kalerkantho


বিজ্ঞান কংগ্রেসে বাজিমাত

গত ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয় দুই দিনব্যাপী ‘শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০১৭’। এতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের কথা জানাচ্ছেন জুবায়ের আহম্মেদ

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিজ্ঞান কংগ্রেসে বাজিমাত

প্রজেক্ট অব দ্য কংগ্রেস, পোস্টার অব দ্য কংগ্রেস এবং পেপার অব দ্য কংগ্রেস পুরস্কারপ্রাপ্তরা (বাঁ থেকে)

গত গ্রীষ্মে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল দিদারুল ইসলাম। এ সময়ই সে খেয়াল করে, গ্রামের নারীরা বিশুদ্ধ না করেই পানি ব্যবহার করছে। তখনই পানি পরিষ্কার করার একটা আইডিয়া মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। পরে ওই আইডিয়ার সফল বাস্তবায়নই তাকে এনে দেয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের প্রজেক্ট অব দ্য কংগ্রেস পুরস্কার। এভাবে বিজ্ঞান কংগ্রেসে আসা অনেক শিশু-কিশোরই চমত্কার সব আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দেয়, জিতে নেয় পুরস্কার।

পানি বিশুদ্ধকরণে সফলতা

দিদারুলের প্রজেক্টটি ছিল পানি বিশুদ্ধকরণে কাঁঠাল ও বাদামের খোসা থেকে উত্পাদিত পলিইলেকট্রলাইটের ব্যবহার।

ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে তার ভারি আগ্রহ। যেকোনো বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা ও সমাধান করার জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি খুঁজে বের করার অভ্যাস গড়ে ওঠে তার।

পানি বিশুদ্ধ করার জন্য পলিইলেকট্রলাইট কিভাবে তৈরি করেছে, এটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দিদারুল বলে, ‘ফটো পলিমারাইজেশন (সূর্যালোকের সাহায্যে কোনো কিছু পরিবর্তন করে নিজের ইচ্ছামতো পলিমার তৈরি করা) ও দুটি বস্তু একত্রীকরণের প্রক্রিয়া—অর্থাত্ গ্রাফট কো-পলিমারাইজেশনের মাধ্যমে টি-ব্যাগ দিয়ে একটি পলিইলেকট্রলাইট তৈরি করি। এটি ভারী ধাতু, টেক্সটাইলশিল্পের বর্জ্য রং—অর্থাত্ সিনথেটিক রং ও নোংরা পানি পরিষ্কার করতে পারে।’

ভবিষ্যত্ চলার পথে এই পুরস্কার অনেক অনুপ্রেরণা জোগাবে, জানায় দিদারুল।

আলুর অঙ্কুরোদগম এবং চারার বৃদ্ধিতে সারের ভূমিকা

মজেদুল ও নাজিরের পোস্টারের বিষয় ছিল জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে আলুর অঙ্কুরোদগম এবং চারার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ। হারাগাছায় বিজ্ঞান ক্যাম্প করার সময় ঢাকার শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসে অংশগ্রহণের ইচ্ছা জাগে তাদের। প্রথমে কাপড় নিয়ে গবেষণা করতে চাইলেও অনুমোদন মেলেনি। ১০ দিন ভাবার পর গবেষণার নতুন বিষয়টি খুঁজে পায়। আর এটা নিয়ে গবেষণা শুরুর অনুমতিও পায়। প্রথমে তারা দেখতে পায়, চারা অঙ্কুরোদগমে রাসায়নিক সার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এতে পরিবেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। তবে কলা, কমলা ও বাদামের খোসা, গোবর ও পালং শাকের অপাচ্য অংশ ব্যবহার করে আলুর অঙ্কুরোদগম ও চারার বৃদ্ধি দ্রুত হয়। যা পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতি। তারা দুজনেই রংপুরের প্রতিষ্ঠান ড্রিমস ফর টুমরো থেকে অংশগ্রহণ করেছে। শিশুদের স্বপ্ন পূরণে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে ড্রিমস ফর টুমরো। ‘রংপুর থেকে ঢাকায় শিশু-কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেসে পোস্টার অব দ্য কংগ্রেস হওয়ার অনুভূতি সত্যিই অসাধারণ।’ জানায় তারা।

