত করা হয়নি বা বাণিজ্যিক উত্পাদন নেই, প্রতিযোগিতায়ও আমরা সেরা হইনি, ফলে নাম বা বানানোর কৌশল বলা যাচ্ছে না। তবে এটুকু বলতে পারি, এটি পিরামিডের মতো দেখতে। ডিভাইসটি সূর্যালোকের মাধ্যমেই পানি থেকে লবণ ও পানির ভেতরের ময়লা-আবর্জনা দূর করতে পারবে। সাধারণ মানুষও এর মাধ্যমে সহজে লবণমুক্ত পানি উত্পাদন করতে পারবে। ডিভাইসটি প্রতিদিন চারজনের একটি পরিবারের জন্য আট থেকে ১০ লিটার সুপেয় পানি উত্পাদন করতে পারবে। স্টেইনলেস স্টিল, পলি কার্বনেট শিট ও ছোট পাইপ ব্যবহার করে ডিভাইসটি তৈরি করা হয়েছে। এটি ১০ বছর ব্যবহার করলেও নষ্ট হবে না। এক মিটার স্কয়ার ক্ষেত্রফলের এই ডিভাইস ১৫০০ টাকার মধ্যে কিনে মানুষ তাদের উঠানে বা ছাদে রাখতে পারবে।’ মুবাশশির বললেন, ‘আমরা সাতক্ষীরা, হাতিয়া, ভোলার মতো উপকূলবর্তী এলাকার মানুষের কাছে চাইলে সরকার বা অন্য কোনো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে বিক্রি করব। এটির মাধ্যমে একদিকে যেমন তারা সুপেয় পানি পাবে, তেমনি লবণাক্ততার কারণে হওয়া অনেক রোগ-বালাই থেকেও বাঁচবে। তাদের জীবনমানও উন্নত হবে।’ আসিফ বললেন, ‘এখন আমরা ডিভাইসটির উন্নয়নে কাজ করছি। সেটি সম্পন্ন হলে এটি বাজারে বিক্রি করার পরিকল্পনা আছে।’ তবে এখন তাঁদের লক্ষ ১৬ থেকে ১৮ মার্চের কুয়ালালামপুরের হাল্ট প্রাইজের রিজিওনাল ফাইনালের দিকে। সেখানেই বাংলাদেশের প্রতিনিধি ‘টেট্রা’।


মন্তব্য