কলাগাছের বহুমুখী ব্যবহার

আনাস, মাহিন ও তামজিদের পেপারের নাম ছিল কলাগাছের কাণ্ডের বহুমুখী ব্যবহার; সার, কীটনাশক, পলিমার, জ্বালানি, ফিল্টার উত্পাদন ও বাণিজ্যিক দ্রব্যের সঙ্গে তুলনা। বাংলাদেশে প্রচুর কলা উত্পন্ন হয়। কিন্তু চাষের পর প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কলাগাছ নষ্ট হয়। তাই বন্ধুরা মিলে পরিকল্পনা করে কলাগাছ পুনর্ব্যবহার করার। এতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং লাভবান হবে চাষিরা। কলাগাছের রসে প্রাকৃতিক কিছু উপাদান থাকে (বিভিন্ন অ্যামিনো ও বেশি পরিমাণে পটাসিয়াম আয়নযুক্ত যৌগ)। এগুলো ক্ষারীয় গুণসম্পন্ন হয়। তাই কলাগাছের রস টাটকা অবস্থায় বিভিন্ন শাকসবজিগাছে ছিটিয়ে দিলে তা পোকার গায়ে জ্বালাপোড়া ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। ক্ষারীয় হওয়ার কারণে তা ছত্রাকের বিরুদ্ধেও কার্যকর। এতে কলাগাছের রস কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করে সফল হয় তারা। ‘আমরা কলাগাছের রস গোবরের সঙ্গে ব্যবহার করে সারও তৈরি করেছি। এই সার গম, সরিষা, পেঁয়াজগাছে ব্যবহার করে ২৫ থেকে ৫২ শতাংশ বেশি ফলন পেয়েছি।’ জানায় এই খুদে বিজ্ঞানীরা। কলাগাছের স্টার্চ ব্যবহার করে পলিমার তৈরি করেছে তারা, যা টেকসই। প্রথমে গাছের মণ্ড তৈরি করে তা সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডে উত্তপ্ত করে তা থেকে পাউডার তৈরি করা হয়। এটাই স্টার্চ। এরপর তা পানিতে গুলিয়ে কর্ন ফ্লাওয়ার, গ্লিসারিন ও এসিটিক এসিড যোগ করে নাড়া হয়। শক্ত হলে ছাঁচে ফেলে শুকিয়ে নিলেই হয়ে গেল পলিমার। কলাগাছ ব্যবহার করে জ্বালানি তৈরি করেছে তারা, এটি লাভজনক ও নবায়নযোগ্য। এখানেই শেষ নয়। পানি বিশুদ্ধকরণেও কলাগাছ ব্যবহার করে তারা। দুই টুকরো ফিল্টার পেপারের মাঝে কলাগাছের মণ্ড দিয়ে পাত তৈরি করে। এরপর একটি বোতলে পরপর পাথর, চারকোল, বালুকণা, পাত ও তুলা দিয়ে ফিল্টার তৈরি করা হয়। এটি ব্যবহারে ভারী ধাতুযুক্ত পানি পরিশোধনে সক্ষম হয়েছে। কলাগাছে থাকা বিভিন্ন জৈব এসিড ভারী ধাতুর সঙ্গে জটিল যৌগ গঠন করে এবং ভারী ধাতু ওই মিশ্রণে আটকে যায়। ফলে পানি ফিল্টার হয়। ভবিষ্যতে নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে চায় এই তিনজন।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি ও বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন যৌথভাবে আয়োজিত বিজ্ঞান কংগ্রেসের জন্য সারা দেশ থেকে তিন হাজারের বেশি ছাত্র-ছাত্রী কনসেপ্ট পেপার জমা দেয়। কয়েক ধাপে বাছাইয়ের পর সেখান থেকে ৪০০ জন মূল পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।

এখান থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক পেপার, পোস্টার ও প্রজেক্ট—এই তিনটি বিষয়ে ৫৬ জন শিক্ষার্থীর ২৮টি গবেষণাকে কংগ্রেসে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। প্রজেক্ট অব দ্য কংগ্রেস নির্বাচিত হয় কুষ্টিয়া জেলা স্কুলের দশম শ্রেণির দিদারুল ইসলাম, পোস্টার অব দ্য কংগ্রেস পুরস্কার পায় রংপুরের সারাই মুন্সিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণি পড়ুয়া মাজেদুল ইসলাম ও মর্ণেয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নাজির হোসেন। পেপার অব দ্য কংগ্রেস পুরস্কার লাভ করে দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী এ এস এম আনাস ফেরদৌস, এ এইচ এম মাহিন ও ফুলবাড়ী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তামজিদ আজম। কংগ্রেসের বিজয়ীদের মধ্য থেকে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে পঞ্চম জগদীশ চন্দ্র বসু ক্যাম্প।

 


মন্তব্য